ব্রিটেনের সরকারি খাতে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পালান্টিরের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির রাজনৈতিক অবস্থান, মার্কিন সীমান্তরক্ষী ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ এবং রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় এর গভীর সম্পৃক্ততা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। তবে এসব কারণে পালান্টিরকে ব্রিটিশ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা উল্টো দেশটির রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকেই দুর্বল করতে পারে।
ব্রিটেনে পালান্টির নিয়ে বিতর্ক
পালান্টিরের প্রযুক্তি ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের সফটওয়্যার অতিরিক্ত ১ লাখ ১০ হাজার অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরি করতে সহায়তা করেছে। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আগ্রাসী লবিং নিয়েও ব্রিটেনে অস্বস্তি রয়েছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দুটি কমিটি পালান্টিরকে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাজ বন্ধ করেছেন। কিন্তু মেট পুলিশের প্রধান স্যার মার্ক রাওলি বলেছেন, পালান্টিরের সময় সাশ্রয়ী সফটওয়্যার ছাড়া শত শত পুলিশ কর্মকর্তাকে সামনের সারির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য কাজে নিতে হতে পারে।
সরকারি ব্যবস্থায় প্রযুক্তির মূল্য
জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় পালান্টিরের কাজ ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের তুলনায় বেশি কার্যকর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি ডিজিটাল প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ব্যয়বহুল জটিলতায় পরিণত হয়েছে। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পালান্টিরের প্রযুক্তিকে কার্যকর মনে করে, শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে সেটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক মডেল নিয়েও নানা আশঙ্কা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, পালান্টির ব্রিটিশ সরকারি তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। আবার অনেকে ‘লক-ইন’ বা একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি দেখছেন।
তবে পালান্টির মূলত সফটওয়্যার লাইসেন্স দেয় এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তার জন্য বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী পাঠায়। গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের তথ্য তাদের কাছেই থাকে। চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে নির্ধারণ করা সরকারি ক্রেতাদের দায়িত্ব। কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য হয়ে উঠলে সেটি একই সঙ্গে তার প্রযুক্তির কার্যকারিতারও প্রমাণ হতে পারে।
রাজনীতি দিয়ে প্রযুক্তি বাছাইয়ের ঝুঁকি
পালান্টিরের রাজনৈতিক অবস্থানও সমালোচনার বড় কারণ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পিটার থিয়েল রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সমালোচনামূলক মত দিয়েছেন। মার্কিন সরকারের বিতর্কিত নীতি ও অভিবাসন কার্যক্রমের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাজ নিয়েও আপত্তি রয়েছে।
কিন্তু কোনো সরকারি ঠিকাদারকে তার চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক মতামত বা নির্বাচিত কোনো সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে বাদ দেওয়া হলে তা উদারনৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হতে পারে। রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা যে সমালোচকেরা যুক্তরাষ্ট্রে অপছন্দ করেন, একই পদ্ধতি ব্রিটেনে প্রয়োগ করাও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে উঠলে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়ে তোলার আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে বিদেশি প্রতিযোগিতা বন্ধ করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিম সুবিধা দেওয়া উদ্ভাবনের জন্য কার্যকর পথ নয়।
ব্রিটেনের জন্য তাই পালান্টিরকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে চুক্তির ন্যায্যতা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সরকারি প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি বানানো হলে শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের দুর্বল রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পালান্টির নিয়ে বিতর্কে তাই শুধু প্রতিষ্ঠানটির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তার প্রযুক্তি বাস্তবে কী মূল্য দিচ্ছে এবং রাষ্ট্র কীভাবে সেই প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটেনে পালান্টির নিয়ে বিতর্ক মূলত প্রযুক্তি, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সংঘাত। সমালোচনা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের সরকারি প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















