ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বা কোন কোন দেশ এর আওতায় পড়বে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
‘নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের জন্য কোনো ধরনের ‘জীবনরেখা’ তৈরি করলে সংশ্লিষ্ট দেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। দেশটির আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ চালানো হবে। তবে তার ঘোষণার বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ ঘিরে বিশ্ববাজারে চাপ
ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা প্রায় ছয় মাসের যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা দেখানোর পর জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের আগের মতো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি করা। কিন্তু দুই দফা উদ্যোগই দ্রুত ভেঙে পড়ে।
চীনের ভূমিকা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চীন। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন।
ফলে ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজেরও বড় সরবরাহকারী। পাল্টা ব্যবস্থা নিলে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরতি
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বাণিজ্যিক লেনদেন ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো সমুদ্রে পড়ে। তবে ইরান ওই দাবি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

আলোচনা নাকি আত্মসমর্পণ?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। তবে আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয় বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের অবস্থান বদলানো সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। এর ঠিক এক দিন আগে ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার অবশ্য বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং তা সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সক্রিয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই বড় প্রশ্ন
ট্রাম্প ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তিনি এমন একটি নতুন ও কঠোর চুক্তি চান, যেখানে ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি ও গবেষণা কর্মসূচির ওপর আরও বেশি বিধিনিষেধ থাকবে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে আগের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ইরান অবশ্য কয়েক দশক ধরে দাবি করে আসছে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















