০৪:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ জন, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বর্তী উপবাসের উপকারিতা কি অতিরঞ্জিত? রাশিয়া-যুক্তরাজ্য কি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে? কূটনীতি সরে গেলে যে বিপদ বাড়ে বাংলাদেশে আবারও বাড়ল সোনার দাম, ভরিতে নতুন দর ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪৩ টাকা ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা তোলার সীমা তুলে দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সর্বাত্মক চাপ’ ইরানের বিরুদ্ধে, মিত্র দেশগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি চালক থেকে রোবোট্যাক্সি কর্মী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন কর্মজীবনের চিত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানেই কি আরও গভীর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ঘাটতি? ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধে দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি, আপাতত নিষেধাজ্ঞা নয় দীর্ঘমেয়াদি ইয়েনের দুর্বলতায় নতুন কৌশল খুঁজছে জাপানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো

গঙ্গার পানি বাড়তেই ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি বিহারের, নতুন করে প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত পানি চুক্তি

ভারতের বিহারে গঙ্গার পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ব্যারেজের গেটগুলো পুরোপুরি খুলে দিলে গঙ্গার পানির প্রবাহ আরও স্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে নামতে পারবে এবং বিহারের ওপর তৈরি হওয়া বন্যার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

তবে বিহারের এই দাবি শুধু চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গঙ্গার পানি বণ্টন প্রশ্ন। কারণ, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ফারাক্কা ও গঙ্গার পানিকে ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

বন্যার চাপে ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি

রোববার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। ওই আলোচনায় তিনি ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, বিহারের বেশ কয়েকটি এলাকায় গঙ্গার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছে।

সম্রাট চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফারাক্কার সব গেট খুলে দিলে নদীর পানির প্রবাহ বাড়বে এবং গঙ্গার ওপরের দিকে পানির চাপ কমানো সম্ভব হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অনুরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বিহারের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় গঙ্গার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে রয়েছে। পাটনা ও বক্সারসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছর বিহারে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হলেও গঙ্গার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

Dhaka hopes Delhi to move forward on Ganges Water Treaty renewal | The  Business Standard

শুধু বন্যা নয়, সামনে বড় পানি-রাজনীতির প্রশ্ন

ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে বিহারের দাবি আপাতদৃষ্টিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। কিন্তু এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ, ফারাক্কা ব্যারেজ গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি বণ্টন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ভারত ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখতে সহায়তা করা। পরবর্তী সময়ে ফারাক্কা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের গঙ্গার পানি বণ্টনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা এলাকায় গঙ্গার পানির প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করার একটি কাঠামো নির্ধারিত হয়। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ভারতের বিভিন্ন রাজ্য নিজেদের পানি প্রয়োজন সামনে আনছে।

চুক্তি নবায়নে আপত্তি বিহারের

বিহারের ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান কাঠামোয় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করা উচিত হবে না। তাঁদের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

জনতা দল-ইউনাইটেডের জাতীয় পর্যায়ের নেতা সঞ্জয় কুমার ঝা বলেছেন, ভবিষ্যতের যেকোনো পানি বণ্টন ব্যবস্থায় বিহারের পানীয় জল, সেচ, কৃষি ও শিল্পের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিহার এবার ভারত-বাংলাদেশের পানি বণ্টন আলোচনায় নিজেদের অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে।

বিহারের নেতাদের অভিযোগ, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামোর কারণে রাজ্যটি একদিকে বন্যার ক্ষতির মুখে পড়ে, অন্যদিকে অন্য সময়ে পানির সংকটেও ভোগে। অতিরিক্ত পলি জমা, নদীর গতিপথ ও পানি ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কথাও তাঁরা সামনে আনছেন।

নয়াদিল্লির কাছেও পৌঁছেছে বিহারের উদ্বেগ

ফারাক্কা ব্যারেজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিহারের উদ্বেগ এখন শুধু রাজ্য রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও তোলা হয়েছে।

বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের উদ্বেগ ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্র।

এ নিয়ে বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে পানি সম্পদ, সেচ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ, গঙ্গার পানি এখন বিহারের কাছে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি কৃষি, শিল্প, পানীয় জল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফারাক্কা নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে এতদিন আলোচনায় প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কই গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর স্বার্থও বিষয়টিকে জটিল করে তুলছে।

Keep Bihar's interests in mind': JD(U) presses Centre not to renew Farakka  Water Treaty with Bangladesh – RNA – Research, News & Analysis

বিহার চাইছে, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় তার বন্যা ও পানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। পশ্চিমবঙ্গের জন্য আবার ফারাক্কার পানির প্রবাহ এবং ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ কৃষি, পরিবেশ, নদী ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ফলে ফারাক্কার গেট কখন, কতটা এবং কোন পরিস্থিতিতে খোলা হবে—এই প্রশ্নটি কেবল একটি ব্যারেজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক রাজ্য, দুই দেশের পানি বণ্টন ব্যবস্থা এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য গঙ্গা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, নদী ও পরিবেশের ওপর গঙ্গার পানিপ্রবাহের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিতে সেচের সমস্যা এবং নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

এ কারণেই ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিহারের বর্তমান দাবি তাই ঢাকার জন্যও নজর রাখার মতো একটি বিষয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমীকরণ

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এর আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

এবার সেই আলোচনার প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কারণ, ভারতের ভেতর থেকেই বিহার নিজেদের পানি প্রয়োজন সামনে এনে চুক্তির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। রাজ্যটি চাইছে, নতুন কোনো ব্যবস্থা হলে তার পানীয় জল, সেচ, কৃষি ও শিল্পায়নের চাহিদা যেন স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

এতে ভবিষ্যতের পানি বণ্টন আলোচনা আরও বহুমাত্রিক হতে পারে। বাংলাদেশ একদিকে তার ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে, অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর দাবিও সামলাতে হবে।

Ganga Water Dispute and Indo-Bangladesh Water Treaty – Geo-Synthesis

বন্যা পরিস্থিতিই এখন তাৎক্ষণিক বাস্তবতা

তবে দীর্ঘমেয়াদি পানি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এই মুহূর্তে বিহারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বন্যা। গঙ্গার পানি বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা, কৃষিজমি এবং অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিহারের দাবি, ফারাক্কার গেট খুলে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে ওপরের দিকে জমে থাকা পানির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নদীর সামগ্রিক প্রবাহ, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।

অর্থাৎ, বিহারের বন্যা পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজতে গিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যার প্রভাব অন্য অঞ্চলে নতুন সংকট তৈরি করে।

গঙ্গাকে ঘিরে নতুন আলোচনার আভাস

ফারাক্কা ব্যারেজকে ঘিরে বিহারের সর্বশেষ দাবি তাই শুধু একটি বন্যা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি রাজনীতি, পশ্চিমবঙ্গের নদী ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের পানির অধিকার এবং আসন্ন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রশ্ন।

গঙ্গার পানি যত বাড়ছে, ফারাক্কা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ততই বিস্তৃত হচ্ছে। সামনে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসবে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পানি প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের পানিপ্রবাহ—দুই বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।

বিহারের সব গেট খুলে দেওয়ার দাবি সেই বৃহত্তর আলোচনারই একটি নতুন ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, বন্যার তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে ফারাক্কায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ডিসেম্বরের পর ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গার পানি বণ্টনের ভবিষ্যৎ কাঠামো কোন পথে এগোয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ জন, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?

গঙ্গার পানি বাড়তেই ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি বিহারের, নতুন করে প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত পানি চুক্তি

০৩:১১:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

ভারতের বিহারে গঙ্গার পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ব্যারেজের গেটগুলো পুরোপুরি খুলে দিলে গঙ্গার পানির প্রবাহ আরও স্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে নামতে পারবে এবং বিহারের ওপর তৈরি হওয়া বন্যার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

তবে বিহারের এই দাবি শুধু চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গঙ্গার পানি বণ্টন প্রশ্ন। কারণ, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ফারাক্কা ও গঙ্গার পানিকে ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

বন্যার চাপে ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি

রোববার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। ওই আলোচনায় তিনি ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, বিহারের বেশ কয়েকটি এলাকায় গঙ্গার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছে।

সম্রাট চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফারাক্কার সব গেট খুলে দিলে নদীর পানির প্রবাহ বাড়বে এবং গঙ্গার ওপরের দিকে পানির চাপ কমানো সম্ভব হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অনুরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বিহারের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় গঙ্গার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে রয়েছে। পাটনা ও বক্সারসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছর বিহারে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হলেও গঙ্গার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

Dhaka hopes Delhi to move forward on Ganges Water Treaty renewal | The  Business Standard

শুধু বন্যা নয়, সামনে বড় পানি-রাজনীতির প্রশ্ন

ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে বিহারের দাবি আপাতদৃষ্টিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। কিন্তু এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ, ফারাক্কা ব্যারেজ গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি বণ্টন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ভারত ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখতে সহায়তা করা। পরবর্তী সময়ে ফারাক্কা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের গঙ্গার পানি বণ্টনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা এলাকায় গঙ্গার পানির প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করার একটি কাঠামো নির্ধারিত হয়। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ভারতের বিভিন্ন রাজ্য নিজেদের পানি প্রয়োজন সামনে আনছে।

চুক্তি নবায়নে আপত্তি বিহারের

বিহারের ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান কাঠামোয় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করা উচিত হবে না। তাঁদের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

জনতা দল-ইউনাইটেডের জাতীয় পর্যায়ের নেতা সঞ্জয় কুমার ঝা বলেছেন, ভবিষ্যতের যেকোনো পানি বণ্টন ব্যবস্থায় বিহারের পানীয় জল, সেচ, কৃষি ও শিল্পের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিহার এবার ভারত-বাংলাদেশের পানি বণ্টন আলোচনায় নিজেদের অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে।

বিহারের নেতাদের অভিযোগ, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামোর কারণে রাজ্যটি একদিকে বন্যার ক্ষতির মুখে পড়ে, অন্যদিকে অন্য সময়ে পানির সংকটেও ভোগে। অতিরিক্ত পলি জমা, নদীর গতিপথ ও পানি ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কথাও তাঁরা সামনে আনছেন।

নয়াদিল্লির কাছেও পৌঁছেছে বিহারের উদ্বেগ

ফারাক্কা ব্যারেজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিহারের উদ্বেগ এখন শুধু রাজ্য রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও তোলা হয়েছে।

বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের উদ্বেগ ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্র।

এ নিয়ে বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে পানি সম্পদ, সেচ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ, গঙ্গার পানি এখন বিহারের কাছে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি কৃষি, শিল্প, পানীয় জল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফারাক্কা নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে এতদিন আলোচনায় প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কই গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর স্বার্থও বিষয়টিকে জটিল করে তুলছে।

Keep Bihar's interests in mind': JD(U) presses Centre not to renew Farakka  Water Treaty with Bangladesh – RNA – Research, News & Analysis

বিহার চাইছে, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় তার বন্যা ও পানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। পশ্চিমবঙ্গের জন্য আবার ফারাক্কার পানির প্রবাহ এবং ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ কৃষি, পরিবেশ, নদী ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ফলে ফারাক্কার গেট কখন, কতটা এবং কোন পরিস্থিতিতে খোলা হবে—এই প্রশ্নটি কেবল একটি ব্যারেজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক রাজ্য, দুই দেশের পানি বণ্টন ব্যবস্থা এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য গঙ্গা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, নদী ও পরিবেশের ওপর গঙ্গার পানিপ্রবাহের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিতে সেচের সমস্যা এবং নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

এ কারণেই ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিহারের বর্তমান দাবি তাই ঢাকার জন্যও নজর রাখার মতো একটি বিষয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমীকরণ

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এর আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

এবার সেই আলোচনার প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কারণ, ভারতের ভেতর থেকেই বিহার নিজেদের পানি প্রয়োজন সামনে এনে চুক্তির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। রাজ্যটি চাইছে, নতুন কোনো ব্যবস্থা হলে তার পানীয় জল, সেচ, কৃষি ও শিল্পায়নের চাহিদা যেন স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

এতে ভবিষ্যতের পানি বণ্টন আলোচনা আরও বহুমাত্রিক হতে পারে। বাংলাদেশ একদিকে তার ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে, অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর দাবিও সামলাতে হবে।

Ganga Water Dispute and Indo-Bangladesh Water Treaty – Geo-Synthesis

বন্যা পরিস্থিতিই এখন তাৎক্ষণিক বাস্তবতা

তবে দীর্ঘমেয়াদি পানি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এই মুহূর্তে বিহারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বন্যা। গঙ্গার পানি বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা, কৃষিজমি এবং অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিহারের দাবি, ফারাক্কার গেট খুলে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে ওপরের দিকে জমে থাকা পানির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নদীর সামগ্রিক প্রবাহ, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।

অর্থাৎ, বিহারের বন্যা পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজতে গিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যার প্রভাব অন্য অঞ্চলে নতুন সংকট তৈরি করে।

গঙ্গাকে ঘিরে নতুন আলোচনার আভাস

ফারাক্কা ব্যারেজকে ঘিরে বিহারের সর্বশেষ দাবি তাই শুধু একটি বন্যা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি রাজনীতি, পশ্চিমবঙ্গের নদী ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের পানির অধিকার এবং আসন্ন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রশ্ন।

গঙ্গার পানি যত বাড়ছে, ফারাক্কা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ততই বিস্তৃত হচ্ছে। সামনে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসবে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পানি প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের পানিপ্রবাহ—দুই বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।

বিহারের সব গেট খুলে দেওয়ার দাবি সেই বৃহত্তর আলোচনারই একটি নতুন ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, বন্যার তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে ফারাক্কায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ডিসেম্বরের পর ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গার পানি বণ্টনের ভবিষ্যৎ কাঠামো কোন পথে এগোয়।