কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় মাত্র কয়েক বছর আগে যাত্রা শুরু করা একটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এখন প্রযুক্তি শিল্পের বড় আলোচনার কেন্দ্রে। মাত্র ২৪ বছর বয়সী তিন সহপ্রতিষ্ঠাতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির নাম এচড। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে এবং নতুন বিনিয়োগ পর্বে এর মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়া তিন তরুণের প্রতিষ্ঠিত এচডের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান যেখানে মূলত সফটওয়্যার তৈরি করছে, সেখানে এচড সরাসরি কম্পিউটার চিপ ও সার্ভার ব্যবস্থা তৈরি করছে। চিপ শিল্পে বিপুল মূলধন, দীর্ঘ গবেষণা সময় এবং জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণত অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোই এগিয়ে থাকে।
মাত্র ৪৪ দিনে পরীক্ষামূলক চিপ চালু
এচড জানিয়েছে, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরীক্ষামূলক চিপ হাতে পাওয়ার পর মাত্র ৪৪ দিনের মধ্যে সেগুলো দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ চালু করতে সক্ষম হয়েছে তারা। সাধারণত এ ধরনের প্রক্রিয়ায় ছয় মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি রবার্ট ওয়াচেন দাবি করেছেন, সফলভাবে প্রথম প্রচেষ্টাতেই তৈরি করা চিপের ক্ষেত্রে এচড সম্ভবত বিরল উদাহরণ।
প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রয়াদেশ পেয়েছে এবং চিপ সরবরাহও শুরু করেছে। তাদের প্রথম বড় গ্রাহক হয়েছে ওয়াল স্ট্রিটের গোপনীয়তার জন্য পরিচিত পরিমাণগত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেন স্ট্রিট।
জেন স্ট্রিটই এচডের নতুন ৭০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পর্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের ফলে এচডের মূল্যায়ন ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এনভিডিয়া থেকে প্রতিভা টানার প্রতিযোগিতা
এচডের প্রায় ৪০০ কর্মীর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই আগে এনভিডিয়ায় কাজ করেছেন। শুধু এনভিডিয়া নয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকেও দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নিয়োগ করছে তারা।
এনভিডিয়ার তথ্যকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা প্রকৌশল বিভাগের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা জিমি ডেলিও এচডের একজন বিনিয়োগকারী। এ ছাড়া এনভিডিয়ায় প্রায় ২৩ বছর কাজ করা প্রকৌশলী ব্রায়ান লয়লার ২০২৪ সালে এচডে যোগ দেন। পরে তিনি এনভিডিয়া থেকে প্রায় এক ডজন প্রকৌশলীকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসেন।
এচডের প্রকৌশলী অ্যান্থনি গ্যামারম্যানও এপ্রিলে এনভিডিয়া ছেড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেন। তিনি জানান, একের পর এক এমন মানুষকে এচডে যোগ দিতে দেখে তিনি নিজেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যাদের তিনি পেশাগতভাবে অত্যন্ত সম্মান করতেন।
তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে ছিল সংশয়
শুরুতে এচডের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের অনেকেই মনে করতেন, প্রতিষ্ঠাতাদের বয়স ও অভিজ্ঞতা চিপ শিল্পের মতো জটিল ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠানটির তিন প্রতিষ্ঠাতারই বয়স এখন ২৪ বছর। হার্ভার্ডে তাত্ত্বিক গণিতের কঠিন কোর্সে গ্যাভিন উবার্তি ও ক্রিস ঝুর সঙ্গে রবার্ট ওয়াচেনের পরিচয় হয়। ওই কোর্সে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারতেন।
তবে বয়সের ঘাটতি পূরণ করতে এচড শুরু থেকেই অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দলে টানার দিকে জোর দেয়।
‘উৎপাদনই পণ্য’—এই নীতিতে এগিয়ে চলা
প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কাজের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, উৎপাদনই আসল পণ্য। এর অর্থ হলো, শুধু নকশা বা ধারণার ওপর নির্ভর না করে যত দ্রুত সম্ভব বাস্তব চিপ তৈরি করে বাজারে নিয়ে আসা।
এ জন্য তারা প্রথম চিপ তৈরির আগেই কোটি কোটি ডলারের পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম কেনে। একই সঙ্গে সফটওয়্যার তৈরি, বিশেষ সার্ভার নকশা এবং চিপ ব্যবহারের অবকাঠামো প্রস্তুত করতে শুরু করে। বসন্তকালে টানা দুই মাস রাত জেগে কাজও করেন কর্মীরা।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে নিজেদের কার্যালয়ের ভেতরেই ২০ লাখ ওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট তথ্যকেন্দ্র তৈরি করেছে এচড। সেখানে বড় সার্ভার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। সম্ভাব্য গ্রাহকেরা দূর থেকে এচডের চিপ ব্যবহার করে পরীক্ষা চালানোর সুযোগ পান।
চিপের ভেতরেও আলাদা প্রযুক্তি
এচড তাদের চিপ তৈরিতে ‘ক্লাস্টার-স্কেল মেমোরি’ নামে একটি বিশেষ নকশা পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে একই সার্ভারের একাধিক চিপ দ্রুত পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং একসঙ্গে একটি বড় প্রসেসরের মতো কাজ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল প্রসেসরে যে যোগাযোগ-সংক্রান্ত কাজ করতে প্রায় ৪ হাজার ন্যানোসেকেন্ড সময় লাগে, এচডের নকশায় তা প্রায় ৭০০ ন্যানোসেকেন্ডে করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির নেতৃত্বে থাকা সাপ্তদীপ পাল আগে এনভিডিয়ায় একাধিক গ্রাফিকস প্রসেসরকে একসঙ্গে কাজ করানোর প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন। পরে তিনি আরেকটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
পরিমাণগত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য
এচড বিশেষভাবে পরিমাণগত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য গ্রাহক ও বিনিয়োগকারী হিসেবে লক্ষ্য করছে। এসব প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত শক্তিশালী প্রসেসর ব্যবহার করে অতি দ্রুত তাদের বিনিয়োগের হিসাব-নিকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মডেল চালায়।
সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের গতিও এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হিসাব সম্পন্ন করতে সক্ষম চিপের চাহিদা তাদের মধ্যে বেশি।
প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী প্যাট্রিক ও’শগনেসি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান যুগে চ্যাটজিপিটি প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠিত চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এচডই প্রথম প্রতিষ্ঠান, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তর তৈরির প্রক্রিয়া বা ইনফারেন্সের গুরুত্ব এতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে।
এচডের দ্রুত অগ্রযাত্রা তাই শুধু একটি তরুণ প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়; বরং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী চিপ নির্মাতাদের কাছ থেকে দক্ষ জনবল টেনে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















