ফিলিপাইনের অর্থনীতির সবচেয়ে নির্মম বৈপরীত্য এখন স্পষ্ট: একদিকে দেশ পেয়েছে নতুন এক ট্রিলিয়নিয়ার, যার সম্পদের পরিমাণ সম্ভবত নিচের ৪৯ শতাংশ ফিলিপিনোর সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি; অন্যদিকে একই সময়ে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিজেদের ‘দরিদ্র’ বা ‘অতি দরিদ্র’ হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের অনেকেই নিয়মিত অনিচ্ছাকৃত ক্ষুধার মুখোমুখি হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যকে শুধু ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বলে পাশ কাটানো যায় না। এটি ফিলিপাইনের অর্থনৈতিক কাঠামো, করনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি বিপুল সম্পদ তৈরি করেও সেই সম্পদের সুফল সমাজের নিচের অর্ধেক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য কোথায়?
বৈষম্যের প্রশ্ন কেন হারিয়ে গেল
কয়েক দশক আগে ফিলিপাইনে শ্রেণিবৈষম্য ছিল রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়। ষাটের দশকের শেষভাগ ও সত্তরের দশকের শুরুতে ছাত্র আন্দোলন, বামপন্থী চিন্তাবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাজের অর্থনৈতিক বৈপরীত্য নিয়ে তীব্র আলোচনা হতো।
আজ সেই পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মার্কসবাদী অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের প্রভাব কমেছে, আর বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রায় প্রশ্নাতীত হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি মতাদর্শ দুর্বল হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বৈষম্যের সমস্যাও শেষ হয়ে গেছে।
বরং এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: কীভাবে এমন একটি সমাজ তৈরি হলো, যেখানে একজন ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন, অথচ একই দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ নিজেদের দরিদ্র বলে মনে করেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের অর্থনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু সেই পর্যায়ের বিস্তৃত ও গভীর গবেষণা খুব বেশি চোখে পড়ে না।
করব্যবস্থা কাদের পক্ষে?
বৈষম্য কমানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার করনীতি। কিন্তু ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক নীতিতে শ্রম ও পুঁজির ওপর করের ভার কীভাবে ভাগ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রদ্রিগো দুতার্তে ও ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের প্রশাসনের সময়ে কর্পোরেট আয়কর কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে মজুরির ওপর সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি পুঁজি ও কর্পোরেট বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে গিয়ে শ্রমজীবীদের তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মধ্যে ফেলছে?
এখানে সম্পদ করের প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ। লেইলা দে লিমার প্রস্তাবিত বিল অনুযায়ী, ১ বিলিয়ন পেসো বা তার বেশি করযোগ্য নিট সম্পদের মালিকদের ওপর সম্পদ কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এমন প্রস্তাব সংসদে কতটা রাজনৈতিক সমর্থন পাবে, সেটিই বড় অনিশ্চয়তা।
কারণ সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বড় ব্যবসা, বড় রাজনীতি
ফিলিপাইনে অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। অল্প কয়েকটি বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যখন বিপুল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তাদের প্রভাব বাজারের সীমানা ছাড়িয়ে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও পৌঁছাতে পারে।
এই কারণেই অ্যান্টিট্রাস্ট ও অ্যান্টিমোনোপলি আইন গুরুত্বপূর্ণ। তেওফিস্তো গুইঙ্গোনা জুনিয়র বহু বছর আগে বৃহৎ কর্পোরেট শক্তির একচেটিয়া বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি।
আজকের ব্যবসায়িক সংবাদে বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একের পর এক সম্পদ অধিগ্রহণ এবং বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মালিকানা বদলের খবর নিয়মিত দেখা যায়। অন্যদিকে অর্থনীতির নিচের স্তরের মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তা একইভাবে থেকে যায়।
এটি মুক্তবাজারের বিরুদ্ধে যুক্তি নয়। বরং এটি একটি কার্যকর বাজারের পক্ষে যুক্তি। কারণ প্রতিযোগিতা ছাড়া মুক্তবাজার শেষ পর্যন্ত এমন একটি ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে, যেখানে সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়েরাই আরও বড় হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়েরও দায় আছে
ফিলিপাইনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছেও তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কেবল ভবিষ্যতের প্রযুক্তিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরিতে মনোযোগ দেয়, কিন্তু সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা নিয়ে গভীর আলোচনা না করে, তাহলে শিক্ষার সামাজিক দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতিকে বদলে দেবে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল কারা পাবে এবং ক্ষতির বোঝা কারা বহন করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, নতুন সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্পদ যদি মূলত অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সামাজিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না।
তাই মানবিক শিক্ষা, নাগরিক চেতনা এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্নকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে দিলে সমাজ আরও বেশি অসম হয়ে উঠতে পারে।
সংসদের সামনে আসল পরীক্ষা
বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সংসদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করনীতি, প্রতিযোগিতা আইন, সম্পদ কর এবং সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো আইনসভার মাধ্যমেই তৈরি হয়।
একটি সংসদ চাইলে প্রগতিশীল করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বড় ব্যবসার একচেটিয়া ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। শ্রমজীবী মানুষের আয় ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর জন্য আইন করতে পারে।
কিন্তু যদি আইনপ্রণেতাদের বড় অংশ অতি-ধনী ও বৃহৎ ব্যবসার স্বার্থের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, তাহলে এই সংস্কারগুলো রাজনৈতিকভাবে আটকে যাবে।
এখানে লক্ষ্য ধনীদের শাস্তি দেওয়া নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সম্পদ সৃষ্টি উৎসাহিত হবে, কিন্তু সম্পদ রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকল্প হয়ে উঠবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একজন ট্রিলিয়নিয়ারকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো—একটি দেশে যখন একজনের সম্পদ নিচের ৪৯ শতাংশ মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি হতে পারে, অথচ সেই ৪৯ শতাংশের বড় অংশ নিজেদের দরিদ্র বা অতি দরিদ্র মনে করে, তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে সেই উত্তর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে করব্যবস্থা ন্যায্য, বাজার প্রতিযোগিতামূলক, শ্রমের মূল্য যথাযথ এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যকর।
অন্যথায় ফিলিপাইনের ট্রিলিয়নিয়ার তৈরির গল্প যতই সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হোক, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ৪৯ শতাংশ মানুষের দারিদ্র্যই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
মারলেন ভি. রনকিয়ো 


















