লন্ডনের বিখ্যাত বারবিকান কনজারভেটরির দরজা তিন বছরের জন্য বন্ধ হওয়ার আগে সেখানকার গাছপালার অংশ নিজেদের ঘরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন ৫০০ মানুষ। গাছের চারা বিতরণের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন পরিণত হয় এক আবেগঘন সামাজিক উৎসবে।
বন্ধ হচ্ছে বারবিকানের সবুজ ভুবন
বারবিকান কনজারভেটরির ছাদ থেকে কাচের টুকরো পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিরাপত্তার জন্য সেখানে বড় জাল টাঙানো হয়েছে। ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় থাকা বিশাল এই উদ্ভিদভাণ্ডারের সংস্কারকাজের জন্য জায়গাটি প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকবে।
সংস্কারটি বারবিকানের বৃহত্তর পুনর্নবীকরণ কর্মসূচির অংশ। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড।
বন্ধ হওয়ার আগে কনজারভেটরির বিভিন্ন গাছের কাটা অংশ মানুষের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগ্রহীদের গাছ গ্রহণের জন্য পোষা প্রাণী দত্তক নেওয়ার মতো একটি আবেদনপত্রও পূরণ করতে হয়েছে।

গাছ নিতে মানুষের ঢল
প্রথম আয়োজনেই ৫০০ মানুষ উপস্থিত হন। অনলাইনে বিনা মূল্যের প্রবেশপত্র ছাড়ার পর তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়।
বারবিকান এলাকার বাসিন্দা লিডিয়া গোল্ডবার্গ একটি রুপালি-সবুজ সুইডিশ আইভি বেছে নেন। তিনি বলেন, নিজের ঘরে বারবিকানের কনজারভেটরির একটি অংশ নিয়ে যেতে পারা তাঁর জন্য অসাধারণ অনুভূতি।
কনজারভেটরির প্রধান উদ্যানপালক মার্তা লোচেভিচ জানান, গাছ নেওয়ার বিষয়ে মানুষের আগ্রহ দেখে তিনি বিস্মিত। তিনটি আলাদা আয়োজনের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৫০০টি গাছের কাটা অংশ বিতরণ করা হবে।
জলবায়ু বদলে বদলে যাচ্ছে গাছের ঠিকানা
বারবিকান নির্মিত হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। এরপর লন্ডনের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আগে যেসব গাছ ঘরের ভেতরে রাখা হতো, সেগুলোর অনেক এখন বাইরেও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।

সাম্প্রতিক কয়েক দফা তীব্র তাপপ্রবাহে কনজারভেটরির কিছু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যমান তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও নতুন আবহাওয়ার সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি।
সংস্কারের পর নতুন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থা চালু হলে গাছগুলো আরও সুস্থ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কংক্রিটের স্থাপত্যে সবুজের কোমলতা
সংস্কারের পর কনজারভেটরিতে যতটা সম্ভব পুরোনো গাছ রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন গাছও যুক্ত করা হবে।
উদ্যানপালকদের পছন্দের তালিকায় থাকবে বড় ও দৃষ্টিনন্দন পাতার গাছ। কারণ বারবিকানের কঠিন ও শক্তিশালী কংক্রিট স্থাপত্যের সঙ্গে সবুজ পাতার বৈপরীত্য তৈরি করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
গাছের চারা নিতে আসা মানুষের মধ্যেও ছিল নানা ধরনের পছন্দ। কেউ মেক্সিকোর কথা মনে করিয়ে দেওয়া সাদা মখমলি গাছ বেছে নিয়েছেন, কেউ নিয়েছেন পেপেরোমিয়া, আবার কেউ নিয়েছেন বেগুনি রঙের লতানো গাছ।
৮৮ বছর বয়সী স্টেলা বেছে নিয়েছেন বেঙ্গল ডে-ফ্লাওয়ার। তাঁর নিজের বাড়িতেও অসংখ্য গাছ রয়েছে। এমনকি অতিরিক্ত বড় হয়ে যাওয়া একটি বিশাল মন্সটেরা তিনি আগে বারবিকানের কনজারভেটরিতে দিয়ে রেখেছিলেন। এখন সেটি যেন আবার তাঁর ঘরে ফিরিয়ে দেওয়া না হয়—সেই আশাই করছেন তিনি।

২০৩০ সালে নতুন রূপে ফিরবে কনজারভেটরি
বারবিকানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ফিলিপা সিম্পসনের কাছে এই কনজারভেটরি শুধু একটি উদ্ভিদভাণ্ডার নয়। তাঁর ভাষায়, এটি শহরের ‘সবুজ ফুসফুস’।
দীর্ঘদিনের জলরোধী সমস্যার পাশাপাশি ছাদ থেকে কাচ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তাই নিরাপত্তা ও স্থাপনার সুরক্ষার জন্য বড় ধরনের সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে নতুন রূপে কনজারভেটরি আবার খুলবে। তখন এটি চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকা মানুষদের জন্যও পুরোপুরি সহজগম্য হবে। বর্তমানে সীমিত সময় খোলা থাকলেও সংস্কারের পর সপ্তাহের সাত দিনই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বারবিকান যখন কয়েক বছরের জন্য নীরব হবে, তখন তার গাছের একটি অংশ ছড়িয়ে থাকবে লন্ডনের অসংখ্য মানুষের ঘরে। ফলে বন্ধ হলেও তার সবুজ স্মৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















