কমপিউটার কমপিউটিং-য়ে কমপিউটার হলো ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র বা মেশিন, এবং কমপিউটিং বলতে বোঝায় কমপিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপাত্তের প্রক্রিয়াজাতকরণ, গাণিতিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে ’ইনপুট’ থেকে ’আউটপুট’প্রাপ্তি বা ক্যালকিউলেশন, এবং তথ্যের ব্যবস্থাপনা করাকে বোঝায়; এবং কমপিউটার নামক মেশিন দিয়ে এসব কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা হয়। নিত্যদিনের জীবনে আমরা যারা কমপিউটার ব্যবহার করছি, তাকে বলা হয় চিরায়ত বা ক্ল্যাসিকেল কমপিউটার। অপরদিকে, কমপিউটার সায়েন্স/বিঞ্জান ও ই্িঞ্জনীয়ারিং জগতে কোয়ান্টাম কমপিউটিং নামক নতুন কায়দার কমপিউটিং পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটেছে। এই পদ্ধতিতে- কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনন্য গুণাবলী, আচরণ ব্যবহার করে এমন সব সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে যেগুলোর সমাধান চিরায়ত বা ক্ল্যাসিকেল কমপিউটার দিয়ে মোটেই সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ের সঙ্গে কোয়ান্টাম হার্ডওয়ার, কোয়ান্টাম অ্যালগোরিদম ইত্যাদি সহ আরো অনেক বিষয় জড়িত রয়েছে।
ফলত,কোয়ান্টাম কমপিউটিং সুদৃঢ়ভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-কে ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, কোয়ান্টাম জগত মানে ক্ষুদ্রতম মাপের কণিকাদের জগত, এবং এইসব কণিকাদের গুণাবলি ও আচরণকে প্রকাশের জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যে মূলসূত্রগুলো রয়েছে – কোয়ান্টাম কমপিউটারে সেই সূত্রগুলোকে কাজে লাগিয়ে – দক্ষতার সঙ্গে জটিল গণনা বা কমপিউটেশন কর্মকাণ্ড করা হয়। কোয়ান্টাম কমপিউটারে যে ’কুবিট’ ব্যবহার হয়, সেগুলো বহু হাল-অবস্থায় (মাল্টিপল স্টেটে) থাকতে পারে, এবং পারে একই সময়ে যুগপৎভাবে, কিšতু ক্ল্যাসিকেল বাইনারি ’বিটগুলো’র এই গুণটি নেই, তারা পারে না। আবার, সাধারণত, কোয়ান্টাম মেকানিক্স – কি ঘটবে অথবা কি ঘটেছিলো বিষয়ে আগ বাড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে না। বরং সম্ভাব্য বা সম্ভাবনীয়তা (প্রবাবিলিটি)-র অজুহাত নিয়ে বলে : হয়ত হতে পারে অথবা হয়ত হতে পারত।
তাই, কোয়ান্টাম কমপিউটিং ও সংশ্লিষ্ট সব কিছু করতে হলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূলসূত্রগুলোকে বুঝতে পারার আবশ্যকতা রয়েছে। নীচে : কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তিনটি মূলসূত্র : সুপারপজিশন, ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া ও আনসারটেইনটি প্রিনসিপল বা অনিশ্চয়তা মূলসূত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে :
সুপারপজিশন/জড়িয়ে পড়া : কোয়ান্টাম জগতে, সুপারপজিশন (ঝঁঢ়বৎঢ়ড়ংরঃরড়হ) এমন একটি আইডিয়া বা পরিস্থিতি যেখানে : একটি অতিপারমাণবিক বা কোয়ান্টাম কণিকা অথবা কোয়ান্টাম সিস্টেম একই সময়ে যুগপৎ একাধিক বা বহু-হাল অবস্থায় থাকতে পারে। কেমন খটোমটো মনে হচ্ছে যেনো। একটা উদাহরণ দেয়া যাক তবে :
ধরা যাক যে আপনি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের কাছে যে পুকুরটি রয়েছে – সেই পুকুরের প্রশস্ত লম্বা বড়ো ঘাটিিটর সিঁড়ি বেয়ে একেবারে পুকুরের জলের খুব কাছে নেমে আসলেন, হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে জল ছোঁয়া যায়। ছোঁয়া যখন যায়ই – আপনি তাই লম্বা ঘাটের এধারে-ওধারে একই সময়ে জলের মধ্যে বেশ করে আঙুল ডুবিয়ে তুলেও নিলেন। এবারে, অবাক হয়ে দেখছেন যে এধার-ওধার দুই বিন্দু থেকেই তরঙ্গ বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, তাকিয়ে তাকিয়ে তরঙ্গমালার হিেেল্লাল দেখতে দেখতে দেখেন যে তরঙ্গগুলো অবশেষে অংশত আবৃত হয়ে (ওভারল্যাপ হয়ে) অপেক্ষাকৃত জটিল প্যাটার্ণ সৃষ্টি করছে। এটিই হলো তরঙ্গের ’সুপারপজিশন”। অনুরূপভাবে, কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, ব¯তু, যেমন : ইলেক্ট্র্রেন ও ফোটন-য়ের তরঙ্গসুলভ গুণাবলী রয়েছে, তাদের তরঙ্গসুলভ আচরণ/অস্তিত্বও বর্ধমান হাঊসের পুকুরের জলের তরঙ্গগুলোর মতো মিলিত হয়ে বা মিলেমিশে যা সৃষ্টি করে সেটিকেই আমরা ’সুপারপজিশন’ বলছি।
পুকুরের জলের উপরিভাগে তরঙ্গমালার সৃষ্টি করছে জলের গতিশীলতা; কিন্তু কোয়ান্টাম তরঙ্গের অবয়ব বা চেহারাপত্র সৃষ্টির ভিত্তি হলো গাণিতিক। গাণিতিক সমীকরণসমূহের কাজ হলো – কোনো ব¯তুর কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে কোথায় থাকার ’সম্ভাবনা’ রয়েছে, অথবা বিশেষ কোনো গুণাবলীর অধিকারি – বর্ণনা করা বা দেয়া। সমীকরণগুলোর সাহায্যে – কোনো ইলেক্ট্রন যদি সুনির্দিষ্ট গতিতে গতিশীল থাকে অথবা কোনো সুনির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে, – এসব বিষয়ে তথ্যাদি জানার ’সম্ভাব্যতা’ রয়েছে, থাকতে পারে। একটি ইলেক্ট্রোন যখন সুপারপজিশন অবস্থানে থাকে, আমরা মনে করতে পারি যে ইলেক্টনটির ভিন্ন অন্য রকমের হাল-অবস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে প্রতিটির হাল-অবস্থা আমাদেরকে ভিন্ন অন্যরকমের ফলাফল যে দিতে পারে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন : আমরা তো বলতেই পারি যে একটি ইলেক্ট্রন দুই ভিন্ন গতিবেগ নিয়ে সুপারপজিশনে রয়েছে বা একই সময়ে দুইটি ভিন্ন জায়গায় রয়েছে। সুপারপজিশন নামক পরিস্থিতিকে উপলব্ধি করতে পারলে হয়ত কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে, যেমন : কোয়ান্টাম কমপিউটার, সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহজ হবে।
কোয়ান্টাম সুপারপজিশন ধারণাটিকে ছবির মতো মনে আনা বা প্রত্যক্ষবৎ স্মরণ করা, তথা আত্মস্থ করে উপলব্ধি করা সহজ না-ও হতে পারে। পদার্থবিদ এরউইন শ্রোয়েডিংগারের ’শ্রোয়েডিংগারের বিড়াল’ (ঝপযৎস্খফরহমবৎ’ং পধঃ) নামক বিখ্যাত চিন্তাজাত থট ইক্সপেরিমেন্টের কাহিনির কথা বলা যাক। এই থট ইক্সপেরিমেন্টে শ্রোয়েঙিংগার – একটি বিড়ালকে সীল করা একটি বাক্সে রাখেন, বাক্সের ভেতরে কিছু বিষাক্ত বস্তুও দিয়ে দেন – এই বিষ বিড়ালটিকে এক ঘন্টার মধ্যে বিষাক্ত করে হয় মেরে ফেলবে – অথবা না-ও মেরে ফেলতে পারে। অত ঃপর, শ্রোয়েডিংগার প্রস্তাব করেন যে এক ঘন্টা বাদে – বলা যাবে যে সুপারপজিশন হাল-অবস্থায়, বিড়ালটি জীবিত আছে এবং বিড়ালটি মারা গেছে; তবে আবশ্যিক শতর্ হলো যে বাক্সটি তখনো পর্যন্ত সীল করা অবস্থায় রয়েছে, খোলা হয়নি এবং তখনো পর্যন্ত এলোপাতাড়ি পর্যবেক্ষণকর্মের মাধ্যমে : বিড়ালটি জীবিত নাকি মৃত, নির্ধারিত হয়নি। অর্থাৎ, বিড়ালটি জীবিত এবং বিড়ালটি মৃত – অবস্থায় রয়েছ্ েএই উদাহরণের সাহায্যে শ্রোয়েডিংগার আসলে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের উদ্ভটত্ব, বা হাস্যকর কিম্ভূতকিমারত্ব দেখাতে চেয়েছেন। অবশ্য, পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে সুপারপজিশনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে।
ইত্যবসরেই আমরা জানি যে কোয়ান্টাম মেকামিক্সে : কোনো সিস্টেম একই সময়ে বা যুগপৎ একাধিক বা বহু-হাল-অবস্থায় ততোক্ষণই থাকতে পারে যতোক্ষণ পর্যন্ত না মাপজোক করা হয়; অর্থাৎ সুপারপজিশনে থাকে। তাই, একই সময় – কণিকারা বহু-অবস্থানে থাকতে পারে অথবা কণিকারা বহু-শক্তি/বল সম্পন্ন অবস্থায় থাকতে পারে।
আমাদের নিত্যদিনের বাস্তব জীবনেও বাস্তব সুপারপজিশন দেখা যায়। যেমন : আমাদের চারদিকে আমরা যে আলো দেখছি – সেই আলো আসলে সূর্য ও অন্যান্য উৎস থেকে আগত অজ স্র অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ মিলে মিশে সৃষ্টি হচ্ছে। তরঙ্গের গতিশীলতা এরকম : উপরের দিকে চূড়া/শিখর পর্যন্ত উঠে যায় এবং চূড়া থেকে নিচে উপত্যকায় নেমে আসে, গতিশীলতার এই প্যাটার্ণ বারবার ঘটতে থাকে। এবং চমকপ্রদ ব্যাপার হলো যে, তরঙ্গগুলোর সৃষ্ট এইসব চূড়া ও উপত্যকা একই সমরয় বিভিন্ন দিকে চক্রাকারে ঘূর্ণন করে বা আবর্তিত হয়। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন বিপরীতমুখি হাল-অবস্থাগুলো আলোকে সুপারপজিশন অবস্থায় রাখছে।
আবার, দুইটি তরঙ্গ যে বিন্দুতে অংশত আবৃত হয় বা ওভারল্যাপ করে – এমন পরিস্থিতিতে, তরঙ্গ দুইটি গণিতের নিয়মে হয় যোগ হয়ে একটি তরঙ্গে পরিণত হবে নয়ত কাটাকুটি করে বিয়োগ হয়ে যাবে। এই যোগ-বিয়োগের ব্যাপারটিই হলো – সুপারপজিশন। একটি লাগসই উদাহরণ হলো, যেমন আপনি যখনই আপনার গিটারের তারগুলো টুংটাং শব্দ তুলে তিন বা ততোধিক স্বরের সংমিশ্রন ঘটিযে প্রীতিকর ঐকতান সৃষ্টি করেন ও শোনেন – তার অর্থ হলো যে তরঙ্গগুলোকে টীমওয়ার্ক করিয়ে যে অসাধারণ শ্রুতিমধুর শব্দ সৃষ্টি হলো – ধন্যবাদ দিতে হয় সুপারপজিশনকে! প্রতিটি তার যে শব্দ সৃষ্টি করছে – আমাদের কান পর্যন্ত আসার সময় নিজেদের মধ্যে যোগ-বিয়োগের হিসাবনিকাশ মিটিয়ে নিয়েছে। এটি হলো সুপারপজিশনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
কমপিউটিং-য়ের ক্ষেত্রে এই কোয়ান্টাম মূলসুত্রের সুগভীর নিহিত্যার্থ হলো যে – আমরা, কোয়ান্টাম কমপিউটারের সাহায্যে সমান্তরালে এবং একসঙ্গে অ-নে-ক অ-নে-ক ক্যালকিউলেশন বা গণনকর্ম করতে পারব।
ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া : কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলসুত্র হলো ’ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া’ অথবা বন্ধুত্বপূর্ণ সমঝোতা (বহঃধহমষবসবহঃ)। দুই বা বহু কোয়ান্টাম কণিকারা – পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে যতো দূরেই অবস্থান করুক না কেনো (এমনটি অ-নে-ক আলোক বর্ষ দূরে হলেও), তারা নিজেদের মধ্যে ’সম্পর্ক’ পাতিয়ে নেয় এবং এমনভাবে নিজেদের মধ্যে শিকলের আংটা বা কড়ার কায়দায় সংযুক্ত হয়ে পড়ে যে, তাদের হাল-অবস্থা পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল অবস্থায় থাকে, একে অন্যকে ছাড়া থাকতে পারে না। এভাবে, কোয়ান্টাম কণিকাদের জড়িয়ে পড়ার বা বন্ধুত্বপূর্ণ সমঝোতার বা জট পাকানোর ফেনোমেননটির তাৎপর্য হলো যে এটিকে ব্যবহার করে দ্রুততর যোগাযোগ ও কমপিউটিং বা গণনকর্ম সম্ভব হচ্ছে; কারণ, একটি কোয়ান্টাম কণিকার হাল-অবস্থা বদলে গেলে, তাৎক্ষণিকভাবে অন্যটির হাল-অবস্থাকেও প্রভাবিত করবে, তা সে দূ-রে অনেক দূ-রে যতো দূ-রে-ই থাকুক না কেনো। কোয়ান্টাম কণিকার এই ’ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া’-কে আইনস্টাইন বলেছেন : ’স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিস্ট্যান্স’।(আইনস্টাইনের কাছে উদ্ভট ছিলো যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দুইটি বস্তু বা পদার্থ দূরে ব-হু দূরে থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিকভাবে জড়িয়ে পড়ছে? তাঁর যুক্তি ছিলো যে কোয়ান্টাম তত্ত্বটি তবে অসম্পূর্ণ তত্ত্ব। অবশ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দুইটি বস্তু বা পদাথের্র কোয়ান্টাম বর্ণনা হলো যে দুই বস্ত বা পদার্থ হলো গাণিতিক অস্তিত্ব/স্বত্ত্¦া, এবং ’ওয়েভ ফাঙ্কশন’ নামে পরিচিত)।
আনসারটেইনটি প্রিনসিপ্ল বা অনিশ্চয়তা মূলসুত্র : আনসারটেইনটি প্রিনসিপল (ঁহপবৎঃধরহঃু ঢ়ৎরহপরঢ়ষব) বা অনিশ্চয়তা মূলসুত্রটি হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা মূলসুত্র নামেও পরিচিত। মূলসুত্রটি বলছে যে নিরত ঘূর্ণনরত কণিকার পজিশন বা অবস্থান এবং ভরবেগ নিখুঁতভাবে একই সময়ে, যুগপৎ মাপজোক করা সম্ভব নয়। কারণ, ব¯তুমাত্রই কখনো তরঙ্গ এবং কখনোবা কণিকা রূপে অবস্থান করে, যাকে ব¯তুর তরঙ্গ-কণিকা দ্বৈততা বলা হয়। কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ে, এই ’অনিশ্চয়তা’র গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো যে – কুবিট-য়ের মাপজোক করার সময় দুইটি সম্ভাব্য হাল-অবস্থার একটি ভেঙ্গে পড়তে বা কলাপস করতে পারে, এবং ফলস্বরূপ, কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ের সংঙ্গা, পরিভাষা, ব্যবহার :
এক অর্থে, মৌলিক কোয়ান্টাম কমপিউটিং হলো কমপিউটিং প্যারাডাইম; কমপিউটিং কমকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে রীতিমতো আপদমস্তক কোয়ান্টাম সূত্রগুলোর উপর নির্ভরশীল এবং তাই আউটপুটের জন্য ’সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিটি’র উপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ, যেমন :
ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারে ’বিটস’ ব্যবহার করা হয় এবং তথ্যের মজুতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বা প্রসেস করার জন্য মাত্র দুটো ডিজিট – হয় ’শূন্য (০)’ অথবা ’এক (১)’ ব্যবহার হয়। কিšতু কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ে ব্যবহৃত ’কুবিটস’ ’সুপারপজিশন’-য়ে থাকতে পারে, যার অর্থ : ’শূন্য (০)’ এবং ’এক (১)’ – একই সময়ে যুগপৎ বিদ্যমাণ থাকতে পারে, এবং বিদ্যমাণ থাকে বলেই কোয়ান্টাম কমপিউটার যুগপৎ অজস্র ক্যালকিউলেশন বা গণনকর্ম সম্পাদন করতে পারে।
অর্থাৎ, যাহোক, কমপিউটিং কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ক্ল্যাসিকেল কমপিউটার যখন – তথ্যকে মজুত রাখা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ’বিটস’-য়ের ওপর নির্ভরশীল, এবং মাত্র দুইটি ডিজিট – হয় ’শূন্য (০)’ অথবা ’এক (১)’ ব্যবহার করছে, অপরদিকে, কোয়ান্টাম কমপিউটার কিšতু ’কোয়ান্টাম কুবিট’ বা ’কুবিট’ ব্যবহার করে যুগপৎ অজস্র উপাত্ত জমা রাখতে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারছে। এবং সুপারপজিশন-য়ে বিদ্যমাণ থাকার জন্য যুগপৎ কমপিউটিং কর্মকাণ্ডও সম্ভব হচ্ছে।
অর্থাৎ, কুবিট – বিট-য়ের মতোই আচরণ করতে পারে এবং হয় ’শূন্য (০)’ অথবা ’এক (১)’-য়ে উপাত্তের মজুতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ যেমন করতে পারে, তেমনি আবার একই সময়ে যুগপৎ ’শূন্য (০)’ এবং ’এক (১)’-য়ের মিশ্রণ হয়ে বিদ্যমাণ হতে পারে বা থাকতে পারে। যখন, যুগপৎ ’শূন্য (০)’ এবং ’এক (১)’-য়ের মিশ্রণ ঘটে, অর্থাৎ সুপারপজিশনে বিদ্যমাণ কুবিট-য়ের ক্যালকিউলেশন বা গণনকর্ম সম্পাদনের সামর্থ্য গুনণীয়ক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। যেমন : দুইটি কুবিক থাকলে যুগপৎ চারটি উপাত্তের গণনকর্ম সম্পাদন করতে পারবে, তিনটি কুবিট থাকলে আটটি, এবং চারটি থাকলে ষোলোটি উপাত্তের গণনকর্মকাণ্ড করতে পারবে, ইত্যাদি। অবশ্য, ক্যালকিউলেশন বা গণনকর্ম সম্পাদন শেষে প্রতিটি কুবিট – আউটপুট হিসেবে কেবলমাত্র একটি একক বিট-য়ের তথ্যাদি জানাবে বা দেবে (আমাদের প্রত্যাশিত ফলাফল জানাবে) ।
তবে, বাস্তবে কোয়ান্টাম কমপিউটার কিসের বা কার উপরে ভরসা করে কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে থাকে? ’কোয়ান্টাম গেইটস’ বা ’কোয়ান্টাম লজিক গেইটস’ নামক কনসেপ্ট হলো কোয়ান্টাম কমপিউটারের অন্যতম অপরিহার্য্য একটি অংশ, যার কর্মকাণ্ড হলো কুবিটদের হাল-অবস্থার রূপান্তর ঘটানো এবং কোয়ান্টাম অ্যালগোরিদম, যাকে এক সেট নির্দেশনামা বলা যায় – যে নির্দেশনামা অনুযায়ী কোয়ান্টাম কমপিউটার ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে সুনিদির্ষ্ট সমস্যার সমাধান করে।
কোয়ান্টাম গেইটস-য়ের কর্মকাণ্ড উপলব্ধি করার পূর্বে ক্ল্যাসিকেল লজিক গেইটস-য়ের কর্মপ্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে, কোনোরকম গণিত ব্যবহার না করে, ঝালাই করে নেয়া যাক।
ক্ল্যাসিকেল লজিক গেইট : ’লজিক গেইট’ হলো ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক্স ও কমপিউটারের মৌলিক নির্মাণভিত্তি। আসলে, লজিক গেইট হলো ক্ষুদে ইলেক্ট্রনিক সার্কিট; এই সার্কিট একটি বা দুইটি ইনপুট নিয়ে – সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে, এবং মাত্র একটি আউপুট দেয়। ক্ল্যাসিকেল লজিক গেইটের ক্ষেত্রে ইনপুট এবং আউট পুট সবসময় ’বাইনারি’ হয়ে থাকে। তারা সব সময় কেবলমাত্র দুইটি মান/মূল্য : ’শূন্য’(০=অফ, নিচু/অনুচ্চ/ ’লোউ’, অথবা মিথ্যা/ফলস ) এবং ’এক’ (১= অন, উচ্চ/হাই, বা সত্য/ট্রু) ব্যবহার করে।
ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারের ক্ষেত্রে – বৈদ্যুতিক সিগনাল পাঠিয়ে বাইনারি ’এক (১)’ এবং ’শূন্য (০)’ বা ’বিটস’ প্রকাশ করা হয় বা ঘোষণা করা হয়। লজিক গেইটস হলো মূলগত মৌলিক অপারেশন ও এদের সাহায্যে দুই বিট – শূন্য (০) এবং এক (১) -য়ের মধ্যে বদলাবদলি করানো হয়; উদাহরণস্বরূপ, যেমন : ’অঘউ’, ’ ঙজ’ এবং ’ ঘঙঞ’। ধরা যাক : ঘঙঞ গেইট-য়ের সাহায্যে একটি ’বিট’কে শূন্য (০) থেকে এক-য়ে (১) (অথবা এক (১) থেকে শূন্য (০)-তে) বদলাবদলি করা হলো। আবার, অঘউ এবং ঙজ – দুই বিটের গেইটস, এবং এমতাবস্থায় : দুই ’বিট’কে ইনপুট হিসেবে নেয়া হচ্ছে বা গ্রহণ করা হচ্ছে, এবং আউটপুট হবে একক একটি ’বিট’, এবং তা ইনপুেটর উপরে নির্ভর করবে।
এইসব লজিক গেইটের চমকপ্রদ দিক হলো যে – ক্যালকিউলেটর ব্যবহার করে সাধারণ যোগ-বিয়োগ করা যায়, সামাজিক মিডিয়াতে, ইউটিউবে ব্যবহৃত ’লাইকস ও ’শেয়ারস’ ইত্যাদি ছোটোখাটো সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগুলোকে গেইটের ছোট্টো একটি সেট দিয়ে নির্মাণ করা যায়, এবং একে বলা হয় সার্বজনীন বা ’ইউনিভার্সাল গেইট সেট’। অর্থাৎ, ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারে – যেকোনো সম্ভাব্য অ্যালগোরিদম – পরম্পরায় প্রয়োগ তথা রান করানো যাবে। আপাতদৃষ্টে, প্রক্রিয়াগুলোকে রকমারি বলে প্রতীয়মান হলেও ইউনিভার্সাল গেইট সেট ব্যবহার করে সমাধান সম্ভব। অঘউ, ঙজ এবং ঘঙঞ হলো ’ইউনিভার্সাল গেইট সেট’-য়ের একটি উদাহরণ।
যাহোক, আমাদের নিত্যদিনের জীবনে সচরাচর লজিক গেইটস ব্যবহারের কিছু উদাহরণ যেমন : বার্গলার অ্যালার্ম : কোনো অনাহূত বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি প্রবেশ করলে, সিকিউরিটি সিস্টেম অন করা থাকলে, সঙ্কেত ধ্বনি বাজিয়ে সতর্ক করে দেয়। অথবা যেমন : আপনার বাড়ি/ফ্ল্যাটের ডোরবেল; চলন্ত গাড়িতে বেল্ট না লাগালে ’কার সীটবেল্ট ওয়ার্নিংস’ -য়ের তড়িৎকর্মা হয়ে ওঠা; সন্ধ্যার আগমনকালে ’অটোমেটিক স্ট্রীটলাইট’গুলোর জ্বলে উঠা; আলোহীন ঘরে বা স্থানে প্রবেশমাত্র আলো জ্বলে উঠা ইত্যাদি।
তদুপরি, বাস্তবে, ডিজিটাল কমপিউটার, মাইক্রোপ্রসেসর থেকে শুরু করে সুপারকন্ডাকটর, আমার আপনার কব্জি ঘড়িকে যে ক্ষুদে ’চিপ’গুলো চালিত রেখেছে সেগুলো কিংবা মাইক্রোওয়েভ তো বটেই, বিশ্বব্যাপী ক্রেডিট কার্ডের ট্র্যানজাকশন ইত্যাদি সব সবই তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার, মিলিয়ন মিলিয়ন সাদামাটা সহজ ’গেইটস’ দিয়ে।
প্রতিটি গেইট একক একটি লজিকেল অপারেশন সম্পাদন করে, যেমন : যদি সবগুলো ’ইনপুট’ এক (১) হয় তবে সৃষ্টি করবে এক (১); অন্যথা, যদি কোনো ’ইনপুট’ শূন্য (০) হয়, তবে শূন্য (০) সৃষ্টি করবে, কিংবা এক (১)-কে শূন্য (০)-তে এবং শূন্য (০)-কে এক (১)-য়ে উল্টে দেবে। এইসব সাদামাটা সরল গেইটগুলো দিয়ে ইঞ্জিনীয়াররা আরো জটিল সার্কিট বানান, যা দ্বারা দুই সংখ্যার যোগ অথবা গুণ করা সম্ভব, স্মৃতিভাণ্ডার বা মেমোরিতে নির্বাচিত কোনো লোকেশনে রাখা হয়, কিংবা অপারেশন বা কর্মকাণ্ডের ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়।
আমাদের কমপিউটারের প্রসেসরগুলোকে, স্মার্টফোনকে এবং ’মেমোরি চিপ’গুলোকে কর্মক্ষম রাখার জন্য – এদের অন্তরের অন্তস্থলে লাখ লাখ লাখ…অনেক লাখ মাইক্রো¯ো‹পিক গেইটগুলো কর্মকাণ্ড সম্পাদনে ব্যস্তসমস্ত থাকে। এইসব গেইটের সঙ্গে সহযোগিতা করে কমপিউটার গণিতকর্ম করতে পারে, উপাত্তসমূহকে স্মরণ করে রাখে, এবং জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ, মৌলিক গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে জটিল ক্যালকিউলেশন – সবই করতে পারে।
এবারে কোয়ান্টাম লজিক প্রসঙ্গে আসা যাক :
কোয়ান্টাম লজিক গেইটস (ছঁধহঃঁস ষড়মরপ মধঃবং) : ঠিক যেমনটি ক্ল্যাসিকেল গেইট হলো ট্র্যাডিশনাল ডিজিটাল সার্কিটের মৌলিক অংশ, ঠিক তেমনি কোয়ান্টাম লজিক গেইটস বা কোয়ান্টাম গেইটস হলো কোয়ান্টাম সার্কিটের মৌলিক অংশ। গেইটগুলোর কাজ হলো কুবিট-কে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে এমনভাবে পরিচালনা বা ব্যবহার করা, যাতে কোয়ান্টাম কমপিউটার জটিল গণন প্রক্রিয়া তথা কমপিউটিং-য়ের মাধ্যমে সুপারপজিশন এবং ইন্টেঙ্গলমেন্ট/জড়িয়ে পড়া নামক দুই কোয়ান্টাম মূলসূত্র থেকে সুবিধা বা বেনিফিট পেতে পারে।
কোয়ান্টাম কমপিউটার তার কোয়ান্টাম কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য ’কুবিট’ ব্যবহার করে, ’বিট’ ব্যবহার করে না। কুবিট-য়ের বিশেষত্ব হলো যে, বিট যেমন কেবলমাত্র শূন্য (০) অথবা এক (১) হয়, কুবিট কিšতু যুগপৎ শূন্য (০) এবং এক (১) হাল-অবস্থায় (স্টেট-য়ে) ’সুপারপজিশন’-য়ে বিদ্যমাণ থাকতে পারে। একই সময়ে, যুগপৎ কুবিট-য়ের একাধিক বা বহু হাল-অবস্থায় বিদ্যমাণ থাকার সামর্থ্য অর্জিত হলে, কোয়ান্টাম কমপিউটার প্রচুর সুপ্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী হয়। তাই, কোয়ান্টাম ক্যালকিউলেশনে এই অভূতপূর্ব গুণধারি ’কুবিট’ ব্যবহার হয়। এবং কোয়ান্টাম ক্যালকিউলেশনগুলোর সম্পাদনের জন্য পরস্পরসম্পর্কিত একগাদা মৌলিক কর্মকাণ্ড করে থাকে কোয়ান্টাম লজিক গেইটগুলো।
বর্তমানে, বিভিন্ন শ্রেণির কোয়ান্টাম গেইট রয়েছে। যেমন: এক ’কুবিট-য়ের গেইট, যে ক্ষেত্রে – চোখের পলক পড়তে না পড়তেই: শূন্য (০) থেকে এক (১)-য়ে পরিবর্তিত হতে পারে, তদুপরি সুপারপজিশন অবস্থাও সৃষ্টি করতে সক্ষম, এবং করে থাকে।
আবার, দুই-কুবিটে’র গেইটও রয়েছে। এমন ক্ষেত্রে, গেইটগুলো : কুবিটদুটোর মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটতে দেয় এবং কোয়ান্টাম-ইনট্যাঙ্গলমেন্ট/জড়িয়ে পড়া অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে; অর্থাৎ, দুই অথবা দুইয়ের বেশি কুবিট নিজেদের মধ্যে ’জড়িয়ে পড়ে বা ইনট্যাঙ্গল’ হয়। কণিকাদের মধ্যে বিরাজমান এই আত্মিক সম্পর্ককে চিরায়ত বা ক্ল্যাসিকেল পদার্থবিদ্যার সাহায্যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। আপাতদৃষ্টে, আমাদের সহজজ্ঞান, উপলব্ধির পরিপন্থি এই কোয়ান্টাম ফেনোমেননকে আইনস্টাইন বলেছেন ’স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিসট্যান্স’। অবশ্য, আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত স্টেটমেন্টের পশ্চাতে জটিল বিতর্ক রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, লজিক গেইটসের ’কন্ট্রোল্ড- ঘঙঞ (ঈঘঙঞ)’ গেইট-কে ধরা যাক। এটি হলো দুই-কুবিট কর্মকাণ্ডের গেইট, এবং এখানে প্রথম কুবিট-কে লেবেল এঁটে বলা হলো ’কন্ট্রোল কুবিট’ এবং দ্বিতীয় কুবিট-কে বলা হলো ’টার্গেট কুবিট’। এবারে, যদি ’কন্ট্রোল কুবিট’ ।১> হয়, তবে চোখের পলক পড়তে না পড়তেই ’টার্গেট কুবিট’-য়ের হাল-অবস্থা (স্টেট) ।০> থেকে ।১> অবস্থায় চলে আসবে (অথবা, ।১> থেকে ।০> অবস্থায় চলে আসবে)। (এখানে, লক্ষ্যণীয় যে । এবং > , অনেকটা স্বরলিপির কায়দায়, নোটেশন ব্যবহার করা হয়েছে; এর অর্থ হলো যে ’শূন্য (০)’ ও ’এক (১)’ দিয়ে আমরা যে কুবিট অবস্থার কথা বলছি, সেগুলোর মাপজোক সাপেক্ষ গুরুত্ব বা ম্যাগনিটিয়ুড এবং দিক বা ডিরেকশন রয়েছে। অথবা, এক শব্দে বলা যায় : তারা সব ’ভেক্টর’ রাশি।)।
ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারের অনুরূপ, অনেক কুবিট সম্বলিত কোয়ান্টাম অ্যালগোরিদম-ও বিভাজন প্রক্রিয়ায় বা ভাগ করে করে এক-কুবিট এবং দুই-কুবিট সম্পন্ন কোয়ান্টাম গেইটের অনুক্রম বা সিকোয়েন্স তৈরি করে, সৃষ্টি হয় সর্বজনীন ’ইউনিভার্সাল কোয়ান্টাম গেইট সেটে’র। তাই, এই কোয়ান্টাম গেইটগুলো যদি নির্ভরযোগ্যভাবে কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে পারে, তবে আমরা আমাদের কোয়ান্টাম কমপিউটারে এই গেইটগুলো ব্যবহার করে সম্ভাব্য সব অ্যালগোরিদম রান করাতে সক্ষম হব।
কোয়ান্টাম কমপিউটার কিভাবে কাজ করে?
ইত্যবসরেই আমরা জানি যে ক্ল্যাসিকেল এবং কোয়ান্টাম কমপিউটারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো যে কোয়ান্টাম কমপিউটারে ’বিট’-য়ের বদলে ’কুবিট’ ব্যবহার হয়, এবং কুবিট-য়ে গুণনীয়ক হারে তথ্য মজুত করে রাখা যায়। আবার, কোয়ান্টাম কমপিউটিাং-য়ে যদিও বাইনারি কোড ব্যবহার হয়, তবে কুবিট কিšতু তথ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে থাকে ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারের থেকে ভিন্ন উপায়ে।
সাধারণত, কোয়ান্টাম কণিকাকে ( বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নির্মিতি সামগ্রী নামে পরিচিত ক্ষুদ্রতম কণিকারা) নিপুণভাবে পরিচালনা বা ব্যবহার করে এবং মাপজোক করে কুবিট-কে সৃষ্টি করা হয়; যেমন : ফোটন, ইলেকট্রন, ট্র্যাপড আয়ন এবং পরমাণু। অথবা, প্রকৌশল সিস্টেম দ্বারাও সৃষ্টি করা হয় – যারা কোয়ান্টাম কণিকার মতো আচরণ করবে, তাদের ব্যবহার দেখা যায়, যেমন : সুপারকন্ডাকটিং সার্কিটের ক্ষেত্রে করা হয়।
তবে এমন সব কণিকাকে সুনিপুণভাবে পরিচালনা বা ব্যবহার করতে হলে কুবিট-কে অবশ্যই চরম হিমে রাখতেই হবে (প্রায় শূন্য কেলভিন বা মাইনাস দুইশো তিয়াত্তর দশমিক এক পাঁচ (-২৭৩.১৫) সেলসিয়াস ডিগ্রীতে)। নয়ত অতিশব্দ-দূষণে, নয়েজ-দূষণে ’ডিকোহিয়েরেন্স’ (ফবপড়যবৎবহপব) প্রক্রিয়া সৃষ্টি হলে অযথার্থ বা ভুল ফলাফল দেবে। (’ডিকোহিয়েরেন্স’ প্রক্রিয়া হলো : কুবিট তার কোয়ান্টাম আচরণ তথা ’সুপারপজিশন’ ও ’ইনট্যাঙ্গলমেন্ট/জড়িয়ে পড়া’ হারিয়ে ফেলে।)।
আজকাল, কোয়ান্টাম কমপিউটিং কর্মকাণ্ডে হরেক শ্রেণির কুবিট ব্যবহার হয়ে থাকে, নানা ধরণের কর্মের জন্য কোন কুবিট-টি উপযুক্ত হবে তা বিবেচনা করে কুবিট নির্বাচন করা হয়। কয়েকটি কমন কুবিট-য়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো, যেমন :
সুপারকন্ডাকটিং কুবিট : সুপারকন্ডাকটিং (ঝঁঢ়বৎপড়হফঁপঃরহম য়ঁনরঃং) কুবিট সুপারকন্ডাকটিং ব¯তু থেকে তৈরি হয়, তারা চরম নিম্ন তাপমাত্রায় কর্মপটুতা দেখাতে ওস্তাদ। দ্রুত গতিতে কর্মসাধন এবং নিখুঁত দক্ষতার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে তাদের সৃষ্টি করাও সহজ।
ট্র্যাপড আয়ন কুবিট: ফাঁদবন্দী তথা ট্র্যাপড আয়ন কণিকারাও কুবিট হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। এসব আয়ন কণিকা রেডিও-কম্পন ও বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে বা ফিল্ডে ঝোলানো বা আলম্বিত অবস্থায় থাকে, ফলে স্থিতিশীল এবং পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে বলে যথার্থ নিয়ন্ত্রণ ও মাপজোক করা সম্ভব হয়।
কোয়ান্টাম ডটস (ছঁধহঃঁস ফড়ঃং) : কোয়ান্টাম ডট হলো একক একটিমাত্র ইলেকট্রনধারি ছোট্ট সেমিকন্ডাকটর এবং কুবিট হিসেবে ব্যবহার হয়। সাইজের বিবেচনায় মাত্র দুই থেকে দশ ন্যানোমিটার হলে কি হবে, এই ক্ষুদে ছোট্ট সেমিকন্ডাকটর ন্যানোক্রিস্টাল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রভাব প্রদর্শণে অত্যন্ত পারদর্শী। এই প্রভাবগুলো তাদের ’ওপটিকেল’ ও ইলেট্রনিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে প্রভাবান্বিত করে থাকে বলে নানা রকমের অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহার হয়। যেমন : হাই-ডেফিনিশন কিউ-লেড টিভি, মেডিকেল বায়ো-ইমেইজিং, সোলার প্যানেস, সলিড-স্টেট লাইটিং ইত্যাদি।
ফোটন : ফোটন (চযড়ঃড়হং) হলো আলোর একক একটি কণিকা। দূর দূ-র দূরত্বে- ওপটিকেল ফাইবার ক্যাবল-য়ের মাধ্যমে কোয়ান্টাম তথ্যের লেনদেনে ফোটন ব্যবহার হয়। কোয়ান্টাম হাল-অবস্থার ’সুপারপজিশন’-য়ে কোয়ান্টাম যোগাযোগ এবং কোয়ান্টাম ক্রিপটোগ্রাফির আদান-প্রদানে ফোটন ব্যবহার হয়।
নিউট্রাল পরমাণু : নিরপেক্ষ বা নিউট্রাল পরমাণু (হবঁঃৎধষ ধঃড়সং) বলতে বোঝায় সেসব পরমাণু যাদের সমসংখ্যক প্রোটন (পজিটিভ চার্জ) ও সমসংখ্যক ইলেকট্রন (নিগেটিভ চার্জ) রয়েছে, এবং ফলস্বরূপ, পজিটিভ-নিগেটিভ কাটাকাটি হয়ে মোট বিদ্যুত চার্জের পরিমাণ শূন্য থাকে; অর্থাৎ, তারা আয়ন নয়।
নিরপেক্ষ বা নিউট্রাল পরমাণু কুবিট হিসেবে ব্যবহার হয় নির্দিষ্ট টাইপের কোয়ান্টাম কমপিউটারে, এবং এমন ক্ষেত্রে প্রতিটি পৃথক পরমাণুকে – কোয়ান্টাম কমপিউটিং কর্ম সম্পাদনের জন্য লেইজারের সাহায্যে নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্তমানে, ’ইটেরবিয়াম’ (ুঃঃবৎনরঁস), কেলসিয়াম, বেরিয়াম ও স্ট্রনটিয়াম ইত্যাদির পরমাণু কুবিট রূপে ব্যবহার হয়।
এবার, জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য কোয়ান্টাম কমপিউটার কিভাবে কুবিটগুলোকে ব্যবহার করে, তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ধরা যাক যে আপনি একটা জটিল গোলকধাঁধার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন; আপনাকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার পথের সন্ধান দিতে – ক্ল্যাসিকেল কমপিউটার তখন যথাসাধ্য প্রতিটি পথের মিশ্রণ বা কম্বিনেশন ঘটিয়ে বেরিয়ে আসার পথ পাওয়ার চেষ্টা করবে। নতুন পথের সন্ধান পেতে কমপিউটার তার ’বিট’ ব্যবহার করবে এবং কোন কোন পথ ধরে বেরিয়ে আসা যাবে না – সেগুলো তার স্মৃতিতে (মেমোরিতে) ধারণ করে রাখবে।
তুলনামূলকভাবে, ধরা যাক যে কোয়ান্টাম কমপিউটারও হয়ত গোলকধাঁধার একটি লাগসই দৃশ্য বা চিত্র তৈরি করবে এবং সেটির ভিত্তিতে, – যুগপৎ সম্ভবপর বহু (মাল্টিপল)-পথের পরীক্ষাপ্রক্রিয়া চালাবে এবং ’কোয়ান্টাম ইন্টারফিআরেন্স’ ব্যবহার করে সঠিক সমাধান প্রকাশ করবে। কিšতু, কুবিট একই সময়ে বা যুগপৎ বহু-পথের প্রক্রিয়াজাতকরণ বা পরীক্ষাপ্রক্রিয়া করে না; বরং ফলাফল নির্ধারণের জন্য কোয়ান্টাম কমপিউটার কুবিট-য়ের ’সম্ভাব্য বিস্তার/ব্যাপকতা’-র বা ’প্রবাবিলিটি অ্যামপ্লিটিউডস’ (ঢ়ৎড়নধনরষরঃু ধসঢ়ষরঃঁফবং) -য়ের মাপজোক করে। এইসব বিস্তার বা অ্যামপ্লিটিউড তরঙ্গের মতো আচরণ করে থাকে, একে অপরকে অংশত আবৃত করতে (ওভারল্যাপিং) পারে এবং পারস্পরিকভাবে নিজেদের মধ্যে অনুপ্রবেশ/অনাহূত হস্তক্ষেপ (ইন্টারফিআরেন্স) ঘটাতে পারে। আবার, যখন যেসব তরঙ্গ-রা সমকালীন বা যৌগপদিক নয়, সেই সব তরঙ্গ-ও একে অপরকে অংশত আবৃত করতে পারে বা করে, এমন পরিস্থিতিতে – তারা, জটিল সমস্যার ’সম্ভাব্য সমাধান প্রক্রিয়া’ থেকে বাদ হয়ে যায় বা কাটাকাটি করে বাতিল হয়ে যায়, এবং কেবলমাত্র আসঞ্জনশীল বা সঙ্গতিপূর্ণ (কোহিরিয়েন্ট) তরঙ্গগুলো জটিল সমস্যার সমাধান নির্ধারণে অংশ নেয়। (কোয়ান্টাম মেকানিক্সে, ’প্রবাবিলিটি অ্যামপ্লিটিউডস’ বলতে জটিল সংখ্যার সমাহার বা উপস্থিতিকে বোঝায় যেগুলো দ্বারা – কোনো সিস্টেমের নির্দিষ্ট হাল-অবস্থায় থাকার ’সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিটি’ নির্ধারণ করা হয়। ’অ্যামপ্লিটিউডস’ বা ’বিস্তার’-য়ের নিরঙ্কুশ মানের বর্গফল দ্বারা সিস্টেমের নির্দিষ্ট হাল-অবস্থায় থাকার সম্ভাব্যতা নির্ধারিত হয়। ’সুপারপজিশন’ এবং ’ইন্টারফিআরেন্স’ বা ’অনাহূত হস্তক্ষেপ/অনধিকারচর্চা’ নামক ফেনোমেননগুলোকে, যেগুলো হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মৌলিক রূপ চেহারা, আদল – সেগুলোকে যথার্থ উপলব্ধির জন্য ’প্রবাবিলিটি অ্যামপ্লিটিউডস’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।)।
কোয়ান্টাম জগতের কণিকারা : কোয়ান্টাম কমপিউটার নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পরিচিত চিরায়ত ক্ল্যাসিকেল পদার্থবিদ্যার মতো নয়। বরং একেবারেই ভিন্ন মেজাজের নতুন ধাচের পদার্থবিদ্যা। প্রায়শই, কোয়ান্টাম কণিকাদের আচরণ – বিচিত্র, অদ্ভুত, উদ্ভট, সহজজ্ঞান বহির্ভূত বিরোধী অথবা এমনকি অসম্ভব, অসাধ্য …রূপে আবির্ভূত হয়। তৎসত্ত্বেও, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্রগুলো প্রাকৃতিক-জগত বিন্যাসের ভিত্তি-প্রস্তর বলে বিবেচিত হয়।
কোয়ান্টাম জগতের কণিকাদের গুণাবলি আচরণ বর্ণনা বিশ্লেষণ করতে গেলে নিরত অনন্য অদ্বিতীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই আমরা। আবার, কণিকাদের নানাভাবে ব্যবহার করে ধরাছোঁয়া যায় এমন জিনিস তৈরি করছি, অর্থাৎ, কণিকাদের মাধ্যমে কণিকাদের ফলাফল দেখি আমরা, কিšতু কণিকাদের সহজজ্ঞান বা সহজজ্ঞ বিরোধী আচরণের হেতু বা কজ জানা নেই। এমনকি, কোয়ান্টাম কণিকাদের চমৎকৃত করে দেয়া আচরণকে সঠিকভাবে প্রকাশের জন্য যথার্থ শব্দভাণ্ডারও আমাদের নেই।
কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ে ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা
সুপারপজিশন : কুবিট যখন নিছক কুবিট হয়ে থাকে, তখন তা ব্যবহারোপযোগি নয়। অবশ্য, কুবিট যখন কোয়ান্টাম তথ্যকে ধারণ করে সুপারপজিশন হাল-অবস্থায় (স্টেটে) বিদ্যমাণ হয় বা থাকে, তখন সম্ভাব্য সব কনফিগিউরেশণ (সুপারপজিশন হাল-অবস্থা, যুগপৎ শূন্য এবং এক-য়ের কম্বিনেশন) সমৃদ্ধ কুবিট তার বাহাদুরি দেখাতে পারে।
সুপারপজিশন হাল-অবস্থায় দলবদ্ধ কুবিটরা জটিল, বহুমাত্রিক কমপিউটেশনাল স্পেস সৃষ্টি করতে পারে। এমতাবস্থায়, এমনভাবে সৃষ্ট এইসব নতুন স্পেসে বা কর্মযজ্ঞস্থানে জটিল সমস্যাগুলোকে হাজির করা হয় বা উপস্থাপন করা হয়। কুবিট-য়ের এই সুপারপজিশন অবস্থার দরুণ কোয়ান্টাম কমপিউটারে সমান্তরালে অনেক কমপিউটিং কর্মকাণ্ড সম্পাদন সম্ভব হয়; অর্থাৎ, একই সময়ে একসঙ্গে যুগপৎ অনেক অসংখ্য ইনপুট দেয়া সম্ভব হয়।
ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া : কুবিট-দের দ্রুত ইনট্যাঙ্গল হওয়ার বা জড়িয়ে পড়ার সামর্থ্য রয়েছে। ফলে, তাদের হাল-অবস্থা অন্যসব কুবিটদের হাল-অবস্থার সঙ্গে দ্রুত নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। এভাবে জড়িয়ে পড়া সিস্টেম বা ইনট্যাঙ্গলড সিস্টেম গুলো এতোটাই সহজ স্বকীয় যে – কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলো যখন মাত্র একক একটি ইনট্যাঙ্গলড কুবিট-য়ের মাপজোক করে, তাৎক্ষণিকভাবে তারা ইনট্যাঙ্গলড সিস্টেমের অন্য সব কুবিট-য়ের তথ্যও নির্ধারণ করতে পারে।
যখনই কোয়ান্টাম সিস্টেমের মাপজোক করা হয়, তার সম্ভাব্য সুপারপজিশন হাল-অবস্থা/স্টেট ভেঙ্গে যায় বা কলাপস করে ও বাইনারি হাল-অবস্থায় উপনীত হয়, যা নাকি বাইনারি কোড হিসেবে, তথা ’শূন্য (০)’ অথবা ’এক (১)’ রূপে তালিকাভুক্ত বা নিবন্ধিত হতে পারে।
কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ে,অ-আসঞ্জনশীলতা/ অ-সঙ্গতিপূর্ণতা বা ’ডিকোহিঅরেন্স’ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া বা প্রসেস যেখানে স্বয়ং ’কুবিট’, যে নাকি কোয়ান্টাম তথ্যের মৌলিক ভাণ্ডার বা ইউনিট, পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার কারণে সে তার কোয়ান্টাম গুণাবলী, যেমন : সুপারপজিশন এবং ইনট্যাঙ্গলমেন্ট, হারিয়ে ফেলে। পরিণত হয় একক হাল-অবস্থায় যা নাকি ক্ল্যাসিকেল পদার্থবিদ্যার সাহায্যে মাপজোক করা যায়। অর্থাৎ, এই সব মিথষ্ক্রিয়ার ফলস্বরূপ কমপিউটিং প্রক্রিয়া ভ্রান্তিপূর্ণ হয়, এবং কোয়ান্টাম কমপিউটারের সুস্থিততা ও নির্ভরযোগ্যতা, দুই-ই সীমিত হয়ে পড়ে। অবশ্য আবার, একই সময়ে কোয়ান্টাম কমপিউটার মাপজোক ও মিথষ্ক্রিয়ার পটভূমিতে ক্ল্যাসিকেল কমপিউটারে পরিবর্তিত হয়।
কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ে, ’অনাহুত হস্তক্ষেপ/অনধিকারচর্চা’ বা ’ইন্টারফিআরেন্স’ হলো এমন একটি ইন্দ্রিয়গোচর বিষয় বা ফেনোমেনন – যেখানে কোয়ান্টাম হাল-অবস্থা (কুবিটস) সম্মিলিত হয়, এবং সম্মিলিত হওয়ার দরুণ হয় তারা পারস্পরিকভাবে শক্তিশালী হয় অথবা পরস্পর পরস্পরকে কাটাকাটি করে বা বাতিল করে দেয় বা কাটাকাটি হয়ে যায়, তরঙ্গমালার ক্ষেত্রে ঠিক যেমন ’অনাহুত হস্তক্ষেপ বা ’ইন্টারফিআরেন্স’ ঘটে ঠিক সেরকমভাবে। কোয়ান্টাম কণিকাদের এই তরঙ্গসদৃশ আচরণের সুফল দিক হলো যে – ’অ্যালগোরিদম’-য়ের মাধ্যমে সঠিক সমাধান অর্জনের সম্ভাব্যতাকে (প্রবাবিলিটিস) প্রশস্ততর করা যায়, এবং সেইসঙ্গে সম্ভাব্য অশুদ্ধ উত্তগুরলোও নাকচ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, কমপিউটিং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং প্রায় অধিকতর ’সম্ভাব্যতা’ সৃষ্টি হয়।
মূলসূত্রগুলো কেমনভাবে একসঙ্গে কাজ করে :
কোয়ান্টাম কমপিউটিং সম্বন্ধে ভালো একটা উপলব্ধি পেতে হলে : সহজজ্ঞান বা সহজজ্ঞ বহির্ভূত দুই আইডিয়াকে (সুপারপজিশন ও ইনট্যাঙ্গলমেন্ট) সত্য বা যথার্থ বলে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমটির ক্ষেত্রে, সুপারপজিশন অবস্থায় বিদ্যমাণ ’কুবিট’-য়ের রয়েছে নির্দিষ্ট ’প্রবাবিলিটি অ্যামপ্লিটিউডস’ বা ’সম্ভাব্য বিস্তার’ এবং সে (কুবিট) মাপজোকযোগ্য বা তাকে মাপজোক করা যায় – এবং একই সময়ে তারা এলোপাতাড়িভাবে আচরণে অভ্যস্ত। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে, ইনট্যাঙ্গলড বা জড়িয়ে পড়া কুবিট য-তো দূ-রেই থাকুক না কেনো, জড়িয়ে পড়া অবস্থায় থাকবেই থাকবে, এমনকি এককভাবে যতোই এলোমেলো থাকুক না কেনো, ইনট্যাঙ্গল বা জড়িয়ে পড়া অবস্থার কোনো হেরফের হয় না। কোনো না কোনোভাবে তাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক অব্যাহত থাকে।
কোয়ান্টাম কমপিউটারের ক্ষেত্রে, কমপিউটিং কর্মকাণ্ড শুরু হয় এভাবে : যে কোয়ান্টাম হাল-অবস্থাগুলোর (হাল-অবস্থার গুণাবলি ও আচরণ) কমপিউটিং কর্মকাণ্ড চালানো হবে, সেগুলোকে সুপারপজিশনে আনার/রাখার প্র¯তুতি নেয়া হয়। ব্যবহারকারি বা ইউজার কোয়ান্টাম সার্কিট তৈরি করেন, ’ইনট্যাঙ্গলমেন্ট বা জড়িয়ে পড়া’ অবস্থা ঘটানোর জন্য তিনি হাল-অবস্থাগুলোকে সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেন, যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন হাল-অবস্থার মধ্যে ’অনাহূত হস্তক্ষেপ’ বা ইন্টারফিআরেন্স’ পরিস্থিতির অবতারণা ঘটবে, এবং এতোসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করা হবে অবশ্যই অ্যালগোরিদম-য়ের বা নির্দেশনামার সাহায্যে। ’অনাহূত হস্তক্ষেপ’ বা ইন্টারফিআরেন্স’-য়ের মাধ্যমে অসংখ্য সম্ভাব্য ফলাফলকে বাতিল করা হবে, এবং আকাঙ্খিত সম্ভাব্য ফলাফলগুলোকে প্রশস্ততর বা পূর্ণতর করা হবে। এই প্রশস্ততর বা পূর্ণতরকৃত ফলাফলগুলোই হবে কোয়ান্টাম কমপিউটারের কমপিউটিংকৃত সমাধান।
(কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার : কোয়ান্টাম কমপিউটিং-য়ের প্ল্যাটফর্ম হলো কোয়ান্টাম হার্ডওয়ার। কুবিটদের সুস্থিত কোয়ান্টাম হাল-অবস্থায় বা স্টেটে থাকার জন্য হার্ডওয়ারকে যথার্থ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখতে হবে, যেমন : অতি-নিম্ন তাপমাত্রায় রাখতে হবে, এবং বাইরের নয়েজ বা শব্দ থেকে অবশ্যই বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম কমপিউটেশন পাওয়ার জন্য – কোয়ান্টাম হার্ডওয়ারে, কুবিটের হাল-অবস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ও পড়তে পারার ব্যবস্থা বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার থাকে।)।




















