জাপানের অর্থনীতি দীর্ঘ স্থবিরতা ও মূল্যপতনের যুগ পেরিয়ে নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করলেও দেশটির একটি বড় কর্মজীবী গোষ্ঠী সেই পরিবর্তনের সুফল থেকে আবারও পিছিয়ে পড়ছে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে কর্মজীবনে প্রবেশ করা ‘আইস-এজ’ প্রজন্মের বহু কর্মী বর্তমানে ৪০ ও ৫০-এর কোঠায়। চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় যেমন তারা সংকটের মুখে পড়েছিলেন, তেমনি এখন বেতন বৃদ্ধির নতুন ঢেউয়েও তারা তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাবল-পরবর্তী প্রজন্মের দুর্ভাগ্য
টোকিওর একটি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের স্টকরুমে প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছেন ৫০ বছর বয়সী তোরিগোয়ে আতসুশি। দীর্ঘ সময়ে তাঁর আয় সামান্যই বেড়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি বোনাস কমানো ও বেতন কাঠামো পরিবর্তন করায় তাঁর বার্ষিক আয় নেমে এসেছে প্রায় ৩৬ লাখ ইয়েনে, যা প্রায় ২২ হাজার ৬০০ ডলারের সমান।
এর মধ্যেই তিনি দেখেছেন, একই প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বেতনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। তরুণদের বেশি বেতন পাওয়াকে তিনি স্বাগত জানালেও তাঁর প্রশ্ন, পুরোনো কর্মীদের বেতনও কেন বাড়ানো হবে না?
১৯৮০-এর দশকের অর্থনৈতিক বুদ্বুদের সময় জাপানি কোম্পানিগুলো বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ করত। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বুদ্বুদ ফেটে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিদ্যমান কর্মীদের ছাঁটাই করা কঠিন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নিয়োগ কমিয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগের অনুপাত প্রায় তিন থেকে ২০০০ সালের মধ্যে একের নিচে নেমে যায়।
অনেক তরুণ অসংখ্য আবেদন করেও নিয়মিত চাকরি পাননি। ফলে তাঁরা অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কাজে ঢুকে পড়েন। জাপানের শ্রমবাজারে নিয়মিত কর্মীরা আইনি সুরক্ষা ও জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেলেও অনিয়মিত কর্মীরা একই ধরনের কাজ করেও কম আয় করেন এবং অর্থনৈতিক মন্দায় আগে চাকরি হারান।
আয় বাড়ছে তরুণদের, পিছিয়ে মধ্যবয়সীরা
সময় ও শ্রমিক সংকটের কারণে ‘আইস-এজ’ প্রজন্মের নিয়মিত চাকরিতে অংশগ্রহণ অনেকটাই পুরোনো প্রজন্মের কাছাকাছি এসেছে। কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন অনিয়মিত চাকরিতে থাকা কর্মীরা পরে নিয়মিত চাকরিতে ফিরলেও আয়ে সহজে সমতা আনতে পারেননি। নিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও আরেকটি সমস্যা ছিল—বুদ্বুদ যুগে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদগুলোতে জায়গা দখল করে রাখায় পরবর্তী প্রজন্মের পদোন্নতি বিলম্বিত হয়েছে।
জাপানের অর্থনীতিতে এখন মূল্যস্ফীতি ফিরেছে, মজুরি বাড়ছে এবং চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতাও বাড়ছে। তবে এর বড় সুবিধা পাচ্ছেন তরুণরা। শ্রমিকের ঘাটতির কারণে কোম্পানিগুলো নতুন কর্মী আকর্ষণ ও ধরে রাখতে বেশি বেতন দিচ্ছে।
দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ কুমানো হিদেওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত ২০ ও ৩০-এর কোঠার কর্মীদের নামমাত্র মজুরি পাঁচ বছর আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৬ শতাংশ বেশি ছিল। বিপরীতে ৫০-এর শুরুর দিকের কর্মীদের নামমাত্র মজুরি কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
বার্ধক্যে সামনে বড় সংকট
এই প্রজন্মের দীর্ঘদিনের কম আয় তাঁদের সঞ্চয় ও আজীবন উপার্জন দুটোকেই দুর্বল করেছে। জাপানের পেনশন ব্যবস্থা আজীবন আয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় কম আয়ের দীর্ঘ ইতিহাস ভবিষ্যতে কম পেনশনে পরিণত হতে পারে। অর্থনীতিবিদ কুমানোর আশঙ্কা, মন্দার সময়ে কর্মজীবনে প্রবেশের দুর্ভাগ্য এই প্রজন্মকে সারাজীবন বহন করতে হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে আবাসনও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বয়স্ক জাপানিদের তুলনায় এই প্রজন্মের নিজস্ব বাড়ির মালিক হওয়ার হার কম, আবার বয়স্ক ভাড়াটিয়াদের জন্য দেশটির ভাড়া-বাড়ির বাজারও অনুকূল নয়। আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে জনসংখ্যাগত কারণে। ‘আইস-এজ’ প্রজন্ম অবসরে যাওয়ার সময় তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তুলনামূলক ছোট হওয়ায় কমসংখ্যক কর্মীকে বেশি অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন বহন করতে হবে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
‘আইস-এজ’ প্রজন্মের সমস্যা সমাধানে জাপান সরকার বহু বছর ধরেই কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সরকার এই প্রজন্মকে কেন্দ্র করে তিন বছরের একটি পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। এতে সম্পদ গঠন থেকে আবাসন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ দিলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। কম পেনশন, সীমিত সঞ্চয়, আবাসন সংকট এবং ভবিষ্যতে কল্যাণভাতার ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















