ইরানের সঙ্গে বহু দশকের সংঘাতময় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত যে যুদ্ধ চেয়েছিলেন, তা পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রও সেই যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ছয় মাসের সংঘাতের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইসরায়েল কি সত্যিই সেই কৌশলগত ফল অর্জন করতে পেরেছে, যার জন্য যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল?
সামরিক অভিযানের দিক থেকে ইসরায়েলের হাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফলাফল অনেক বেশি জটিল। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে আছে, বরং সংঘাতের পর তার নিরাপত্তা-চিন্তা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনাই তৈরি হয়েছে।
এই জায়গাতেই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধের আগে ইসরায়েল ইরানকে তার অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু এখন ইরান যদি মনে করে প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারেনি, তাহলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলের সাবেক শীর্ষস্থানীয় ইরান-বিষয়ক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচের মূল্যায়নটি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ইসরায়েলের হাতে কিছু কার্যকর সামরিক অর্জন থাকলেও সামগ্রিক কৌশলের বিচারে দেশটি ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধের ফলাফলকে শুধু ধ্বংস হওয়া স্থাপনা বা নিহত নেতাদের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে এই সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে যোগ দেওয়ার পর এপ্রিলেই যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। জনমত এবং তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপও তার অবস্থান বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছে। পরে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন হামলার কথা বললেও তিনি আবারও এমন একটি সমঝোতার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, যাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ থাকবে।
এখানে ইসরায়েলের জন্য একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরানকে আরও দুর্বল করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে এমন একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যা তেহরানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু ইরানকে দুর্বল করার সামরিক প্রচেষ্টা এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ—দুটিকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নেতানিয়াহু ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। সেই চুক্তির পরিবর্তে এখন যদি আরও কঠোর কোনো সমঝোতা আনার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে ইরানের নতুন নিরাপত্তা হিসাবের ওপর। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যদি তেহরানকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় যে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা প্রয়োজন, তাহলে শুধু বোমা হামলা দিয়ে সেই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ জনমতও নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় ও আগাম ইনস্টিটিউটের জুনের এক জরিপে ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেছেন, সংঘাত থেকে ইরানই বেশি লাভবান হয়েছে বা অন্তত তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছে। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে এমন মনোভাব নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
তবে নেতানিয়াহুর কৌশলকে সরলভাবে ব্যর্থ বলেও দেখার সুযোগ নেই। কেউ কেউ মনে করেন, তার লক্ষ্য হয়তো ইরানের সরকারকে সরাসরি উৎখাত করা নয়; বরং এমন মাত্রায় ক্ষতি করা, যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েল প্রয়োজন মনে করলে আবারও হামলা চালাতে পারে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের যে সামরিক পদ্ধতি দেখা গেছে, তার সঙ্গে এই ধারণার মিল রয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে নেতানিয়াহুর কাছে যুদ্ধটি পুরোপুরি পরাজয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে নিয়ে আসা এবং পরবর্তী পর্যায়ে ওয়াশিংটনকে ইরাননীতি নিয়ে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলা ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই কৌশল দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি করেছে।
আরও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে ইরানের জনগণের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রশ্নে। ইসলামি বিপ্লবের আগে ইসরায়েল ও ইরানের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। যুদ্ধের আগে ইরানের ভেতরে ধর্মীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষেরও লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। ফলে ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলে যে আশা ছিল, যুদ্ধ সেটিকে সহজ করে দেওয়ার বদলে উল্টো আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প দুজনেই ইরানের জনগণের প্রতি সমর্থনের কথা বলেছেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে দুই দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া কঠোর ও সর্বনাশা পরিণতির হুমকি এবং হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি—এসব ইরানি জনগণের কাছে সেই বার্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
যদি ইরানের সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে এই যুদ্ধ মূলত বেসামরিক হতাহত, ধ্বংস ও জাতীয় অবকাঠামোর ক্ষতি হিসেবে থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী বিরূপতা তৈরি হতে পারে। ইরানের বর্তমান সরকার হয়তো এই যুদ্ধের কারণে আরও দুর্বল হতে পারে, কিন্তু বিদেশি হামলার অভিজ্ঞতা জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়াকেও শক্তিশালী করতে পারে।
সুতরাং এই যুদ্ধের আসল ফলাফল এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। ইসরায়েল সামরিকভাবে ইরানকে বড় আঘাত করেছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সামরিক সাফল্য এবং কৌশলগত বিজয় এক জিনিস নয়। যদি যুদ্ধ ইরানকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, আরও প্রতিশোধপরায়ণ এবং শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে আরও দৃঢ় করে তোলে, তাহলে আজকের সামরিক অর্জন ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর জন্য তাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি ইরানের তাৎক্ষণিক সক্ষমতা কতটা কমিয়েছেন, তা নয়। বরং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইরান কী ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে উঠে দাঁড়াবে—আর সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কতটা নিরাপদ থাকবে—তার উত্তরই নির্ধারণ করবে এই অভিযানের প্রকৃত সাফল্য বা ব্যর্থতা।
শান ট্যান্ডন 



















