কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজারও। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মধ্যে চাকরিপ্রার্থীরা এখন নিজেদের জীবনবৃত্তান্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও নানা আকর্ষণীয় শব্দ যোগ করে নিয়োগদাতাদের নজর কাড়ার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে গত এক বছরে পেশাজীবীদের অনলাইন কর্মপরিচিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত শব্দ ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চাকরিপ্রার্থীদের পাশাপাশি নিয়োগদাতারাও এই প্রযুক্তির দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে আগে যেসব পেশায় প্রযুক্তিগত জ্ঞান খুব একটা প্রয়োজন ছিল না, সেখানেও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা চাওয়া হচ্ছে।
জীবনবৃত্তান্তে নতুন শব্দের ছড়াছড়ি
চাকরিপ্রার্থীদের অনেকেই নিজেদের পুরোনো কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যোগসূত্র তৈরি করছেন। কেউ প্রশিক্ষণ ও সনদ নিচ্ছেন, কেউ আবার নিজেদের কাজের বর্ণনায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার যুক্ত করছেন।
কর্মজীবনবিষয়ক পরামর্শদাতাদের মতে, অনেকেই এখন জীবনবৃত্তান্তে একসঙ্গে যত বেশি সম্ভব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট শব্দ যুক্ত করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাছাই করা জীবনবৃত্তান্তের তালিকায় উঠে আসা এবং নিয়োগদাতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে পেশাজীবীদের অনলাইন কর্মপরিচিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত শব্দ যুক্ত করার হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলোতেও এই প্রযুক্তির উল্লেখ দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালে যেখানে এমন বিজ্ঞপ্তির মাত্র ৩ শতাংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা ছিল, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি এমন কিছু চাকরিতেও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতার কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না।
পুরোনো অভিজ্ঞতাতেও নতুন রং
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের এক বিশ্লেষণে বর্তমান কর্মপরিচিতির সঙ্গে ২০২৩ সালের আগের সংরক্ষিত কর্মপরিচিতির তুলনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মানুষ পুরোনো চাকরির পদবিতেও পরে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ যোগ করছেন।
বর্তমান কর্মপরিচিতিতে অতীতের তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লেখ প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। গবেষকদের মতে, এর কিছু অংশ হয়তো সত্যিকার অর্থে পুরোনো অভিজ্ঞতার সংশোধন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এটি নিজের অভিজ্ঞতাকে কৃত্রিমভাবে আরও আধুনিক ও আকর্ষণীয় করে তোলার প্রবণতা হতে পারে।
এ ধরনের প্রবণতাকে কেউ কেউ ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধোলাই’ হিসেবে দেখছেন—অর্থাৎ বাস্তবে যতটা অভিজ্ঞতা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রযুক্তিগত দক্ষতার ছবি তুলে ধরা।
চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মক্ষেত্রে কতটা চাকরি সৃষ্টি করবে আর কতটা চাকরি বিলুপ্ত করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, প্রযুক্তিটি অনেক কাজ সরিয়ে দেবে। অন্যরা বলছেন, এটি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং একঘেয়ে ও কষ্টসাধ্য কাজ কমিয়ে দেবে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক গ্রেস গ্রেভস্টক দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও সফল না হয়ে শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের পেশাগত পরিচয়ের অংশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অনলাইন কর্মপরিচিতিতে নিজেকে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণের নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং প্রযুক্তিতে নিজের দক্ষতা প্রমাণের জন্য একটি সনদও নিচ্ছেন।
তার মতে, কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং এই পরিবর্তনকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রশিক্ষণে ব্যাপক আগ্রহ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেখার জন্য বিনামূল্যের প্রশিক্ষণেও ব্যাপক সাড়া পড়ছে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর সময় আয়োজকেরা প্রায় ৫০০ মানুষের অংশগ্রহণ আশা করেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে প্রায় ৬২ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছেন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চাকরি হারানো প্রযুক্তিকর্মী যেমন রয়েছেন, তেমনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নতুন পেশায় যেতে চাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
তাদের একজন এলিজাবেথ মিক। প্রায় দুই দশক সরকারি চাকরিতে থাকার পর কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা এবং দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে তিনি আগাম অবসর নেন। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন চাকরি পান। সেখানে তথ্য বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন।
মিকের ভাষায়, এই প্রযুক্তি তার জীবনের গতিপথই বদলে দিয়েছে।
সবার জন্য এখনো স্বাভাবিক হয়নি
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা জীবনবৃত্তান্তে যুক্ত করা এখনো সর্বজনীন প্রবণতা হয়ে ওঠেনি। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০ কোটি পেশাজীবীর অনলাইন কর্মপরিচিতির মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ নিজেদের এমন দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে নির্দিষ্ট কিছু পেশায় এই হার অনেক বেশি। পণ্য ব্যবস্থাপকদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ, গবেষকদের মধ্যে ১০ শতাংশ এবং পরামর্শকদের মধ্যে ৭ শতাংশ নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতার কথা উল্লেখ করছেন।
সিস্টেম বিশ্লেষক আর্ট ডেভিসও সম্প্রতি নিজের কর্মপরিচিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় কাজের দক্ষতা যুক্ত করেছেন। গত বছর থেকেই তিনি কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেও আগে আলাদাভাবে বিষয়টি উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু চাকরির আবেদনপত্র ও পরিচিতিপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তাকে এই দক্ষতা যুক্ত করার পরামর্শ দেয়।
তবে নতুন শব্দ যোগ করলেই চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। চাকরি হারানোর পর ডেভিস প্রায় ১০০টি পদে আবেদন করেও এখন পর্যন্ত একটি সাক্ষাৎকারের ডাক পাননি।
দক্ষতা দেখানোর নতুন পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো দ্রুত বদলে যাওয়া একটি প্রযুক্তি। তাই চাকরিপ্রার্থীরা কীভাবে এই দক্ষতা বাস্তবে দেখাবেন, সেটিও অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়।
তবু নিয়োগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, চাকরিপ্রার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরা উচিত। তবে শুধু আকর্ষণীয় শব্দ যোগ না করে বাস্তবে কীভাবে প্রযুক্তিটি কাজে লাগানো হয়েছে, তার প্রমাণ দেখাতে পারাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ চাকরির বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন শব্দ হয়তো দরজা খুলতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত দক্ষতা ও সেই দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগই সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চাকরির বাজার, জীবনবৃত্তান্ত ও নতুন দক্ষতার প্রতিযোগিতা—এই চারটি বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















