ইরান যুদ্ধ শিগগির শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই; বরং এর পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিজেকে এক জটিল ভূরাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে আবিষ্কার করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, আর পাশাপাশি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ থামার বদলে ছড়িয়ে পড়ছে
এর আগে ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না—এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। একই সময়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে তিন দেশের নিরাপত্তা-হুমকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। ফলে কোনো একটি দেশের যুদ্ধে অন্য দুই দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল।
চুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করার মতো ঘটনাও দ্রুত সামনে আসে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হুতিদের হামলার পর ১৯ আগস্ট সিরিয়ায় তুরস্কের ঘাঁটিতে ইসরায়েল হামলা চালায়। পাকিস্তানকেও কোনো এক ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। মার্কিন দূতের কাশ্মীরবিষয়ক বিতর্কিত মন্তব্যের পর সেই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরেও হতে পারে বলে আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধ থামছে না; বরং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
ঋণের বোঝায় পাকিস্তান
এই ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই পাকিস্তানের মোট জাতীয় ঋণ প্রায় একশ ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাকি সময়ে দেশটিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার মূল ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর সঙ্গে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধের চাপও রয়েছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় ও স্থিতিশীলতা সহায়তা চেয়েছিল। এর মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এর পরপরই ভারতে নিযুক্ত মার্কিন দূতের কাশ্মীরবিষয়ক বিতর্কিত মন্তব্য এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, ইরানকে কোনো দেশ আর্থিক সহায়তা দিলে তাকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে তেল পাচারও রয়েছে।
ইরান থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান হয়ে তেল পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। ফলে ওয়াশিংটনের এই সতর্কবার্তা পাকিস্তানের জন্যও সরাসরি বার্তা বহন করছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরান, চীন ও পাকিস্তানের অবস্থান
একটি ইসরায়েলি সংবাদপত্র দাবি করেছে, পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে তেল চুক্তি করেছে এবং এর বিনিময়ে সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা বন্ধ রাখার নিশ্চয়তা পেয়েছে। অন্যদিকে মধ্যস্থতার পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি আশা করে থাকে যে পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে, তাহলে সেই প্রত্যাশা এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি।
চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক, চীনা ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ঋণ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের বিভিন্ন দায়বদ্ধতা বিবেচনায় নিলে ওয়াশিংটনের ইচ্ছা অনুযায়ী পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
কাশ্মীর প্রসঙ্গেও চাপ
এই পরিস্থিতিতে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন দূতের কাশ্মীরবিষয়ক মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে এটি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে শক্তিশালী করার বার্তা দিতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিও এটি চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত হতে পারে।
আরব সূত্রের বরাত দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কথাও ছড়িয়েছে যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রجب তাইয়্যেপ এরদোয়ান পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির জন্য ইসলামাবাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন। তবে এ দাবির স্বাধীন নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
একইভাবে সংবিধানের সম্ভাব্য ২৮তম সংশোধনীর অজুহাতে ইমরান খানের জন্য কোনো রাজনৈতিক স্বস্তি আসতে পারে—এমন ধারণা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন আশঙ্কা
এরপর দৃষ্টি ফেরাতে হয় হরমুজ প্রণালির দিকে। ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার পর মার্কিন ভূরাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি এমন অস্ত্র ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ জলপথটির কেন্দ্রস্থলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ফলে ইরানের মূল ভূখণ্ডে তুলনামূলক কম জনবসতিপূর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থানে হামলার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত অনুমান করাও বিপজ্জনক।
চুক্তির পরীক্ষার মুখে পাকিস্তান
সব ঘটনাকে একসঙ্গে দেখলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একই সময়ে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানকে দেওয়া হচ্ছে পরোক্ষ সতর্কবার্তা। তুরস্কের সামরিক স্থাপনাও ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
অনেকে যুক্তি দিতে পারেন, এত বড় সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা সবসময় যুদ্ধ ঠেকাতে পারে না।
ইতিহাসের সতর্কবার্তা
১৯২৯ সালের মহামন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালে, যে বছর মহামন্দার অবসান ঘটে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিও একই ধরনের শিক্ষা দেয়। ব্রিটেন ও জার্মানি পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে রাশিয়ার বিপুল আর্থিক সম্পর্ক ছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি জার্মানির ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল ছিল। রাশিয়ার শিল্পায়নেও ফরাসি ও বেলজীয় পুঁজির বড় ভূমিকা ছিল।
অর্থাৎ যুদ্ধের আগে ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ঋণের মাধ্যমে গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারপরও সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি।
আজকের পরিস্থিতিও তাই শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। রাজনৈতিক স্বার্থ, সামরিক লক্ষ্য, নিরাপত্তা-আশঙ্কা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক সময় অর্থনৈতিক যুক্তিকে ছাড়িয়ে যায়।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি তাই অত্যন্ত নাজুক। যুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়লে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে অর্থনৈতিক টিকে থাকার জন্য পশ্চিমা সহায়তার প্রয়োজন, অন্যদিকে চীন, ইরান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রত্যাশা সামলানোও সহজ নয়।
অঞ্চলের ভাগ্য এখন অনেকটাই ভারসাম্যের ওপর ঝুলছে। উত্তাপ আরও বাড়লে বহু সম্পর্ক ও চুক্তি হয়তো দুর্বল হয়ে পড়বে; কিছু সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, আর কিছু হয়তো সংঘাতের আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
ইরান যুদ্ধ তাই শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নয়—এর ঢেউ এখন পাকিস্তানসহ গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও স্পর্শ করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















