যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর ভয়—সবকিছুর মধ্যেই মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইউক্রেনের এক নারী। একসময় যিনি সন্তান নেওয়ার কথাই ভাবতেন না, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে বদলে দেয়। এখন ৪০ বছর বয়সে তিনি ১০ মাসের কন্যাসন্তানের মা। সন্তানের বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একক মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাঁর উপলব্ধি—মাতৃত্ব তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে।
যুদ্ধের আগে মাতৃত্ব ছিল তাঁর ভাবনাতেই নেই
জীবনের বেশির ভাগ সময় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে কাটিয়েছেন তিনি। যুদ্ধের আগে সন্তান নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। বরং নিজের স্বাধীনতা, পেশা এবং ভালো লাগার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সন্তানহীন জীবন কাটানোর সিদ্ধান্তই তাঁর কাছে স্বাভাবিক মনে হতো।
কিন্তু সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর এবং সম্মুখসারিতে কাজ করে ফিরে আসার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন আসে।
৩৯ বছর বয়সে তিনি নিজের সন্তান ধারণের সক্ষমতা সম্পর্কে চিকিৎসা পরীক্ষা করান। তখনই বুঝতে পারেন, জীবনের এই প্রশ্নটি আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়—তিনি মা হতে চান।
কেন এমন পরিবর্তন হলো, তার নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ তিনি বলতে পারেন না। বরং এটি ছিল নানা অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সম্মিলিত ফল। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর এত কাছাকাছি থাকা, অসংখ্য ইউক্রেনীয়কে প্রাণ হারাতে দেখা এবং জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে নতুন জীবনের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
গর্ভধারণে আনন্দের সঙ্গে ছিল প্রবল ভয়
যুদ্ধের মাঝখানে সচেতনভাবে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, মানুষের জীবনই যখন অনিশ্চিত, তখন সম্পূর্ণ নিরাপদ সময়ের অপেক্ষা কতটা বাস্তবসম্মত?
গর্ভবতী হওয়ার খবর জানার পর তাঁর মধ্যে একই সঙ্গে আনন্দ, কৌতূহল ও গভীর আতঙ্ক কাজ করেছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, কিন্তু সিদ্ধান্তটি বাস্তবে পরিণত হওয়ার পর বিষয়টির গুরুত্ব আরও তীব্রভাবে অনুভব করেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল—এ সিদ্ধান্ত আর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি আগে যে স্বাধীন জীবন তিনি উপভোগ করতেন, সেটিও আর আগের মতো থাকবে না।
তাঁর কাছে গর্ভধারণ সেনাবাহিনী ছাড়ার একটি গ্রহণযোগ্য পথও হয়ে ওঠে। কিন্তু সামরিক জীবন থেকে সাধারণ জীবনে ফিরে আসা ছিল আরেক ধরনের ভয়ের অভিজ্ঞতা। তিনি ভাবতে শুরু করেন, এরপর তাঁর পরিচয় কী হবে, তিনি কেমন মানুষ হয়ে উঠবেন।
যুদ্ধের শুরুতে দেশে ছিলেন না
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি ইউক্রেনে ছিলেন না। তখন আফ্রিকা ভ্রমণ করছিলেন এবং পরে কিছু সময় বার্লিনেও বসবাস করেন। কিন্তু দূরে বসে যুদ্ধের ঘটনাগুলো দেখা তাঁর কাছে স্বস্তিদায়ক ছিল না।
একপর্যায়ে তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। মনে হচ্ছিল, দেশের মানুষের জন্য তিনি যথেষ্ট কিছু করতে পারছেন না। সেই অনুভূতি থেকেই শেষ পর্যন্ত তিনি ইউক্রেনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
দেশে ফিরে সক্রিয়ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের দেশ, মানুষ ও সমাজের সঙ্গে আবার যুক্ত হতে পেরে তিনি স্বস্তি পান।
তাঁর বিশ্বাস, মানুষের জীবনে নিজেকে কোনো একটি যৌথ লক্ষ্যের অংশ হিসেবে অনুভব করা অত্যন্ত জরুরি। নিজের কাজের মাধ্যমে দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি—এই অনুভূতিই তাঁকে শক্তি দেয়। তাই মা হওয়ার পরও ইউক্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা তিনি ভাবেননি।
যুদ্ধ মানুষকে জীবনের সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়
দর্শনে পড়াশোনা করা এই নারী যুদ্ধের আগে থেকেই মৃত্যু ও জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবতেন। তবে যুদ্ধ সেই ভাবনাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
যুদ্ধের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনাই নিশ্চিত থাকে না। পেশা, পরিবার, সম্পর্ক—সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে। যুদ্ধ মানুষের নিরাপত্তার মিথ্যা নিশ্চয়তাকে সরিয়ে দিয়ে তাকে বর্তমান মুহূর্তের সামনে দাঁড় করায়।
অনেকে মনে করতে পারেন, স্থিতিশীল সময় না আসা পর্যন্ত সন্তান নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু সেই স্থিতিশীল সময় আদৌ কখনো আসবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
তাঁর কাছে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ধীরে ধীরে বাদ পড়ে যায়। তখন মানুষ বুঝতে পারে কোন বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানের সামনে নিজের ভয় লুকিয়ে রাখতে চান না
যুদ্ধের মধ্যে একজন মায়ের মানসিক চাপ আরও বেশি। হামলার খবর, ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্ক, মৃত্যু ও শোক—সবকিছুই তাঁর জীবনের অংশ।
তবু শিশুর সামনে দীর্ঘ সময় ভয়ের মধ্যে আটকে থাকার সুযোগ নেই। কারণ শিশু শুধু মায়ের কথা শোনে না, মায়ের অনুভূতিও বুঝতে পারে।
তাই নিজের যত্ন নেওয়াকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর মতে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে একজন মায়ের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের সময় সেই দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তিনি মনে করেন, যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকা শুধু সাহসের বিষয় নয়; পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্মুখসারিতে এই গুণ যেমন দরকার ছিল, তেমনি যুদ্ধের মধ্যে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জন্যও এটি অপরিহার্য।
মেয়েকে যুদ্ধের বাস্তবতা জানাবেন
মেয়েটি বড় হলে তাকে যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে সত্য কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কারণ তিনি নিজে যুদ্ধে ছিলেন এবং সন্তানের বাবা এখনো সামরিক দায়িত্ব পালন করছেন।
এই বাস্তবতাকে লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ তিনি দেখেন না। বরং সন্তানের বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত ভাষায় সত্যটি বোঝানোর পক্ষপাতী তিনি।
তাঁর মতে, বাবা-মায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দেশেও একটি শিশু নিজেকে অনিরাপদ মনে করতে পারে। তাই নিরাপত্তা শুধু বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; পরিবারের ভেতরের আস্থাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি চান তাঁর সন্তান নিজেকে যুদ্ধের শিকার হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখুক। তাঁর দেশ যে নিজের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে, সেই বাস্তবতাও একদিন মেয়েকে বোঝাতে চান।
সন্তান জন্মের পর সম্পর্ক ভেঙে যায়
সন্তান জন্মের পর তাঁর এবং মেয়ের বাবার মধ্যে যোগাযোগের সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আলাদা হয়ে যান। এখন দুজন মিলে সন্তানের দায়িত্ব পালন করছেন, আর তিনি একক মায়ের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।
এই জীবন কখনো কখনো তাঁকে ভয় পাইয়ে দেয়। অনেক সময় প্রচণ্ড একাকিত্ব অনুভব করেন। চারপাশে সহায়তা থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষের কাছ থেকে স্নেহ, আলিঙ্গন ও শারীরিক উপস্থিতির যে আকাঙ্ক্ষা, সেটি তাঁর মধ্যেও কাজ করে।
তবে সেই অনুভূতিকে দমন না করে তিনি গ্রহণ করতে শিখছেন। কখনো কাঁদছেন, কখনো গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছেন, আবার কখনো ধ্যানের মাধ্যমে নিজেকে সামলে নিচ্ছেন।
যুদ্ধের চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে মাতৃত্ব
তাঁর জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন সময় এটি। এমনকি সম্মুখসারিতে থাকার অভিজ্ঞতার চেয়েও মাতৃত্বের বর্তমান সময়কে বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন তিনি।
গত শীতের তীব্র শীত, যেখানে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, তার মধ্যেও সন্তানকে নিয়ে থাকতে হয়েছে। গোলাবর্ষণের কারণে কখনো কখনো টানা তিন দিন বিদ্যুৎ ছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে কখনো তাঁর শুধু মনে হয়েছে, বসে কাঁদবেন এবং কেউ এসে তাঁর যত্ন নিক। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অনুভব করেন, মা হওয়ার অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভেতর থেকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
যুদ্ধের মধ্যেও আরও সন্তানের স্বপ্ন
ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মধ্যে এখনো আশাবাদ রয়েছে। বরং তিনি আরও সন্তান নিতে চান। যুদ্ধ চলতে থাকা অবস্থায় নিজের পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত বিকাশের পাশাপাশি কীভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়েও তিনি ভাবছেন।
তিনি জানেন, সামনে অনেক বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তবু স্বপ্ন দেখা থামাতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, পরিস্থিতি সব সময় নিজের ইচ্ছামতো হবে না—কিন্তু স্বপ্ন মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও শক্তি খুঁজে নেওয়া, নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন দেখাই তাঁর কাছে বেঁচে থাকার অংশ।
যুদ্ধ তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তাঁকে জীবনের মূল্য, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট করেছে। আর সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি বলছেন—মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















