০৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ জন, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বর্তী উপবাসের উপকারিতা কি অতিরঞ্জিত? রাশিয়া-যুক্তরাজ্য কি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে? কূটনীতি সরে গেলে যে বিপদ বাড়ে বাংলাদেশে আবারও বাড়ল সোনার দাম, ভরিতে নতুন দর ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪৩ টাকা ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা তোলার সীমা তুলে দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সর্বাত্মক চাপ’ ইরানের বিরুদ্ধে, মিত্র দেশগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি চালক থেকে রোবোট্যাক্সি কর্মী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন কর্মজীবনের চিত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানেই কি আরও গভীর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ঘাটতি? ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধে দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি, আপাতত নিষেধাজ্ঞা নয় দীর্ঘমেয়াদি ইয়েনের দুর্বলতায় নতুন কৌশল খুঁজছে জাপানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে বড় খাদ্য কোম্পানির চাপ

ভারতে প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার শনাক্ত করতে মোড়কের সামনের অংশে সহজে চোখে পড়ার মতো রঙিন সতর্কতা দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তির মুখে সেই উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

একই পানীয়, ভিন্ন উপাদান

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া ফান্টা পানীয়ের একটি ক্যানের তুলনায় ভারতে একই ব্র্যান্ডের পানীয়তে প্রায় তিন গুণ বেশি চিনি রয়েছে। ভারতীয় সংস্করণে এমন কৃত্রিম রংও রয়েছে, যার উপস্থিতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার কারণ হতে পারে। তবে ভারতে এ তথ্য ক্যানের পেছনে ছোট অক্ষরে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্বের বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে পুষ্টিগত সতর্কতা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছে।

রঙিন সতর্কতার প্রস্তাব থেকে সরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগস্টে জানিয়েছে, প্যাকেটের সামনে চিনি, চর্বি ও লবণের মাত্রা বোঝাতে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা তারা আর এগিয়ে নিচ্ছে না। তাদের যুক্তি, ভারতীয় খাবারে পশ্চিমা খাবারের তুলনায় স্বাদ ও উপাদানের বৈচিত্র্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ধাঁচের সতর্কতামূলক চিহ্ন সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।

এর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাদা-কালো ছকে চিনি, চর্বি ও লবণের পরিমাণ দেখানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্যকর্মীদের করা আবেদনের পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে। আদালত এর আগে খাদ্যপণ্যের মোড়কে আরও স্পষ্ট সতর্কতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছিল।

মার্চের বৈঠকে তীব্র বিরোধিতা

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে খাদ্যশিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি বৈঠকে এ বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বৈঠকের রেকর্ডিং পর্যালোচনা করে জানা গেছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা সতর্কতামূলক চিহ্নকে বিভ্রান্তিকর ও অকার্যকর বলে দাবি করেন।

India wanted red flags on chip packets and soda. Big Food fought back. |  Reuters

কোকা-কোলা ইন্ডিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুক্তি দেন, যেসব ভোক্তা এখনো খাদ্যপণ্যের উপাদান তালিকা পড়েন না, তারা কেবল কোনো প্রতীক বা চিহ্ন দেখেই নিজেদের খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করবেন—এমন ধারণা অতিসরলীকৃত।

শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা সতর্কতামূলক লেবেলের পরিবর্তে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ বা একবারে কতটুকু খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

একই কোম্পানির পণ্যে ভিন্ন নীতি

অন্যদিকে, কোকা-কোলা ও তাদের বোতলজাতকারী অংশীদাররা ইউরোপের প্রায় দুই ডজন বাজারে স্বেচ্ছায় সংকেতভিত্তিক পুষ্টি লেবেল ব্যবহার করছে। এসব লেবেলে পানীয়তে থাকা চিনি, লবণ ও অন্যান্য উপাদানের মাত্রা সহজে বোঝার সুযোগ থাকে।

নেসলেও ভারতে প্যাকেটের সামনের অংশে ব্যাখ্যামূলক পুষ্টি লেবেল চালুর বিরোধিতা করা শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সদস্য। অথচ যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকেই এ ধরনের লেবেল স্বেচ্ছায় ব্যবহার করছে।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ভারতের একশ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয় বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যকে উচ্চমাত্রার চর্বি, চিনি ও লবণযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে শিল্পখাতের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষের সম্ভাব্য সংখ্যা। সাম্প্রতিক এক গবেষণার হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের মোড়কে সহজবোধ্য ও স্পষ্ট তথ্য থাকলে ভোক্তারা তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে পারেন।

আদালতের কড়া মন্তব্য

২০১৭ সাল থেকেই ভারতে খাদ্যপণ্যের মোড়কে রঙিন সতর্কতা ও পুষ্টিমানভিত্তিক তারকা চিহ্ন ব্যবহারের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু এখনো উৎপাদকদের মূলত পণ্যের পেছনে উপাদান ও মৌলিক পুষ্টিগত তথ্য উল্লেখ করলেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ন্ত্রকদের খাদ্যপণ্যের মোড়কে সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছিল। আদালত ইসরায়েলের লাল-সবুজ সংকেতভিত্তিক পদ্ধতিও পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দেয়।

কিন্তু মার্চের বৈঠকের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন ব্যাখ্যামূলক লেবেল থেকে পিছিয়ে যায়। আগস্টে আদালতে তারা জানায়, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে ভারতের প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং ব্যবস্থা সামঞ্জস্য করা কঠিন।

এ অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকেরা বলেন, ভারতের নাগরিকদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে দেশটি যে উদ্বিগ্ন—বিশ্বের তা জানা উচিত।

Supreme Court raps FSSAI over warning labels on high-salt, sugar and fat packaged  foods - The Economic Times

ভোক্তার ক্ষোভে বদলাচ্ছে বাজার

ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতাও বাড়ছে। বাজার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর তুলনায় ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমাতে ব্যবহৃত ওষুধের মাসিক বিক্রি প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।

একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের বিরুদ্ধে প্রচারও জোরদার হয়েছে। খাদ্যপণ্যের উপাদান নিয়ে বিশ্লেষণ করা কয়েকজন কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বড় কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন মুম্বাইয়ের খাদ্যবিষয়ক প্রচারক রেভান্ত হিমাতসিংকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। তিনি ভারতে বিক্রি হওয়া ফান্টা ও কিটক্যাটের উপাদান ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া একই পণ্যের সঙ্গে তুলনা করে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন

ভারতে বিক্রি হওয়া কিটক্যাটে কোকোর পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া একই পণ্যের দুধের চকলেটে কোকোর পরিমাণ অন্তত ২২ শতাংশ।

ভারতে নেসলের সব ধরনের ম্যাগি তাৎক্ষণিক নুডলসে পাম তেল ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া অনেক সংস্করণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া কিছু ম্যাগি নুডলস আবার ভারতেই তৈরি হলেও সেগুলোর মোড়কের সামনে বেশি লবণ থাকার বিষয়ে রঙিন সতর্কতা দেওয়া থাকে।

এ ধরনের পার্থক্য নিয়ে ভারতীয় ভোক্তাদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, একই ব্র্যান্ডের পণ্যে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হলেও ভারতীয় ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিম্নমানের সংস্করণ পাচ্ছেন।

ভোক্তার চাপেই বদল আসছে

তবে ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদা যে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোকে কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করছে, তারও উদাহরণ রয়েছে।

২০২৪ সালে নেসলে ভারতে চিনি ছাড়া শিশুখাদ্য সেরেলাক বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দেয়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারতে শুধু চিনি যুক্ত সংস্করণই বিক্রি করা হয়েছে, যদিও অন্য অনেক দেশে প্রতিষ্ঠানটি চিনি ছাড়া সংস্করণ বিক্রি করে আসছিল।

সব মিলিয়ে ভারতের প্যাকেটজাত খাদ্যবাজারে স্বাস্থ্য, স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ভোক্তা ও জনস্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতামূলক তথ্য চাইছেন, অন্যদিকে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো এসব লেবেলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরও এ বিতর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোর বিরোধ তীব্র হয়েছে। চিনি, লবণ ও চর্বির মাত্রা স্পষ্টভাবে জানানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ জন, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে বড় খাদ্য কোম্পানির চাপ

০৩:০৬:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

ভারতে প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার শনাক্ত করতে মোড়কের সামনের অংশে সহজে চোখে পড়ার মতো রঙিন সতর্কতা দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তির মুখে সেই উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

একই পানীয়, ভিন্ন উপাদান

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া ফান্টা পানীয়ের একটি ক্যানের তুলনায় ভারতে একই ব্র্যান্ডের পানীয়তে প্রায় তিন গুণ বেশি চিনি রয়েছে। ভারতীয় সংস্করণে এমন কৃত্রিম রংও রয়েছে, যার উপস্থিতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার কারণ হতে পারে। তবে ভারতে এ তথ্য ক্যানের পেছনে ছোট অক্ষরে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্বের বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে পুষ্টিগত সতর্কতা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছে।

রঙিন সতর্কতার প্রস্তাব থেকে সরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগস্টে জানিয়েছে, প্যাকেটের সামনে চিনি, চর্বি ও লবণের মাত্রা বোঝাতে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা তারা আর এগিয়ে নিচ্ছে না। তাদের যুক্তি, ভারতীয় খাবারে পশ্চিমা খাবারের তুলনায় স্বাদ ও উপাদানের বৈচিত্র্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ধাঁচের সতর্কতামূলক চিহ্ন সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।

এর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাদা-কালো ছকে চিনি, চর্বি ও লবণের পরিমাণ দেখানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্যকর্মীদের করা আবেদনের পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে। আদালত এর আগে খাদ্যপণ্যের মোড়কে আরও স্পষ্ট সতর্কতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছিল।

মার্চের বৈঠকে তীব্র বিরোধিতা

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে খাদ্যশিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি বৈঠকে এ বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বৈঠকের রেকর্ডিং পর্যালোচনা করে জানা গেছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা সতর্কতামূলক চিহ্নকে বিভ্রান্তিকর ও অকার্যকর বলে দাবি করেন।

India wanted red flags on chip packets and soda. Big Food fought back. |  Reuters

কোকা-কোলা ইন্ডিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুক্তি দেন, যেসব ভোক্তা এখনো খাদ্যপণ্যের উপাদান তালিকা পড়েন না, তারা কেবল কোনো প্রতীক বা চিহ্ন দেখেই নিজেদের খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করবেন—এমন ধারণা অতিসরলীকৃত।

শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা সতর্কতামূলক লেবেলের পরিবর্তে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ বা একবারে কতটুকু খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

একই কোম্পানির পণ্যে ভিন্ন নীতি

অন্যদিকে, কোকা-কোলা ও তাদের বোতলজাতকারী অংশীদাররা ইউরোপের প্রায় দুই ডজন বাজারে স্বেচ্ছায় সংকেতভিত্তিক পুষ্টি লেবেল ব্যবহার করছে। এসব লেবেলে পানীয়তে থাকা চিনি, লবণ ও অন্যান্য উপাদানের মাত্রা সহজে বোঝার সুযোগ থাকে।

নেসলেও ভারতে প্যাকেটের সামনের অংশে ব্যাখ্যামূলক পুষ্টি লেবেল চালুর বিরোধিতা করা শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সদস্য। অথচ যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকেই এ ধরনের লেবেল স্বেচ্ছায় ব্যবহার করছে।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ভারতের একশ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয় বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যকে উচ্চমাত্রার চর্বি, চিনি ও লবণযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে শিল্পখাতের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষের সম্ভাব্য সংখ্যা। সাম্প্রতিক এক গবেষণার হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের মোড়কে সহজবোধ্য ও স্পষ্ট তথ্য থাকলে ভোক্তারা তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে পারেন।

আদালতের কড়া মন্তব্য

২০১৭ সাল থেকেই ভারতে খাদ্যপণ্যের মোড়কে রঙিন সতর্কতা ও পুষ্টিমানভিত্তিক তারকা চিহ্ন ব্যবহারের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু এখনো উৎপাদকদের মূলত পণ্যের পেছনে উপাদান ও মৌলিক পুষ্টিগত তথ্য উল্লেখ করলেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ন্ত্রকদের খাদ্যপণ্যের মোড়কে সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছিল। আদালত ইসরায়েলের লাল-সবুজ সংকেতভিত্তিক পদ্ধতিও পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দেয়।

কিন্তু মার্চের বৈঠকের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন ব্যাখ্যামূলক লেবেল থেকে পিছিয়ে যায়। আগস্টে আদালতে তারা জানায়, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে ভারতের প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং ব্যবস্থা সামঞ্জস্য করা কঠিন।

এ অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকেরা বলেন, ভারতের নাগরিকদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে দেশটি যে উদ্বিগ্ন—বিশ্বের তা জানা উচিত।

Supreme Court raps FSSAI over warning labels on high-salt, sugar and fat packaged  foods - The Economic Times

ভোক্তার ক্ষোভে বদলাচ্ছে বাজার

ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতাও বাড়ছে। বাজার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর তুলনায় ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমাতে ব্যবহৃত ওষুধের মাসিক বিক্রি প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।

একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের বিরুদ্ধে প্রচারও জোরদার হয়েছে। খাদ্যপণ্যের উপাদান নিয়ে বিশ্লেষণ করা কয়েকজন কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বড় কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন মুম্বাইয়ের খাদ্যবিষয়ক প্রচারক রেভান্ত হিমাতসিংকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। তিনি ভারতে বিক্রি হওয়া ফান্টা ও কিটক্যাটের উপাদান ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া একই পণ্যের সঙ্গে তুলনা করে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন

ভারতে বিক্রি হওয়া কিটক্যাটে কোকোর পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া একই পণ্যের দুধের চকলেটে কোকোর পরিমাণ অন্তত ২২ শতাংশ।

ভারতে নেসলের সব ধরনের ম্যাগি তাৎক্ষণিক নুডলসে পাম তেল ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া অনেক সংস্করণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া কিছু ম্যাগি নুডলস আবার ভারতেই তৈরি হলেও সেগুলোর মোড়কের সামনে বেশি লবণ থাকার বিষয়ে রঙিন সতর্কতা দেওয়া থাকে।

এ ধরনের পার্থক্য নিয়ে ভারতীয় ভোক্তাদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, একই ব্র্যান্ডের পণ্যে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হলেও ভারতীয় ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিম্নমানের সংস্করণ পাচ্ছেন।

ভোক্তার চাপেই বদল আসছে

তবে ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদা যে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোকে কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করছে, তারও উদাহরণ রয়েছে।

২০২৪ সালে নেসলে ভারতে চিনি ছাড়া শিশুখাদ্য সেরেলাক বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দেয়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারতে শুধু চিনি যুক্ত সংস্করণই বিক্রি করা হয়েছে, যদিও অন্য অনেক দেশে প্রতিষ্ঠানটি চিনি ছাড়া সংস্করণ বিক্রি করে আসছিল।

সব মিলিয়ে ভারতের প্যাকেটজাত খাদ্যবাজারে স্বাস্থ্য, স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ভোক্তা ও জনস্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতামূলক তথ্য চাইছেন, অন্যদিকে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো এসব লেবেলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরও এ বিতর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বড় খাদ্য কোম্পানিগুলোর বিরোধ তীব্র হয়েছে। চিনি, লবণ ও চর্বির মাত্রা স্পষ্টভাবে জানানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।