মানুষের মধ্যে মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু গবেষণা বলছে, অন্য কেউ আমাদের চেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবছে—এ কারণে যতটা অস্বস্তি তৈরি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বিরক্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয় যখন আমরা মনে করি, অন্য ব্যক্তির বিশ্বাসটি ভুল।
টিকা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নির্বাচন কিংবা আইনশৃঙ্খলার মতো বিতর্কিত বিষয়ে মতবিরোধ তাই অনেক সময় নিছক মতের পার্থক্য থাকে না। তখন বিষয়টি পরিণত হয় কে বাস্তবতা ও সত্যকে সঠিকভাবে দেখছে, আর কে ভুল করছে—এই প্রশ্নে।
গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের দুই হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে নিয়ে চারটি গবেষণা চালিয়ে এমন প্রবণতার সন্ধান পেয়েছেন। তাঁদের মতে, মানুষ সব ধরনের মতবিরোধকে একইভাবে দেখে না। বিশেষ করে যখন কেউ নিশ্চিত হন যে অপর ব্যক্তি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি বিশ্বাস ধারণ করছেন, তখন তাঁর মধ্যে বিরক্তি, হতাশা ও ক্ষোভ অনেক বেশি দেখা যায়।
‘ভিন্ন’ আর ‘ভুল’-এর পার্থক্য
ধরা যাক, দুজন মানুষের মধ্যে অভিবাসনের কাঙ্ক্ষিত মাত্রা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একজন মনে করেন অভিবাসন কমানো উচিত, অন্যজন মনে করেন আরও বেশি অভিবাসনের সুযোগ থাকা উচিত। এটি মূলত মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকারের পার্থক্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু যদি একজন মনে করেন অভিবাসীরা স্থানীয় নাগরিকদের তুলনায় বেশি অপরাধ করেন এবং অন্যজন মনে করেন পরিসংখ্যান তার সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলছে, তখন বিষয়টি আর শুধু মতের অমিল থাকে না। তা হয়ে ওঠে বাস্তবতা সম্পর্কে বিরোধ।
এই পার্থক্যটি মানুষের আচরণেও প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে এড়িয়ে যেতে চায় না, যার মত তার থেকে আলাদা। বরং এমন ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা বাড়ে, যাকে সে মনে করে ভুল করছে।
![]()
ভুল বিশ্বাস মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়
একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এমন একটি পরিস্থিতি স্মরণ করতে বলা হয়, যেখানে অন্য একজনের বিশ্বাস তাঁদের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলেনি। কারও ক্ষেত্রে সেটি ছিল নিছক মতের পার্থক্য, আবার কারও ক্ষেত্রে অপর ব্যক্তির বিশ্বাসকে তাঁরা বাস্তব তথ্যের দিক থেকে ভুল মনে করেছিলেন।
ফলাফল ছিল স্পষ্ট। যাঁরা মনে করেছিলেন অপর ব্যক্তির বিশ্বাস ভুল, তাঁরা বেশি বিরক্ত, হতাশ ও বিচলিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আরেকটি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন, মৃত্যুদণ্ড ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিতর্কিত বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের মতামত নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের বিপরীত মতের একটি কাল্পনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য দেখানো হয়।
যাঁরা বেশি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে ওই বক্তব্যের পেছনের ধারণাটি ভুল, তাঁরাই বেশি অস্বস্তি অনুভব করেন। একই সঙ্গে তাঁরা ওই ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলা, অবিশ্বাস করা কিংবা যোগাযোগ বন্ধ করার কথাও বেশি বলেছেন।
অন্যদিকে, তাঁরা যদি শুধু মনে করতেন যে ব্যক্তিটির মত আলাদা, কিন্তু ভুল নয়, তাহলে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তেমন দেখা যায়নি।
কেন অন্যের ‘ভুল’ এত বিরক্তিকর?
এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন।
প্রথমত, মানুষ আশঙ্কা করতে পারে যে ভুল বিশ্বাসের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যেমন টিকা বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভুল ধারণা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না, আশপাশের মানুষকেও তার ফল ভোগ করতে হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ভুল বিশ্বাস মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন বাস্তবতার ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা পৃথিবীকে বোঝার ক্ষেত্রে অন্য মানুষের ওপরও নির্ভর করি। ফলে কেউ এমন কিছু অস্বীকার করলে যা আমাদের কাছে স্পষ্ট সত্য বলে মনে হয়, তখন বিষয়টি নিছক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, মানুষ অন্যের বিশ্বাসকে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংকেত হিসেবেও দেখতে পারে। আমরা যখন নিশ্চিত হয়ে যাই যে কেউ ভুল, তখন তাকে পক্ষপাতদুষ্ট, অযৌক্তিক বা স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত বলেও ধরে নিতে পারি।
মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে এমন এক মানসিক পক্ষপাত হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মানুষ মনে করে সে নিজে বাস্তবতাকে নিরপেক্ষভাবে দেখছে, আর ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি পক্ষপাত বা স্বার্থের কারণে সত্যকে বিকৃতভাবে দেখছে।
![]()
ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা
তবে গবেষণার ফলাফল এমন নয় যে মতের পার্থক্য মানুষের কাছে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের সঙ্গে ভিন্ন বিশ্বাসের কাউকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম গ্রহণ করতে চায়। পরিবারের সদস্য, জীবনসঙ্গী কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ক্ষেত্রে একই মূল্যবোধ ও বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত অপেক্ষাকৃত দূরের মানুষের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তিকে ‘ভুল’ মনে করা।
অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মত ও মূল্যবোধের মিল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আর দূরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তিকে ভুল মনে করা নেতিবাচক অনুভূতি ও এড়িয়ে চলার প্রবণতার বড় কারণ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধ কেন এত তীব্র?
এ কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক অনেক সময় দ্রুত তিক্ত হয়ে ওঠে।
খেলা বা রুচি নিয়ে মতভেদ সাধারণত সহজেই মেনে নেওয়া যায়। কেউ একটি দল পছন্দ করে, অন্য কেউ অন্য দল—এ নিয়ে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
কিন্তু টিকা, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বাচন বা রাজনৈতিক দুর্নীতির মতো বিষয়ে মানুষ প্রায়ই মনে করে বিপরীত পক্ষ শুধু ভিন্ন মত পোষণ করছে না, বরং তথ্যগতভাবে ভুল এবং সেই ভুলের কারণে ক্ষতিও হতে পারে।
তখন ‘আমরা একমত নই’ কথাটি সহজে ‘তুমি ভুল’ হয়ে যায়। আর এই পরিবর্তনটিই বিরোধকে আরও আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে।
![]()
তথ্য দিয়ে বিতর্ক করলেও সমস্যা হতে পারে
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, তথ্যনির্ভর বিতর্কের মধ্যেও একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য থাকতে পারে।
তথ্য ও প্রমাণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষ যখন নিজের পছন্দ, মূল্যবোধ বা অগ্রাধিকারকে সমর্থন করতে তথ্য ব্যবহার করে, তখন একটি সাধারণ মতপার্থক্যও ‘কে সঠিক, কে ভুল’—এই লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।
কোন বিদ্যালয় নীতি বেশি কার্যকর, কোন রাজনৈতিক প্রার্থী মানুষের মূল্যবোধ ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন—এসব বিষয়ে মানুষ সহজেই বলতে পারে, ‘আমরা একমত নই।’
কিন্তু যখন বিতর্কটি সত্য ও তথ্যের প্রশ্নে পরিণত হয়, তখন ‘মত আলাদা হতে পারে’—এই অবস্থান ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত গবেষণাটি দেখায়, বিরোধ কতটা তিক্ত হবে তা শুধু কী নিয়ে মতভেদ হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে না; বরং আমরা সেই মতভেদকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছি, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই বক্তব্যকে ‘তোমার মত আমার থেকে আলাদা’ হিসেবে দেখা এবং ‘তুমি ভুল’ হিসেবে দেখা—এই দুই অবস্থার মানসিক ফল একেবারেই এক নয়।
মতপার্থক্য মেনে নেওয়া তাই শুধু সহনশীলতার বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে অন্যের অবস্থানকে ‘ভুল’ না ভেবে ‘ভিন্ন’ হিসেবে দেখার সক্ষমতাই সম্পর্ক ও সামাজিক আলোচনাকে কম সংঘাতপূর্ণ রাখতে পারে।
মতভেদ থাকুক, কিন্তু প্রতিটি মতভেদকে সত্য-মিথ্যার যুদ্ধে পরিণত না করাই হয়তো সুস্থ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















