ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের যে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখলে বড় ছবিটা ধরা পড়বে না। কোথাও স্কুলে শিক্ষক নেই, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে, কোথাও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও শিক্ষাজীবন শেষ করেও তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই।
ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সাংগঠনিক যোগসূত্র নেই। প্রতিবাদের ধরনও এক নয়। কিন্তু এর ভেতরে একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট—তরুণ প্রজন্ম অন্যায়, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে আগের মতো নীরবে মেনে নিতে চাইছে না।
এ কারণেই জেন-জি ও জেন-আলফার অস্থিরতাকে কেবল বয়সজনিত আবেগ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর গভীরে রয়েছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট।
শিক্ষার অধিকার যখন বাস্তব সংকটে
সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের লখনৌতে একটি স্কুলের ছাত্রীদের আকস্মিক প্রতিবাদ সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় তারা স্কুল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেয়। তাদের আন্দোলনের পেছনে কোনো বড় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না, কোনো দৃশ্যমান নেতা ছিল না। কিন্তু নিজেদের সমস্যার কথা প্রশাসনের সামনে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে তারা দ্বিধা করেনি।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে রাজস্থানের আলওয়ারেও। শিক্ষক ও অবকাঠামোর ঘাটতির প্রতিবাদে মেয়েদের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘটে যায়। বিহার ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা গেছে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একটি স্কুলে ভবন থাকলেই কি সেখানে শিক্ষা নিশ্চিত হয়?
ভারতের অনেক অঞ্চলে এখনো এমন স্কুল রয়েছে যেখানে শিক্ষক পর্যাপ্ত নন। কোথাও ভবন নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় আসবাব নেই। এমনও জায়গা আছে যেখানে একাধিক শ্রেণির পাঠ একই বারান্দায় চালাতে হয়। কোথাও আবার মন্দির বা কমিউনিটি হলকে স্কুল হিসেবে ব্যবহার করতে হয়।
এমন পরিবেশে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মনোযোগ ও ফলাফল আশা করা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রতিভা থাকলেই হবে না; সেই প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রতিষ্ঠানকেও সক্ষম হতে হবে।
উচ্চশিক্ষায় সুযোগের সংকট
বিদ্যালয়ের পর উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে সংকট আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে চিকিৎসাশিক্ষার মতো পেশাগত শিক্ষায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমিত আসন তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
জাতীয় মেডিকেল কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে স্নাতক পর্যায়ে মোট মেডিকেল আসন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৩৯টি। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজে ৬৩ হাজার ২৯৬টি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৭৩ হাজার ৬৪৩টির বেশি আসন রয়েছে।
কিন্তু বেসরকারি শিক্ষার উচ্চ ব্যয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনায় প্রায় ১ কোটি রুপি পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ফলে মেধা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বহু শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি মেডিকেল কলেজে একটি আসন পাওয়া জীবন বদলে দেওয়ার মতো সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশে আরও অন্তত ৪০ শতাংশ মেডিকেল আসন প্রয়োজন—এমন হিসাবও সামনে এসেছে। আসনসংখ্যার এই ঘাটতি শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে না, ভবিষ্যতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
একই বাস্তবতা প্রকৌশলসহ অন্যান্য পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে শিক্ষার সুযোগ এখন শুধু মেধার প্রশ্ন নয়; এটি ক্রমশ অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নেও পরিণত হচ্ছে।
পরীক্ষা যখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার প্রতীক
ঝাড়খণ্ডের সাম্প্রতিক পরীক্ষাবিরোধী আন্দোলন সংকটটির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করেছে। সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেয় এবং পরীক্ষার ফল বাতিলের সিদ্ধান্তও নেয়।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয় নতুন সমস্যা।
যারা ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছিল, তাদের অনেকেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে। কেউ কেউ আগের সরকারি চাকরিও ছেড়েছিল নতুন পদে যোগ দেওয়ার জন্য। এখন পুরো পরীক্ষা বাতিল হলে তাদের প্রশ্ন—অন্যের অনিয়মের দায় তাদের কেন বহন করতে হবে?
অর্থাৎ একটি পরীক্ষার অনিয়ম একই সঙ্গে দুই ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত তরুণ তৈরি করতে পারে। যারা অনিয়মের কারণে সুযোগ হারিয়েছে, তারা ন্যায়বিচার চায়। আবার যারা নিয়ম মেনে সুযোগ পেয়েছে, তারাও নিজেদের অধিকার রক্ষার দাবি জানায়।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।
শিক্ষার পরও চাকরি নেই
তবে সমস্যার শেষ শিক্ষা নয়। শিক্ষার পর কর্মসংস্থান না থাকলে পুরো ব্যবস্থার ওপর তরুণদের আস্থা আরও দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
আজকের তরুণদের ছোটবেলা থেকেই বলা হয়—ভালো করে পড়াশোনা করো, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হও, পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করো; তাহলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি যদি সেই শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ তৈরি করতে না পারে, তাহলে এই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে?
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের ৩৯ শতাংশ বেকার ছিলেন। ১৯৮৩ সালে একই শ্রেণির বেকারত্বের হার ছিল ৩৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়। এর পেছনে রয়েছে এমন লাখো তরুণ, যারা বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছে, পরিবারকে বড় আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে এবং একটি স্থিতিশীল জীবনের প্রত্যাশা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা যদি চাকরির বাজারে নিজেদের জন্য জায়গা না পায়, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
প্রতিবাদকে শুধু প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে
জেন-জি ও জেন-আলফার সাম্প্রতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তারা কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছে না।
আগের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বলত, পরিস্থিতি এমনই, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম সেই অপেক্ষায় থাকতে চাইছে না। তারা যুক্তি জানতে চায়, জবাবদিহি চায় এবং তাদের সঙ্গে অন্যায় হলে সরাসরি তা জানাতে চাইছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে দ্রুত দৃশ্যমান করেছে। একটি স্থানীয় স্কুলের কয়েকজন ছাত্রীর প্রতিবাদ মুহূর্তেই বৃহত্তর জনপরিসরে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্ষোভ সৃষ্টি করছে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। ক্ষোভের মূল কারণ তৈরি হচ্ছে বাস্তব জীবনে।
সমস্যা হলো প্রত্যাশা ও সুযোগের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।
তরুণদের বলা হচ্ছে আরও বেশি পড়তে, আরও কঠিন পরীক্ষায় বসতে এবং আরও দক্ষ হতে। কিন্তু একই সময়ে তারা দেখছে—স্কুলে শিক্ষক নেই, উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠছে এবং স্নাতক হওয়ার পরও চাকরি নিশ্চিত নয়।
এই বৈপরীত্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না।
রাজনীতির বাইরে গিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে
প্রতিটি আন্দোলনের পর প্রশাসনিকভাবে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কোথাও শিক্ষক নিয়োগ করা যায়, কোথাও তদন্ত কমিটি করা যায়, কোথাও পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় নেওয়া যায়। কিন্তু এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ সমস্যার মূল সমাধান নয়।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা ও অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষার আসন, পেশাগত শিক্ষার ব্যয়, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং কর্মসংস্থান—এসবকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো একই সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাত্রার পরস্পর-সংযুক্ত ধাপ।
একজন শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম প্রয়োজন মানসম্মত স্কুল। এরপর প্রয়োজন সামর্থ্যের মধ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। আর শিক্ষাজীবন শেষ হলে প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে তার দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
এই শৃঙ্খলের কোনো একটি অংশ ভেঙে গেলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই তরুণদের অস্থিরতাকে শুধু ‘প্রজন্মগত সমস্যা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক। বরং এটিকে রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। যখন তরুণরা বারবার শিক্ষক, পরীক্ষা, শিক্ষা ও চাকরির ন্যায্যতার দাবিতে রাস্তায় নামে, তখন তারা আসলে জানিয়ে দেয়—ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিতে তাদের বিশ্বাস আগের মতো নেই।
সমাধান তরুণদের আরও ধৈর্য ধরতে বলা নয়। সমাধান হলো এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যেখানে ন্যায্য শিক্ষা, স্বচ্ছ পরীক্ষা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থান পাওয়ার জন্য তাদের বারবার রাস্তায় নামতে না হয়।
শশী শেখর 



















