ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে পানিসংকট। চলতি গ্রীষ্মে মহাদেশটির গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানি এতটাই কমে গেছে যে বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নৌপরিবহন—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে পানির সংকট
ইউরোপের বাণিজ্য ও কৃষির প্রধান জলপথ রাইন, দানিউব ও পো নদীর পানির স্তর এখন অনেক জায়গায় রেকর্ড তলানিতে। বিশেষ করে জার্মানির কাউব এলাকায় রাইন নদীর পানি নেমে প্রায় সাড়ে ৯ ইঞ্চিতে পৌঁছেছে। একপর্যায়ে সেখানে পানির স্তর ৩ ইঞ্চিরও নিচে নেমে যায়।
নদীতে তখনও নৌযান চলাচল সম্ভব ছিল, কিন্তু কম গভীরতার কারণে জাহাজগুলোকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পণ্য বহন করতে হয়েছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে এবং নদীপথে বাণিজ্য অর্থনৈতিকভাবে কম লাভজনক হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ
ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউবেও পানির স্তর দ্রুত কমেছে। এতে নৌপরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। পানির ঘাটতি আঞ্চলিক জলসম্পদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
পানির সংকটের কারণে কিছু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে তাদের চুল্লি বন্ধ করতে হয়েছে। নদীর পানি কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে উৎপাদন কমানো বা বন্ধ করার প্রয়োজন হয়।
বৃষ্টির পরও কাটছে না খরা
অদ্ভুতভাবে, দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকায় শীতকাল ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিবহুল। কিন্তু মে মাস থেকে শুরু হওয়া একের পর এক তীব্র ও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে দ্রুত পাল্টে দিয়েছে।
অতিরিক্ত তাপে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত শুকিয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি হলেও তার বড় অংশ নদীতে পৌঁছানোর আগেই শুষ্ক মাটি শুষে নিচ্ছে। ফলে নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার বদলে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে
ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের এই খরা জুলাই মাসে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। শুষ্ক মাটি, কম আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ তাপপ্রবাহের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত স্বস্তি ফেরার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ফলে নদীপথে পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পানির নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ইউরোপকে আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে ইউরোপের বিভিন্ন নদীতে ভূপৃষ্ঠের পানির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের পানির ঘাটতির ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়েছে।
ইউরোপের চলমান খরা তাই কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি এখন মহাদেশটির অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















