ভারতের স্বাধীনতার ৮০তম বছরে দেশটির জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তা নতুনভাবে নির্মাণের চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দলটি জাতীয় প্রতীক, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে সাজানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে বিশ্লেষকেরা ভারতের সম্ভাব্য ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ গঠনের প্রকল্প হিসেবে দেখছেন।
১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘বন্দে মাতরম’ গানটি মোদির আগমনের সময় বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়। ‘মাতৃভূমি ভারত’-এর প্রতি আবেগঘন শ্রদ্ধা নিবেদনকারী এই গানটির রচনার ১৫০ বছর পূর্তিও এবার উদযাপন করা হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে গানটির পরিবেশনে বাধা দেওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের দিকে অগ্রযাত্রা
ভারতের জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় গানের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর জাতীয় প্রতীক নির্ধারণের সময় গানটিতে হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ থাকায় মুসলিমদের জন্য তা বর্জনীয় হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। বিজেপির বর্তমান রাজনৈতিক প্রকল্পে সেই আপত্তি আর আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে হিন্দু ঐতিহ্যকে আরও দৃশ্যমান করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় রেল পরিষেবা, সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতীক এবং জাতীয় হকি দলের পুরুষ খেলোয়াড়দের পোশাকে গেরুয়া রঙের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর নামে থাকা একটি কর্মসংস্থান কর্মসূচির নামও পরিবর্তন করে এমন একটি সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ভগবান রামের নাম যুক্ত রয়েছে।
ইতিহাসের নায়কদের নতুনভাবে উপস্থাপন
বিজেপির রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প শুধু ধর্মীয় প্রতীকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকেও নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা নিয়ে বিজেপির সমালোচনা দীর্ঘদিনের। দলটির প্রচারে নেহরুকে জাতীয় নির্মাতার বদলে অভিজাত শ্রেণির একজন অযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিপরীতে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলকে আরও বড় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিজেপির দাবি, প্যাটেলকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। গুজরাটে প্যাটেলের বিশাল মূর্তি নির্মাণও এই পুনর্মূল্যায়নের প্রতীক।
একইভাবে, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বিরোধী বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুকেও স্বাধীন ভারতের প্রকৃত প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি মোদিকে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরতে গত জুনে মন্ত্রিসভা বিশেষভাবে উদযাপন করেছে।
‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ কতটা সফল?
তবে বিজেপির এই ইতিহাস পুনর্লিখন ও জাতীয় পরিচয় পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা সমাজে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে—এমন প্রমাণও মিলছে না। দিল্লিতে গত মাসে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল ভারতের সংবিধানের কপি। তারা বি আর আম্বেদকর, ভগত সিং এবং মহাত্মা গান্ধীর ছবি বহন করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার স্লোগানও ব্যবহার করেছে।
এ ঘটনা দেখিয়েছে, স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিজেপির কথিত ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’-এর প্রতীকগুলো এখনও প্রথম প্রজাতন্ত্রের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি।
ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নতুনভাবে সাজানোর এই প্রচেষ্টা তাই একদিকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন, অন্যদিকে ইতিহাস ও জাতীয় স্মৃতিকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত জাতির পরিচয়কে নতুন করে নির্মাণ করা যতটা কঠিন, প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও প্রতীককে বদলে দেওয়া তার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠছে।
ভারতের দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র, নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয় পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















