২০২১ সালের আগস্টে কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে তালেবান আফগানিস্তানে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। পাঁচ বছর পর স্পষ্ট যে, তাদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন ছিল না; এটি দেশটির সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কাঠামোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন চাপিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নারী ও মেয়েদের ওপর। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
তবু আন্তর্জাতিক আলোচনায় আফগানিস্তান এখন আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। একসময় যে দেশটি দুই দশক ধরে পশ্চিমা কূটনীতি, সামরিক উপস্থিতি ও বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক নিচে। এই নীরবতা তালেবান শাসনের জন্য কেবল স্বস্তির নয়; এটি তাদের স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথও সহজ করে দিতে পারে।
নারীর অধিকার যেখানে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন
আফগানিস্তানের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক নারীদের জীবনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ। দেশটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের প্রবেশাধিকার কার্যত বন্ধ। কর্মক্ষেত্র, চলাফেরা, সমাবেশ এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকারেও রয়েছে কঠোর বাধা। নারীদের পোশাক, জনসমক্ষে আচরণ এবং সামাজিক উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এই নীতিগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু সামাজিক বিধান হিসেবে দেখলে সংকটের গভীরতা বোঝা যাবে না। এগুলো আসলে রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। একজন নারী কোথায় যেতে পারবেন, কীভাবে কথা বলবেন, শিক্ষা নিতে পারবেন কি না কিংবা নিজের জীবিকা বেছে নিতে পারবেন কি না—এসব সিদ্ধান্ত যখন রাষ্ট্র নির্ধারণ করে, তখন ব্যক্তিস্বাধীনতা আর কেবল ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকাশ।
আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। পাঁচ বছর ধরে এগুলো টিকে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে একটি প্রজন্মের মেয়েরা এমন একটি বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে, যেখানে শিক্ষা ও স্বাধীনতা তাদের স্বাভাবিক অধিকার নয়, বরং নিষিদ্ধ কিছু।
নির্যাতন শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়
তালেবান শাসনের সমালোচনা করতে গিয়ে কখনো কখনো পুরো সংকটকে শুধু নারী অধিকার দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। নারীদের ওপর নিপীড়ন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি, কিন্তু সংকটের পরিধি আরও বড়।
সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশেষ করে সাবেক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে ভয় পান।
এর ফলে আফগানিস্তানে যে নীরবতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্মতির লক্ষণ হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। কোনো সমাজে মানুষ যদি সমালোচনা করলে আটক বা নির্যাতনের আশঙ্কা করে, তাহলে প্রকাশ্যে প্রতিবাদের অনুপস্থিতি সরকারের জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়। বরং তা দমন-পীড়নের কার্যকারিতার প্রমাণ হতে পারে।
তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। স্বাধীন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পরিসর সংকুচিত হওয়ায় দেশের ভেতরের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যে সমাজে সাংবাদিক ও সমালোচকদের কণ্ঠ স্তব্ধ, সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়—তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগটুকু টিকিয়ে রাখা।
মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যাবে না
মানবাধিকার সংকটের পাশাপাশি আফগানিস্তান ভয়াবহ মানবিক চাপের মধ্যেও রয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটির প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে। শিশুদের অপুষ্টিও অনেক অঞ্চলে গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিকে শুধু অর্থনৈতিক দুর্দশা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যখন মানুষের আয় ও খাদ্যের নিশ্চয়তা কমে যায়, একই সময়ে নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত করা হয় এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তখন সংকটগুলো পরস্পরকে আরও গভীর করে।
নারীদের কর্মসংস্থান থেকে সরিয়ে দিলে পরিবার ও অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ হলে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি বাধাগ্রস্ত হয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমলে দুর্নীতি, নিপীড়ন কিংবা মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের সুযোগ কমে যায়। অর্থাৎ মানবাধিকার, অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতি এখানে আলাদা তিনটি সংকট নয়; এগুলো একই ব্যবস্থার পরস্পর সম্পর্কিত ফলাফল।
আন্তর্জাতিক বিশ্ব কেন নীরব?
আফগানিস্তান নিয়ে বর্তমান আন্তর্জাতিক উদাসীনতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। ২০২১ সালের পর বিশ্বের মনোযোগ দ্রুত অন্য সংকটের দিকে সরে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভিবাসন রাজনীতি আন্তর্জাতিক এজেন্ডা দখল করেছে। এর মধ্যে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে পেছনের সারিতে চলে গেছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার বদলালেই কোনো মানবাধিকার সংকটের গুরুত্ব কমে যায় না।
বরং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ক্ষেত্রে নিয়মিত আন্তর্জাতিক চাপ আরও প্রয়োজন। কারণ কোনো দেশের পরিস্থিতি যখন প্রতিদিন নতুন করে সংবাদ হয় না, তখন সেখানে চলমান নিপীড়ন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তালেবান এই বাস্তবতা বুঝতে পারছে। তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পেলেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক আলোচনা কিংবা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহযোগিতাকে তারা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রয়েছে: প্রয়োজনীয় বাস্তব যোগাযোগ আর রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার মধ্যে সীমারেখা কোথায়?
অভিবাসন চুক্তি কি মানবাধিকারের বিকল্প হতে পারে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তালেবানের অভিবাসন-সংক্রান্ত আলোচনা এই প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োজনের অংশ হতে পারে। কিন্তু এমন আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—ফিরিয়ে দেওয়া মানুষগুলো নিরাপদ থাকবেন কি না।
যে দেশে রাজনৈতিক পরিচয়, পূর্ববর্তী সরকারি দায়িত্ব কিংবা ভিন্নমতের কারণে মানুষ নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক আইনে এমন একটি মৌলিক নীতি রয়েছে, যেখানে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার নিপীড়নের বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। এই নীতির অর্থ খুব সরল: অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলেও মানবিক নিরাপত্তার সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
তাই তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলে সেই যোগাযোগের কেন্দ্রেও মানবাধিকার থাকা উচিত। শুধু অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করে আফগানিস্তানের বাস্তব পরিস্থিতিকে পাশ কাটানো হলে তা ভুল বার্তা দিতে পারে।

কূটনৈতিক যোগাযোগের অর্থ স্বীকৃতি নয়—কিন্তু তার প্রভাব আছে
কোনো সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা আর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় এমন সরকারের সঙ্গেও কথা বলতে হয় যাদের নীতির সঙ্গে অন্য দেশ একমত নয়। কিন্তু প্রতিটি বৈঠক, প্রতিটি আমন্ত্রণ এবং প্রতিটি চুক্তির একটি রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্যও থাকে।
তালেবান যদি কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত হওয়ার ঘটনাকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তাহলে সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ প্রচারণাতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তাই যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়াই একমাত্র সমাধান নয়। বরং যোগাযোগের শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার, নারীর শিক্ষা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বন্দিদের নিরাপত্তা এবং নির্যাতনের অভিযোগ—এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রেই রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো যদি তালেবানের সঙ্গে কথা বলে, তাহলে তাদের প্রশ্নও করতে হবে। শুধু কীভাবে অভিবাসন কমানো যাবে বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তা নয়; কীভাবে আফগান নারীরা শিক্ষা ফিরে পাবেন, কীভাবে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করবেন, কীভাবে আটক ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত হবে—এসবও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
আফগানিস্তানকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনা জরুরি
আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি এখন আন্তর্জাতিক বিস্মৃতি। পাঁচ বছর আগে তালেবানের কাবুল দখল বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিল। পাঁচ বছর পর একই দেশে নারী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, নাগরিক অধিকার সংকুচিত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকলেও আন্তর্জাতিক মনোযোগ অনেক কম।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম দায়িত্ব হলো ভুলে না যাওয়া।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারকে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে সামনে রাখতে হবে। আফগান নারীদের হয়ে কথা বলার অর্থ তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং তাদের নিজেদের কণ্ঠ যাতে সম্পূর্ণভাবে নিস্তব্ধ হয়ে না যায়, সেই সুযোগ তৈরি করা।
একইভাবে আফগানিস্তানে বসবাসকারী পুরুষদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও উপেক্ষা করা উচিত নয়। মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের জন্য নয়। তালেবান শাসনের অধীনে যে কোনো নাগরিকের ওপর নির্বিচার দমন-পীড়ন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর শিক্ষা রাখে। কোনো সংকট সংবাদ থেকে হারিয়ে গেলেই সংকট শেষ হয় না। কোনো সরকার আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে একটি দেশকে সরিয়ে দিলেই সেখানে মানুষের অধিকার নিরাপদ হয়ে যায় না।
বরং নীরবতার সময়েই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক চাপ।
তালেবানকে বাস্তবতার অংশ হিসেবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই বাস্তবতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া প্রয়োজন নেই। আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ যদি করতেই হয়, তবে সেই যোগাযোগের মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার। কারণ একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নামে যদি সেই দেশের মানুষের ওপর চলমান নিপীড়নকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি হয়তো একটি সাময়িক সুবিধা পাবে—কিন্তু আফগানিস্তানের মানুষ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য হারাবে তাদের কণ্ঠ, অধিকার ও ভবিষ্যৎ।
নেজমা ব্রাহিম 


















