যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে বিশ্বভ্রমণের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া এই প্রজন্ম এখন সঞ্চয়, সম্পদ ও অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৃথিবীর যতটা সম্ভব দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ভ্রমণপ্রবণতা বদলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যটনশিল্পের ধরনও।
যতদিন সক্ষম, ততদিন ভ্রমণ
৬৯ বছর বয়সী জিন চাওয়ের জীবনে স্বামী ও মায়ের মৃত্যু ছয় মাসের ব্যবধানে ঘটে। এরপর নিজেকে সামলে নিতে তিনি বেরিয়ে পড়েন দীর্ঘ ভ্রমণে। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ২১ দিনের এক সফরে তিনি ছয়টি দেশ ঘুরেছেন। মিশরে উটের পিঠে চড়েছেন, নীল নদে ভ্রমণ করেছেন এবং ইংল্যান্ডের অ্যাভেবারির প্রাচীন পাথর ছুঁয়ে দেখেছেন।
এই ভ্রমণের জন্য তার খরচ হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার ডলার। এবার আফ্রিকার ছয়টি দেশ ঘুরতে আরেকটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
চাওয়ের ভাষায়, যতদিন শরীর ও সামর্থ্য আছে, ততদিনই তিনি পৃথিবী দেখতে চান।
সম্পদ ও দীর্ঘায়ু বাড়াচ্ছে ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা
বেবি বুমার নামে পরিচিত এই প্রজন্ম বর্তমানে জীবিত অন্য যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি সম্পদের অধিকারী। তাদের অনেকেই আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে আছেন, অবসর সময়ও বেশি এবং শারীরিক সক্ষমতাও তুলনামূলক ভালো।
ফলে জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখার তাগিদ তাদের মধ্যে বাড়ছে।
যে প্রজন্ম তরুণ বয়সে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হিচহাইকিং করত কিংবা ইউরোপে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঘুরে বেড়াত, তারাই এখন আফ্রিকার সেরেঙ্গেটিতে বন্যপ্রাণী দেখতে যাচ্ছেন। তবে তাদের চাহিদা বদলেছে। এখন অনেকেই কঠিন পথের পাশাপাশি সহজ হাঁটার সুযোগ, উন্নত থাকার ব্যবস্থা এবং আরামদায়ক ভ্রমণসুবিধা চান।
দুঃসাহসিকতা চাই, তবে আরামও চাই
প্রবীণ ভ্রমণকারীরা শুধু বিলাসিতা চান না; তারা নতুন অভিজ্ঞতাও চান। তবে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভালো আবাসন, মানসম্মত খাবার, সহজ যাতায়াত এবং লাগেজ নিয়ে কম ঝামেলাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রমণসেবা প্রতিষ্ঠান রোমিং বুমার ট্রাভেল সার্ভিসেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেভিড পোর্টার জানিয়েছেন, চলতি বছরে তাদের বুকিং প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর বড় অংশই ছোট আকারের বিলাসবহুল জাহাজে ভ্রমণের জন্য।
তার অনেক গ্রাহক এমন ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী, যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ থেকে এক কোটি ডলারের মধ্যে। সব ধরনের জলভ্রমণ মিলিয়ে তাদের গড় বুকিং প্রায় ২৫ হাজার ডলার। আর বিলাসবহুল দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণের খরচ কোনো কোনো দম্পতির ক্ষেত্রে তিন লাখ ডলারেরও বেশি।
লাগেজ বহনের ঝামেলাও চান না
বয়স্ক ভ্রমণকারীরা সাধারণত দীর্ঘ সফরে যান এবং বেশি লাগেজ সঙ্গে নেন। কিন্তু বিমানবন্দর, জাহাজ কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সেই লাগেজ টেনে নেওয়ার ঝামেলা তারা এড়াতে চান।
ফলে লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার সেবার চাহিদাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ৫০ পাউন্ড ওজনের একটি ব্যাগ পাঠাতে কেউ কেউ ১৪৪ ডলার পর্যন্ত খরচ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্যে একই ব্যাগ পাঠাতে খরচ হতে পারে ৩৭৪ ডলার।
লাগেজ পরিবহন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের একজন অড্রে কোহাউট জানান, তাদের মূল গ্রাহকদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। এই গ্রাহকেরা সহজ ও ঝামেলামুক্ত সেবা চান এবং ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগকে গুরুত্ব দেন। অনেকেই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।
অর্থ খরচ করলেও সাশ্রয়ের চেষ্টা
অবশ্য সব বেবি বুমারই বিপুল অর্থ ব্যয় করে ভ্রমণ করেন না। প্রবীণদের মধ্যেও ভ্রমণ খরচ কমানোর প্রবণতা রয়েছে।
এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বয়স্ক মার্কিন নাগরিকেরা গড়ে চারটি ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। সবচেয়ে বেশি খরচ করতে আগ্রহী ষাটের কোঠার মানুষ। তবে আয় যতই হোক, এই প্রজন্মের অনেকেই ভ্রমণের আগে সাশ্রয়ী সুযোগ খোঁজেন।
তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কম দামের ভাড়া খুঁজছেন, বিভিন্ন আনুগত্যভিত্তিক ছাড় কাজে লাগাচ্ছেন এবং আগেভাগে ভ্রমণের জন্য অর্থ আলাদা করে রাখছেন।
অবসরের প্রতিশ্রুতি পূরণ
৭২ বছর বয়সী মার্ক ডেনেন কর্মজীবনে প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহে বিমানে ভ্রমণ করতেন। বিক্রয় পেশায় কাজ করার সময় তার মোট বিমানভ্রমণের দূরত্ব প্রায় ৪০ লাখ মাইল বলে তার ধারণা। স্ত্রী সুসান তখন তাদের দুই সন্তানের দেখাশোনা করতেন।
কর্মজীবনে স্ত্রীকে তিনি প্রায়ই বলতেন, অবসর নেওয়ার পর দুজন একসঙ্গে পৃথিবী ঘুরবেন। অবসরের পর সেই প্রতিশ্রুতিই পূরণ করছেন তারা।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ, রাইন নদীতে জলভ্রমণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান ঘুরে দেখা—সব মিলিয়ে তারা বছরে প্রায় চারটি বড় ভ্রমণ করেন। এর মাঝেও তিন দিনের ছোট সফরে ন্যাশভিলের মতো জায়গায় যান।
তবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করলেও তারা মাসিক বাজেট মেনে চলেন এবং ভবিষ্যৎ ভ্রমণের জন্য প্রতি মাসে আলাদা অর্থ জমা রাখেন।
জীবনের বাকি সময়ের হিসাব
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পালান্তে ওয়েলথ অ্যাডভাইজর্সের প্রতিষ্ঠাতা ভিক্টর মেদিনা তার গ্রাহকদের অর্থকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে রাখার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে ভ্রমণ ও জীবনের আনন্দের জন্য একটি আলাদা তহবিলও থাকে।
তার মতে, বয়স্ক মানুষ এখন ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তারা ভাবছেন, জীবনে হয়তো নির্দিষ্টসংখ্যক বড় ভ্রমণের সুযোগই বাকি আছে। তাই কোন ভ্রমণ তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে সেই অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া যায়, সেটিই তারা বিবেচনা করছেন।
পৃথিবী দেখার নতুন প্রতিযোগিতা
অস্ট্রেলিয়ার লিয়ান ও লিওন রাইল্যান্ড অবসর নেওয়ার পর গত ছয় বছরে বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশ ঘুরে দেখেছেন। চীনের মহাপ্রাচীর, পেরুর মাচু পিচু এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিনোদন উদ্যানও তাদের ভ্রমণের তালিকায় রয়েছে।
আগামী বছরের পরিকল্পনায় রয়েছে ভিয়েতনাম, মরক্কো ও পর্তুগাল। বছরে প্রায় ২০ সপ্তাহ ভ্রমণে কাটান তারা এবং বছরে গড়ে ৪০ হাজার ডলার খরচ করেন।
তবে তারা খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কম দামের বিমানভাড়া খোঁজেন, মাঝারি মানের হোটেলে থাকেন এবং ছোট বহনযোগ্য লাগেজ ব্যবহার করেন।
৬১ বছর বয়সী লিয়ান অবসরপ্রাপ্তদের নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেন।
পর্যটনশিল্পও বদলে যাচ্ছে
বেবি বুমারদের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের সেবা নতুনভাবে সাজাচ্ছে। আগে যেখানে প্রবীণ পর্যটকদের জন্য সাধারণ আবাসন ও শিক্ষামূলক ভ্রমণকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেখানে চার ও পাঁচ তারকা হোটেল, ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে বহু দেশ ভ্রমণ এবং সহজ হাঁটার পথের মতো সুবিধা যুক্ত হচ্ছে।
রোড স্কলার নামের ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যটকই বেবি বুমার প্রজন্মের। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ভ্রমণ চালু করার পেছনেও এই প্রজন্মের চাহিদাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছে।
এই প্রজন্মের কাছে মূল প্রশ্ন এখন একটাই—জীবনে আর কতটা সময় আছে এবং সেই সময়ের মধ্যে কোন অভিজ্ঞতাগুলো সবচেয়ে মূল্যবান।
তাই অবসর মানেই ঘরে বসে থাকা নয়। বরং জীবনের সঞ্চিত অর্থ, অবসর সময় ও শারীরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবী দেখার নতুন দৌড়ে নেমেছেন বেবি বুমাররা। আর তাদের এই চাহিদাই আন্তর্জাতিক পর্যটনশিল্পকে আরও আরামদায়ক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বিলাসবহুল করে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















