০৫:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
উসাইন বোল্টের বিশ্বরেকর্ড ছাড়িয়ে গেল চীনের মানবাকৃতির রোবট স্প্যানিশ রিবড নিউট: বিশাল আকারের শান্ত জলজ প্রাণী, যত্নও তুলনামূলক সহজ পালান্টিরকে বাদ দিলে ভুল করবে ব্রিটেন, সমালোচনার যুক্তি কতটা টেকসই? কোভিডের তদন্ত ঘিরে চাপে ফাউচি, আইনি লড়াইয়ে গড়লেন বিশেষ তহবিল সোমালিয়ায় ভয়াবহ ক্ষুধা সংকট, অপুষ্টিতে পড়তে পারে ১৯ লাখ শিশু ১১টি নতুন নিকোটিন পণ্যে অনুমোদন পেল ফিলিপ মরিস মালয়েশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে, ক্লাং উপত্যকায় সর্বোচ্চ ঝুঁকি গানস এন’ রোজেসের স্ল্যাশের নামে নিউ গিনির নতুন সাপের প্রজাতি সাহেল কি যুদ্ধ নয়, আলোচনার পথেই শান্তি খুঁজে পেতে পারে? যুক্তরাজ্যে এ-লেভেলে আর্ট-ডিজাইনে ভাটা, ২০১০ সালের পর সর্বনিম্ন অংশগ্রহণ

সমুদ্রের বুকের হারানো বিজ্ঞান: মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের গল্প

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ভারত মহাসাগরের জলপথে নৌযান চালিয়ে এসেছে মালদ্বীপের মানুষ। বাতাসের গতিপথ, নক্ষত্রের অবস্থান, সমুদ্রের স্রোত এবং মৌসুমি পরিবর্তন—এসবের সূক্ষ্ম পাঠের ওপর নির্ভর করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মালদ্বীপের নাবিকেরা দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে দূরদেশে যাতায়াত করেছেন। অথচ এই দীর্ঘ সামুদ্রিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—কীভাবে তারা সমুদ্রপথ নির্ণয় করতেন—তার লিখিত ইতিহাস আজও অত্যন্ত অসম্পূর্ণ।

এর একটি কারণ হতে পারে, নৌ-জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তা শেখানো হতো মুখে মুখে, হাতে-কলমে এবং বাস্তব নৌযাত্রার মধ্য দিয়ে। লিখিত নথি ছিল, কিন্তু সেগুলোর বড় অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

তারপরও ছড়িয়ে থাকা প্রমাণগুলো একত্র করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। মালদ্বীপের নৌবিদ্যা ছিল নিছক অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাব-নিকাশ, মৌসুমি বায়ু সম্পর্কে জ্ঞান, দিক নির্ণয়ের কৌশল এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ।

কায়রোর এক ইহুদি উপাসনালয়ে মালদ্বীপের ছাপ

মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সূত্র পাওয়া গেছে মালদ্বীপে নয়, মিসরের কায়রোতে।

১৮৮০-এর দশকে কায়রোর একটি ইহুদি উপাসনালয়ের সংরক্ষণাগার থেকে বিপুলসংখ্যক পুরোনো দলিল উদ্ধার হয়। এসব নথির মধ্যে ১১৪১ সালের একটি চিঠি ছিল, যা সুদানের আইধাব বন্দর থেকে লিখেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদি ব্যবসায়ী নাহরাই বিন আলান।

চিঠিতে তিনি একটি আসন্ন সমুদ্রযাত্রার কথা উল্লেখ করেন। যে জাহাজে তিনি যাত্রা করছিলেন, সেটির সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘দিবাজি’ নামের একটি পরিচয়। মধ্যযুগীয় আরবি লেখকদের কাছে মালদ্বীপের একটি প্রচলিত নাম ছিল ‘আল-দিবাজাত’। ফলে এই নাম মালদ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা তৈরি করে।

জাহাজটির নাবিক বা নাখুদা ছিলেন আলি নামের একজন ব্যক্তি। জাহাজটির নাম ছিল আল-মুবারক। এটি ইয়েমেন থেকে সিলন পর্যন্ত যাত্রা করেছিল এবং এর পণ্যবাহী অংশে কড়ি ছিল।

চিঠির আরেকটি তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রার সময় ছিল মে মাস—যে সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হতে শুরু করে এবং ভারত মহাসাগরের পূর্বমুখী যাত্রার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

অর্থাৎ, একজন অভিজ্ঞ নাবিকের কাছে সময় নির্বাচন কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। মৌসুমি বাতাস ছিল সমুদ্রযাত্রার মৌলিক জ্ঞান।The Maldives at the Crossroads of the Indian Ocean

লোককথার ভেতরেও লুকিয়ে আছে নৌবিদ্যার তথ্য

মধ্যযুগের পরবর্তী সময় থেকে মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাসের বিদেশি লিখিত সূত্র অনেকটাই দুর্লভ হয়ে যায়। তখন সামনে আসে স্থানীয় স্মৃতি ও লোককথা।

বুরারা ওয়াহাকা নামে পরিচিত দীর্ঘ আখ্যানের মধ্যে ফেহেন্দু উসমান রাধুন, বুরাকি রানিন এবং বোদু থাকুরুফানুর মতো ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিতুল্য চরিত্রের কাহিনি রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এটি লিখিত ও মুদ্রিত রূপ পায়।

এই ধরনের কাহিনিকে সরাসরি ইতিহাসের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু এর মধ্যে থাকা প্রযুক্তিগত বিবরণকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই।

কারণ কোনো গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে হলে তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো শ্রোতাদের কাছে বোধগম্য হতে হয়। নক্ষত্রের অবস্থান, নৌযাত্রার সময়, বাতাসের ধরন কিংবা দিক নির্ণয়ের মতো বিষয় যদি গল্পে স্বাভাবিকভাবে আসে, তবে তা সেই সমাজের বাস্তব জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

নিসফু হান্ধেইগিরিনের গল্পে এর একটি চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। তিনি একজন জ্যোতির্বিদ হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি শিশুকে রাতের আকাশে নির্দিষ্ট একটি নক্ষত্র দেখিয়ে বলেন, সেটি যখন মধ্যাকাশে পৌঁছাবে, তখন যেন তাকে জাগানো হয়।

সমুদ্রে নাবিকদের জন্য কোনো নক্ষত্রের মধ্যরেখায় পৌঁছানোর সময় পর্যবেক্ষণ করে রাতের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। গল্পের এই ছোট্ট ঘটনাটি তাই একটি বড় বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—আকাশ পর্যবেক্ষণ ছিল নৌজীবনের পরিচিত জ্ঞান।

বুরাকি রানিনের কাহিনিতে নাবিকের বিশেষজ্ঞ ভূমিকা

বুরাকি রানিনের সমুদ্রযাত্রার কাহিনিতে নৌবিদ্যার আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।

তার জাহাজে ছিল ২৫ জন কর্মী, একজন কমান্ডার এবং আলাদাভাবে একজন অভিজ্ঞ মালিমি বা নাবিক। এই আলাদা পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, জাহাজ চালানো আর নৌপথ নির্ধারণ করা একই দক্ষতা ছিল না।

হুভাধু কান্দু অতিক্রমের সময় অভিজ্ঞ মালিমি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন ইউবুশেমুকে হাল ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মালিমি তাকে কম্পাস দেখিয়ে কোন দিকে জাহাজ চালাতে হবে তা বোঝান এবং সেই দিকটি চিহ্নিত করে দেন।

গল্পের পরবর্তী অংশে ইউবুশেমু নিজের মতো করে সেই পথ পরিবর্তন করে।

এখানে গল্পের নাটকীয়তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর প্রযুক্তিগত ভাষা। শ্রোতারা কম্পাস, দিক নির্ধারণ, হাল ধরা এবং নাবিকের বিশেষজ্ঞ ভূমিকার ধারণা বুঝতেন বলেই এমন বিবরণ কাহিনিতে স্বাভাবিকভাবে এসেছে।

বুরাকি রানিনের পরবর্তী আচরণও নৌ-ঐতিহ্যের আরেকটি দিক সামনে আনে। তিনি একের পর এক ‘নাকাই’ বা নক্ষত্রভিত্তিক সময়ের নাম উল্লেখ করে দেশে ফেরার সময় পিছিয়ে দেন।

নাকাই ছিল শুধু ক্যালেন্ডারের একটি একক নয়। প্রতিটি সময়পর্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট নক্ষত্র, বাতাস ও সমুদ্রের পরিস্থিতির সম্পর্ক ছিল। ফলে এগুলো জানা মানে ছিল সমুদ্র কখন যাত্রার জন্য উপযুক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বোঝা।

আরব নাবিকেরা একই ধরনের মৌসুমি জ্ঞানকে ‘মাওসিম’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতেন। নাম আলাদা হলেও ভারত মহাসাগরের নাবিক সমাজগুলো সমুদ্রের মৌসুমি চরিত্রকে যে গভীরভাবে বুঝত, তার একটি সাধারণ কাঠামো এখানে দেখা যায়।

বোদু থাকুরুফানু ও নক্ষত্র দেখে পথ নির্ধারণ

মালদ্বীপের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বোদু থাকুরুফানুর কাহিনিতেও নৌবিদ্যার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট।

পর্তুগিজ দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর জন্য তিনি বেশি পরিচিত হলেও ঐতিহ্যগত বিবরণে তাকে একজন প্রশিক্ষিত নাবিক হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। শৈশব থেকেই তাকে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ও নাকাই সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

সিলন থেকে ফেরার সময় তার নৌযাত্রার বিবরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদিন দুপুরে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হতো। নৌযানের অভিজ্ঞ নাবিক নিজের হিসাব করতেন, একই সঙ্গে থাকুরুফানুও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও হিসাব রাখতেন।

এটি কোনো সাধারণ আকাশ দেখার দৃশ্য নয়। এখানে রয়েছে নিয়মিত পরিমাপ, হিসাব এবং ফলাফল যাচাইয়ের প্রক্রিয়া।

এই কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের একটি নাম ছিল ‘দিগুফিলা’। এটি এমন একটি বোর্ড, যার সাহায্যে নক্ষত্র বা অন্য কোনো জ্যোতিষ্কের উচ্চতা পরিমাপ করা হতো। আরেকটি শব্দ ‘গোয়িধুরুভান’ পর্তুগিজ উৎস থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।

দুটি শব্দের পাশাপাশি থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নির্দেশ করে। ইউরোপীয় প্রভাবের সময়ে নতুন ধরনের যন্ত্র বা পরিভাষা মালদ্বীপে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু আকাশের উচ্চতা মেপে নৌপথ নির্ধারণের জ্ঞান তারও আগে সেখানে ছিল।

আরব নাবিক ইবনে মাজিদ ও সুলাইমান আল-মাহরির ব্যবহৃত ‘খাশাবা’ নামের যন্ত্রের সঙ্গেও দিগুফিলার মিল রয়েছে। ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন নৌসমাজের মধ্যে যে জ্ঞান আদান-প্রদান ছিল, এটি তারই একটি ইঙ্গিত।

নৌবিদ্যা ছিল রাষ্ট্রীয় জ্ঞানও

পরবর্তী শতাব্দীর নথিপত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রকাশ করে—মালদ্বীপে নৌবিদ্যা শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা ছিল না; তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

মোহাম্মদ ইব্রাহিম লুথফির গবেষণায় সপ্তদশ শতকের ধিয়ামিগিলি শাসনপর্ব সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য উঠে আসে, যেখানে নৌবিদ্যার প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠান এবং বইয়ের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

‘নেভিকান’ শব্দটি বিদেশে নিজস্ব নৌযানে যাতায়াতকারী দক্ষ নাবিকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তাদের ওপর ছিল ‘রানাহামাদি’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় পদ—রাজকীয় নৌযানের প্রধান, রাজকীয় বহরের অধিনায়ক এবং রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা।

এতে স্পষ্ট হয়, নৌযাত্রার জ্ঞান ছিল রাষ্ট্র পরিচালনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মৌখিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি বইও ছিল

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—মালদ্বীপের নৌবিদ্যা কি কখনো লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল?

উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ।

লুথফির গবেষণায় মাদথোদা এলাকায় একটি নৌবিদ্যার শিক্ষাকেন্দ্রের কথা উঠে আসে। স্থানীয় স্মৃতিতে সেখানে নৌচালনা এবং নাকাই সম্পর্কিত বহু বই থাকার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত স্থানীয় কিছু মানুষ এসব বই দেখেছেন বলেও লুথফি জানতে পেরেছিলেন।

পরে গাফু ধালু ভিলিঙ্গিলিতে তিনি এমন একটি হাতে লেখা নাকাইয়ের বইয়ের সন্ধান পান, যা মাদথোদা গান্দুভারু থেকে এসেছিল। বইটি দিভেহি আকুরু লিপিতে লেখা ছিল। কিন্তু মালিক সেটি রাষ্ট্রের কাছে দিতে বা এমনকি এর অনুলিপিও দিতে রাজি হননি।

এই ঘটনাটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

মালদ্বীপের নৌবিদ্যা কখনো লিখিত হয়নি—এমন ধারণা সম্ভবত সঠিক নয়। বরং সমস্যা ছিল সংরক্ষণে। বইগুলো রাজপ্রাসাদ বা কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে থাকার পরিবর্তে দ্বীপে দ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেগুলো তালিকাভুক্ত হয়নি, সম্পাদিত হয়নি, মুদ্রিত হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

হারিয়েছে বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু

একটি সমাজের জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার অর্থ সবসময় এই নয় যে সেই জ্ঞান কখনো লিখিত ছিল না। অনেক সময় হারিয়ে যায় জ্ঞান সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান।

একটি রাজকীয় গ্রন্থাগার ভেঙে ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো শিক্ষকের নোট তার পরিবারের কাছে থেকে যেতে পারে। কোনো দ্বীপের পুরোনো ঘরে পড়ে থাকতে পারে এমন একটি পাণ্ডুলিপি, যার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের কোনো ধারণাই নেই।

মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে বলে উপলব্ধ প্রমাণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

এই কারণেই ইবনে মাজিদের পঞ্চদশ শতকের সামুদ্রিক নির্দেশিকা ‘কিতাব আল-ফাওয়ায়েদ’-এর মতো গ্রন্থ দিভেহি ভাষায় অনুবাদ করার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ ধরনের অনুবাদ শুধু একটি পুরোনো আরবি গ্রন্থকে স্থানীয় ভাষায় পৌঁছে দেবে না। এটি মালদ্বীপের নিজস্ব হারানো নৌ-জ্ঞান বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিভাষাগত কাঠামোও তৈরি করতে পারে।The Maldives: A Garland of Islands in the Indian Ocean

ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস

নৌবিদ্যার ইতিহাস পুনরুদ্ধার শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নও।

নক্ষত্র, বাতাস, ঋতু, কম্পাস, নৌযান কিংবা সমুদ্রপথ বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো, সেগুলো কেবল শব্দ নয়। এগুলোর মাধ্যমে একটি সমাজ প্রকৃতিকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করত, তার ধারণাও পাওয়া যায়।

নাকাই, মালিমি, নেভিকান কিংবা দিগুফিলার মতো শব্দ তাই পুরোনো ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন নিদর্শন নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর জ্ঞানব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশ।

এই জ্ঞান পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু বিখ্যাত নাবিকদের গল্প পুনরাবৃত্তি করলেই হবে না। প্রয়োজন পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করা, দ্বীপভিত্তিক মৌখিক ইতিহাস নথিবদ্ধ করা, পুরোনো নৌযন্ত্র সংরক্ষণ করা, বিলুপ্তপ্রায় নৌ-পরিভাষা সংগ্রহ করা এবং ভারত মহাসাগরের অন্যান্য নৌসভ্যতার লিখিত জ্ঞানের সঙ্গে মালদ্বীপের ঐতিহ্যের তুলনা করা।

সময় এখানে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।

কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা একটি বই হারিয়ে যেতে পারে। কোনো বৃদ্ধ নাবিকের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি বিশেষ শব্দের ব্যবহার। একটি লোককথা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সেই কাহিনির প্রযুক্তিগত অর্থ বোঝার মতো সামাজিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে যেতে পারে।

তাই মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজ এখন শুধু অতীতকে জানার চেষ্টা নয়; এটি একটি হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানব্যবস্থাকে আবার পাঠযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ।

মালদ্বীপের ইতিহাস মূলত সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ কথোপকথনের ইতিহাস। দ্বীপগুলোকে আলাদা করে রাখা সেই সমুদ্রই আবার তাদের ভারত মহাসাগরের বিশাল বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

আজ সেই ইতিহাস ফিরে পেতে হলে সমুদ্রের দিকে তাকানোর পাশাপাশি নিজেদের পুরোনো স্মৃতি ও জ্ঞানভাণ্ডারের দিকেও তাকাতে হবে।

যে প্রমাণগুলো এখনও টিকে আছে, সেগুলো অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্য কেবল মুখে মুখে চলা কিছু কাহিনির সমষ্টি ছিল না। এর পেছনে ছিল নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাব-নিকাশ, মৌসুমি বায়ুর জ্ঞান, নৌযন্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের একটি সমৃদ্ধ কাঠামো।

অনেক বই হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু কায়রোর পুরোনো দলিল, দ্বীপের লোককথা, রাজপরিবারের ইতিহাস, টিকে থাকা নৌ-পরিভাষা এবং হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির স্মৃতি—সব মিলিয়ে সেই জ্ঞানের কিছু অংশ এখনও আমাদের সামনে রয়েছে।

প্রশ্ন এখন একটাই—মালদ্বীপ কি তার নিজস্ব সামুদ্রিক ইতিহাসের সেই বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলো আবার একত্র করতে পারবে?

কারণ মালদ্বীপের নৌ-ইতিহাস শুধু জাহাজ কোথায় গিয়েছিল তার গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের গল্প, যারা আকাশ, বাতাস ও সমুদ্রকে পড়ে নিজেদের পথ তৈরি করেছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

উসাইন বোল্টের বিশ্বরেকর্ড ছাড়িয়ে গেল চীনের মানবাকৃতির রোবট

সমুদ্রের বুকের হারানো বিজ্ঞান: মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের গল্প

০৪:৫৪:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ভারত মহাসাগরের জলপথে নৌযান চালিয়ে এসেছে মালদ্বীপের মানুষ। বাতাসের গতিপথ, নক্ষত্রের অবস্থান, সমুদ্রের স্রোত এবং মৌসুমি পরিবর্তন—এসবের সূক্ষ্ম পাঠের ওপর নির্ভর করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মালদ্বীপের নাবিকেরা দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে দূরদেশে যাতায়াত করেছেন। অথচ এই দীর্ঘ সামুদ্রিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—কীভাবে তারা সমুদ্রপথ নির্ণয় করতেন—তার লিখিত ইতিহাস আজও অত্যন্ত অসম্পূর্ণ।

এর একটি কারণ হতে পারে, নৌ-জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তা শেখানো হতো মুখে মুখে, হাতে-কলমে এবং বাস্তব নৌযাত্রার মধ্য দিয়ে। লিখিত নথি ছিল, কিন্তু সেগুলোর বড় অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

তারপরও ছড়িয়ে থাকা প্রমাণগুলো একত্র করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। মালদ্বীপের নৌবিদ্যা ছিল নিছক অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাব-নিকাশ, মৌসুমি বায়ু সম্পর্কে জ্ঞান, দিক নির্ণয়ের কৌশল এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ।

কায়রোর এক ইহুদি উপাসনালয়ে মালদ্বীপের ছাপ

মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সূত্র পাওয়া গেছে মালদ্বীপে নয়, মিসরের কায়রোতে।

১৮৮০-এর দশকে কায়রোর একটি ইহুদি উপাসনালয়ের সংরক্ষণাগার থেকে বিপুলসংখ্যক পুরোনো দলিল উদ্ধার হয়। এসব নথির মধ্যে ১১৪১ সালের একটি চিঠি ছিল, যা সুদানের আইধাব বন্দর থেকে লিখেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদি ব্যবসায়ী নাহরাই বিন আলান।

চিঠিতে তিনি একটি আসন্ন সমুদ্রযাত্রার কথা উল্লেখ করেন। যে জাহাজে তিনি যাত্রা করছিলেন, সেটির সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘দিবাজি’ নামের একটি পরিচয়। মধ্যযুগীয় আরবি লেখকদের কাছে মালদ্বীপের একটি প্রচলিত নাম ছিল ‘আল-দিবাজাত’। ফলে এই নাম মালদ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা তৈরি করে।

জাহাজটির নাবিক বা নাখুদা ছিলেন আলি নামের একজন ব্যক্তি। জাহাজটির নাম ছিল আল-মুবারক। এটি ইয়েমেন থেকে সিলন পর্যন্ত যাত্রা করেছিল এবং এর পণ্যবাহী অংশে কড়ি ছিল।

চিঠির আরেকটি তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রার সময় ছিল মে মাস—যে সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হতে শুরু করে এবং ভারত মহাসাগরের পূর্বমুখী যাত্রার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

অর্থাৎ, একজন অভিজ্ঞ নাবিকের কাছে সময় নির্বাচন কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। মৌসুমি বাতাস ছিল সমুদ্রযাত্রার মৌলিক জ্ঞান।The Maldives at the Crossroads of the Indian Ocean

লোককথার ভেতরেও লুকিয়ে আছে নৌবিদ্যার তথ্য

মধ্যযুগের পরবর্তী সময় থেকে মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাসের বিদেশি লিখিত সূত্র অনেকটাই দুর্লভ হয়ে যায়। তখন সামনে আসে স্থানীয় স্মৃতি ও লোককথা।

বুরারা ওয়াহাকা নামে পরিচিত দীর্ঘ আখ্যানের মধ্যে ফেহেন্দু উসমান রাধুন, বুরাকি রানিন এবং বোদু থাকুরুফানুর মতো ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিতুল্য চরিত্রের কাহিনি রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এটি লিখিত ও মুদ্রিত রূপ পায়।

এই ধরনের কাহিনিকে সরাসরি ইতিহাসের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু এর মধ্যে থাকা প্রযুক্তিগত বিবরণকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই।

কারণ কোনো গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে হলে তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো শ্রোতাদের কাছে বোধগম্য হতে হয়। নক্ষত্রের অবস্থান, নৌযাত্রার সময়, বাতাসের ধরন কিংবা দিক নির্ণয়ের মতো বিষয় যদি গল্পে স্বাভাবিকভাবে আসে, তবে তা সেই সমাজের বাস্তব জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

নিসফু হান্ধেইগিরিনের গল্পে এর একটি চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। তিনি একজন জ্যোতির্বিদ হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি শিশুকে রাতের আকাশে নির্দিষ্ট একটি নক্ষত্র দেখিয়ে বলেন, সেটি যখন মধ্যাকাশে পৌঁছাবে, তখন যেন তাকে জাগানো হয়।

সমুদ্রে নাবিকদের জন্য কোনো নক্ষত্রের মধ্যরেখায় পৌঁছানোর সময় পর্যবেক্ষণ করে রাতের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। গল্পের এই ছোট্ট ঘটনাটি তাই একটি বড় বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—আকাশ পর্যবেক্ষণ ছিল নৌজীবনের পরিচিত জ্ঞান।

বুরাকি রানিনের কাহিনিতে নাবিকের বিশেষজ্ঞ ভূমিকা

বুরাকি রানিনের সমুদ্রযাত্রার কাহিনিতে নৌবিদ্যার আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।

তার জাহাজে ছিল ২৫ জন কর্মী, একজন কমান্ডার এবং আলাদাভাবে একজন অভিজ্ঞ মালিমি বা নাবিক। এই আলাদা পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, জাহাজ চালানো আর নৌপথ নির্ধারণ করা একই দক্ষতা ছিল না।

হুভাধু কান্দু অতিক্রমের সময় অভিজ্ঞ মালিমি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন ইউবুশেমুকে হাল ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মালিমি তাকে কম্পাস দেখিয়ে কোন দিকে জাহাজ চালাতে হবে তা বোঝান এবং সেই দিকটি চিহ্নিত করে দেন।

গল্পের পরবর্তী অংশে ইউবুশেমু নিজের মতো করে সেই পথ পরিবর্তন করে।

এখানে গল্পের নাটকীয়তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর প্রযুক্তিগত ভাষা। শ্রোতারা কম্পাস, দিক নির্ধারণ, হাল ধরা এবং নাবিকের বিশেষজ্ঞ ভূমিকার ধারণা বুঝতেন বলেই এমন বিবরণ কাহিনিতে স্বাভাবিকভাবে এসেছে।

বুরাকি রানিনের পরবর্তী আচরণও নৌ-ঐতিহ্যের আরেকটি দিক সামনে আনে। তিনি একের পর এক ‘নাকাই’ বা নক্ষত্রভিত্তিক সময়ের নাম উল্লেখ করে দেশে ফেরার সময় পিছিয়ে দেন।

নাকাই ছিল শুধু ক্যালেন্ডারের একটি একক নয়। প্রতিটি সময়পর্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট নক্ষত্র, বাতাস ও সমুদ্রের পরিস্থিতির সম্পর্ক ছিল। ফলে এগুলো জানা মানে ছিল সমুদ্র কখন যাত্রার জন্য উপযুক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বোঝা।

আরব নাবিকেরা একই ধরনের মৌসুমি জ্ঞানকে ‘মাওসিম’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতেন। নাম আলাদা হলেও ভারত মহাসাগরের নাবিক সমাজগুলো সমুদ্রের মৌসুমি চরিত্রকে যে গভীরভাবে বুঝত, তার একটি সাধারণ কাঠামো এখানে দেখা যায়।

বোদু থাকুরুফানু ও নক্ষত্র দেখে পথ নির্ধারণ

মালদ্বীপের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বোদু থাকুরুফানুর কাহিনিতেও নৌবিদ্যার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট।

পর্তুগিজ দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর জন্য তিনি বেশি পরিচিত হলেও ঐতিহ্যগত বিবরণে তাকে একজন প্রশিক্ষিত নাবিক হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। শৈশব থেকেই তাকে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ও নাকাই সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

সিলন থেকে ফেরার সময় তার নৌযাত্রার বিবরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদিন দুপুরে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হতো। নৌযানের অভিজ্ঞ নাবিক নিজের হিসাব করতেন, একই সঙ্গে থাকুরুফানুও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও হিসাব রাখতেন।

এটি কোনো সাধারণ আকাশ দেখার দৃশ্য নয়। এখানে রয়েছে নিয়মিত পরিমাপ, হিসাব এবং ফলাফল যাচাইয়ের প্রক্রিয়া।

এই কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের একটি নাম ছিল ‘দিগুফিলা’। এটি এমন একটি বোর্ড, যার সাহায্যে নক্ষত্র বা অন্য কোনো জ্যোতিষ্কের উচ্চতা পরিমাপ করা হতো। আরেকটি শব্দ ‘গোয়িধুরুভান’ পর্তুগিজ উৎস থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।

দুটি শব্দের পাশাপাশি থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নির্দেশ করে। ইউরোপীয় প্রভাবের সময়ে নতুন ধরনের যন্ত্র বা পরিভাষা মালদ্বীপে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু আকাশের উচ্চতা মেপে নৌপথ নির্ধারণের জ্ঞান তারও আগে সেখানে ছিল।

আরব নাবিক ইবনে মাজিদ ও সুলাইমান আল-মাহরির ব্যবহৃত ‘খাশাবা’ নামের যন্ত্রের সঙ্গেও দিগুফিলার মিল রয়েছে। ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন নৌসমাজের মধ্যে যে জ্ঞান আদান-প্রদান ছিল, এটি তারই একটি ইঙ্গিত।

নৌবিদ্যা ছিল রাষ্ট্রীয় জ্ঞানও

পরবর্তী শতাব্দীর নথিপত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রকাশ করে—মালদ্বীপে নৌবিদ্যা শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা ছিল না; তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

মোহাম্মদ ইব্রাহিম লুথফির গবেষণায় সপ্তদশ শতকের ধিয়ামিগিলি শাসনপর্ব সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য উঠে আসে, যেখানে নৌবিদ্যার প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠান এবং বইয়ের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

‘নেভিকান’ শব্দটি বিদেশে নিজস্ব নৌযানে যাতায়াতকারী দক্ষ নাবিকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তাদের ওপর ছিল ‘রানাহামাদি’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় পদ—রাজকীয় নৌযানের প্রধান, রাজকীয় বহরের অধিনায়ক এবং রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা।

এতে স্পষ্ট হয়, নৌযাত্রার জ্ঞান ছিল রাষ্ট্র পরিচালনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মৌখিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি বইও ছিল

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—মালদ্বীপের নৌবিদ্যা কি কখনো লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল?

উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ।

লুথফির গবেষণায় মাদথোদা এলাকায় একটি নৌবিদ্যার শিক্ষাকেন্দ্রের কথা উঠে আসে। স্থানীয় স্মৃতিতে সেখানে নৌচালনা এবং নাকাই সম্পর্কিত বহু বই থাকার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত স্থানীয় কিছু মানুষ এসব বই দেখেছেন বলেও লুথফি জানতে পেরেছিলেন।

পরে গাফু ধালু ভিলিঙ্গিলিতে তিনি এমন একটি হাতে লেখা নাকাইয়ের বইয়ের সন্ধান পান, যা মাদথোদা গান্দুভারু থেকে এসেছিল। বইটি দিভেহি আকুরু লিপিতে লেখা ছিল। কিন্তু মালিক সেটি রাষ্ট্রের কাছে দিতে বা এমনকি এর অনুলিপিও দিতে রাজি হননি।

এই ঘটনাটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

মালদ্বীপের নৌবিদ্যা কখনো লিখিত হয়নি—এমন ধারণা সম্ভবত সঠিক নয়। বরং সমস্যা ছিল সংরক্ষণে। বইগুলো রাজপ্রাসাদ বা কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে থাকার পরিবর্তে দ্বীপে দ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেগুলো তালিকাভুক্ত হয়নি, সম্পাদিত হয়নি, মুদ্রিত হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

হারিয়েছে বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু

একটি সমাজের জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার অর্থ সবসময় এই নয় যে সেই জ্ঞান কখনো লিখিত ছিল না। অনেক সময় হারিয়ে যায় জ্ঞান সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান।

একটি রাজকীয় গ্রন্থাগার ভেঙে ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো শিক্ষকের নোট তার পরিবারের কাছে থেকে যেতে পারে। কোনো দ্বীপের পুরোনো ঘরে পড়ে থাকতে পারে এমন একটি পাণ্ডুলিপি, যার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের কোনো ধারণাই নেই।

মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে বলে উপলব্ধ প্রমাণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

এই কারণেই ইবনে মাজিদের পঞ্চদশ শতকের সামুদ্রিক নির্দেশিকা ‘কিতাব আল-ফাওয়ায়েদ’-এর মতো গ্রন্থ দিভেহি ভাষায় অনুবাদ করার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ ধরনের অনুবাদ শুধু একটি পুরোনো আরবি গ্রন্থকে স্থানীয় ভাষায় পৌঁছে দেবে না। এটি মালদ্বীপের নিজস্ব হারানো নৌ-জ্ঞান বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিভাষাগত কাঠামোও তৈরি করতে পারে।The Maldives: A Garland of Islands in the Indian Ocean

ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস

নৌবিদ্যার ইতিহাস পুনরুদ্ধার শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নও।

নক্ষত্র, বাতাস, ঋতু, কম্পাস, নৌযান কিংবা সমুদ্রপথ বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো, সেগুলো কেবল শব্দ নয়। এগুলোর মাধ্যমে একটি সমাজ প্রকৃতিকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করত, তার ধারণাও পাওয়া যায়।

নাকাই, মালিমি, নেভিকান কিংবা দিগুফিলার মতো শব্দ তাই পুরোনো ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন নিদর্শন নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর জ্ঞানব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশ।

এই জ্ঞান পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু বিখ্যাত নাবিকদের গল্প পুনরাবৃত্তি করলেই হবে না। প্রয়োজন পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করা, দ্বীপভিত্তিক মৌখিক ইতিহাস নথিবদ্ধ করা, পুরোনো নৌযন্ত্র সংরক্ষণ করা, বিলুপ্তপ্রায় নৌ-পরিভাষা সংগ্রহ করা এবং ভারত মহাসাগরের অন্যান্য নৌসভ্যতার লিখিত জ্ঞানের সঙ্গে মালদ্বীপের ঐতিহ্যের তুলনা করা।

সময় এখানে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।

কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা একটি বই হারিয়ে যেতে পারে। কোনো বৃদ্ধ নাবিকের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি বিশেষ শব্দের ব্যবহার। একটি লোককথা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সেই কাহিনির প্রযুক্তিগত অর্থ বোঝার মতো সামাজিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে যেতে পারে।

তাই মালদ্বীপের সামুদ্রিক ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজ এখন শুধু অতীতকে জানার চেষ্টা নয়; এটি একটি হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানব্যবস্থাকে আবার পাঠযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ।

মালদ্বীপের ইতিহাস মূলত সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ কথোপকথনের ইতিহাস। দ্বীপগুলোকে আলাদা করে রাখা সেই সমুদ্রই আবার তাদের ভারত মহাসাগরের বিশাল বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

আজ সেই ইতিহাস ফিরে পেতে হলে সমুদ্রের দিকে তাকানোর পাশাপাশি নিজেদের পুরোনো স্মৃতি ও জ্ঞানভাণ্ডারের দিকেও তাকাতে হবে।

যে প্রমাণগুলো এখনও টিকে আছে, সেগুলো অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—মালদ্বীপের নৌ-ঐতিহ্য কেবল মুখে মুখে চলা কিছু কাহিনির সমষ্টি ছিল না। এর পেছনে ছিল নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাব-নিকাশ, মৌসুমি বায়ুর জ্ঞান, নৌযন্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের একটি সমৃদ্ধ কাঠামো।

অনেক বই হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু কায়রোর পুরোনো দলিল, দ্বীপের লোককথা, রাজপরিবারের ইতিহাস, টিকে থাকা নৌ-পরিভাষা এবং হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির স্মৃতি—সব মিলিয়ে সেই জ্ঞানের কিছু অংশ এখনও আমাদের সামনে রয়েছে।

প্রশ্ন এখন একটাই—মালদ্বীপ কি তার নিজস্ব সামুদ্রিক ইতিহাসের সেই বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলো আবার একত্র করতে পারবে?

কারণ মালদ্বীপের নৌ-ইতিহাস শুধু জাহাজ কোথায় গিয়েছিল তার গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের গল্প, যারা আকাশ, বাতাস ও সমুদ্রকে পড়ে নিজেদের পথ তৈরি করেছিল।