যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বিরল শিকারি পাখিগুলোর একটি মঁতাগুর শিকারি বাজ একই গোপন এলাকায় টানা দ্বিতীয় বছর সফলভাবে প্রজনন করেছে। এবার একটি পুরুষ পাখি দুটি আলাদা স্ত্রী পাখির সঙ্গে মিলিত হয়ে দুটি বাসায় মোট ছয়টি ছানা বড় করেছে।
বিলুপ্তির ঝুঁকিতে বিরল পাখি
মঁতাগুর শিকারি বাজকে ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাখির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে দেশটিতে এই পাখির সফল বাসার সংখ্যা ছিল নয়টি। কিন্তু ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সফল প্রজননের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংরক্ষণকর্মীদের কাছে ‘এ ইউ’ নামে পরিচিত পুরুষ পাখিটি এবার দুটি বাসায় ছয়টি ছানা বড় করেছে। গত বছর একই গোপন এলাকায় চারটি ছানা জন্ম নিয়েছিল।
প্রকৃতি সংরক্ষণকর্মীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় কৃষকদের সহযোগিতায় বাসাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শিয়ালের মতো মাটিতে বিচরণকারী শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাসাগুলো রক্ষা করতে চারপাশে বিশেষ বেড়া দেওয়া হয়েছিল।
আকাশেই শিকারের অসাধারণ আদান-প্রদান
ছানাগুলোকে খাবার জোগাতে পুরুষ পাখিটিকেও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। এই প্রজাতির পাখিদের খাবার সংগ্রহের দৃশ্যও বেশ অসাধারণ।
পুরুষ পাখি উড়ন্ত অবস্থায় শিকার নিয়ে এসে সেটি মাঝ আকাশে ছেড়ে দেয়। এরপর স্ত্রী পাখি শরীর উল্টে দিয়ে নিজের নখর দিয়ে সেই শিকার ধরে ফেলে। এই অনন্য খাদ্য আদান-প্রদানের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা।
মঁতাগুর শিকারি বাজ দেখতে সরু এবং লম্বা ডানার। শীতকালে তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আফ্রিকায় চলে যায়। গ্রীষ্মে আবার ইউরোপে ফিরে এসে প্রজনন করে। অনেক সময় কৃষিজমির ফসলের মধ্যেই মাটির ওপর বাসা তৈরি করে।
ছানাদের গতিপথ জানতে বসানো হলো উপগ্রহভিত্তিক যন্ত্র
বাসা ছেড়ে দেওয়ার পর তরুণ পাখিগুলো কোথায় যায়, তাদের চলাফেরা কেমন—এ বিষয়ে এখনো অনেক কিছু অজানা। তাই এবার প্রথমবারের মতো দুটি ছানার শরীরে ক্ষুদ্র উপগ্রহভিত্তিক অনুসরণ যন্ত্র বসানো হয়েছে।
এর মাধ্যমে সংরক্ষণকর্মীরা জানতে পারবেন, ছানাগুলো কোন পথে যায়, তাদের পরিযায়ী যাত্রার পথ কী, তারা কোথায় কতদিন অবস্থান করে এবং প্রথম বছরেই যুক্তরাজ্যে ফিরে আসে কি না।
এই তথ্য সংরক্ষণকর্মীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ মাটির ওপর ফসলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাসাগুলো অনেক সময় কৃষিকাজের যন্ত্রের কারণে দুর্ঘটনাক্রমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
সংরক্ষণকর্মীদের মতে, মঁতাগুর শিকারি বাজ বর্তমানে টিকে থাকার একেবারে প্রান্তসীমায় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এ বছর ওই অঞ্চলে ফসল কাটার সময় আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক মাস এগিয়ে এসেছে। ফলে ফসল কাটার যন্ত্রের নিচে পড়ে কোনো বাসা ও ছানা দুর্ঘটনাক্রমে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
তাই নতুন অনুসরণ যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে শুধু পাখিগুলোর চলাচল বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, তাদের বাসা ও প্রজননস্থল আরও কার্যকরভাবে রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকৃতিপ্রেমীদেরও তরুণ পাখিগুলোর দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। কোথাও এসব পাখি দেখা গেলে সংরক্ষণকর্মীদের জানালে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
মঁতাগুর শিকারি বাজের এই ছয়টি নতুন ছানা তাই শুধু একটি সফল প্রজননের খবর নয়; বরং যুক্তরাজ্যে বিপন্ন একটি প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















