যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন এমন এক পরিবর্তন দৃশ্যমান, যা কয়েক বছর আগেও সহজে কল্পনা করা যেত না। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলই ভিন্ন রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে এলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা এবং অভিজাত শ্রেণির বাড়তে থাকা ক্ষমতা নিয়ে তাদের বক্তব্য ক্রমশ কাছাকাছি আসছে। এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে জেডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভাষায়।
সম্প্রতি নির্মাণশ্রমিকদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভ্যান্স লুইজিয়ানার সাবেক গভর্নর ও সিনেটর হিউই লংকে স্মরণ করেছেন। লং ছিলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এক ব্যতিক্রমী পপুলিস্ট নেতা। তিনি বড় করপোরেশন ও অতিধনী শ্রেণির ক্ষমতা সীমিত করার কথা বলেছিলেন এবং সম্পদের বৃহত্তর বণ্টনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রায় এক শতাব্দী পর একজন সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের মুখে লংয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ফিরে আসা নিছক কাকতালীয় বলে মনে হয় না।
ভ্যান্স অবশ্য লংয়ের বক্তব্যকে নিজের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করেছেন। অপরাধ ও অভিবাসনের মতো প্রচলিত রিপাবলিকান ইস্যুর সঙ্গে শ্রমিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে যুক্ত করেছেন তিনি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত পাওয়া যায়: রিপাবলিকানদের জন্য শ্রমজীবী ভোটার আর কেবল নির্বাচনী জোটের একটি অংশ নয়; তাদের অর্থনৈতিক অসন্তোষ এখন দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার রাজনীতি
মার্কিন ভোটারদের মধ্যে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং পণ্য, পেট্রল ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই উদ্বেগের রাজনৈতিক প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান ২০২৪ সালের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থী অংশও এই পরিবর্তন বুঝতে পারছে। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে সাফল্য পাচ্ছেন। আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ও জোহরান মামদানির মতো নেতাদের উত্থান অর্থনৈতিক রাজনীতির আলোচনাকে আরও বাম দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শ্রমিক ইউনিয়ন, সম্পদ কর, একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি কোম্পানির ক্ষমতা, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অর্থের প্রভাব—এসব বিষয় আবার মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।
কিন্তু একই সময়ে রিপাবলিকান শিবিরেও ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের চিন্তা তৈরি হয়েছে। ওরেন ক্যাসের নেতৃত্বাধীন আমেরিকান কম্পাসের মতো নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান রিপাবলিকানদের কর কমানোর পুরোনো রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প, উৎপাদন ও শ্রমিকস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। শ্রমিকদের করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, শুল্ক আরোপ এবং দেশে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার মতো ধারণা সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে।
দুই দলের অর্থনৈতিক পথ অবশ্য এক নয়। ডেমোক্র্যাটরা পুনর্বণ্টন, ধনীদের ওপর কর এবং সরকারি ব্যয়ের পক্ষে বেশি জোর দেয়। রিপাবলিকানদের একটি অংশ উৎপাদন বাড়ানো, শিল্প পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রের মাধ্যমে কৌশলগত বিনিয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
তবু রাজনৈতিক সমীকরণে একটি অভিন্ন জায়গা তৈরি হচ্ছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে কারা?
আমেরিকার রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন শুধু করের হার বা সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ নয়। বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কার হাতে—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রযুক্তি ও আর্থিক অভিজাতদের একটি ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের দ্বারা প্রভাবিত। এই শ্রেণির প্রতি অবিশ্বাসই দুই দলের পপুলিস্ট রাজনীতিকে একই দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য এই অবিশ্বাসকে আরও তীব্র করেছে। এপস্টেইনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এমন একটি ধারণাকে শক্তি দিয়েছে যে অতিধনীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় আলাদা নিয়ম কাজ করে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ ‘এপস্টেইন ক্লাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অতিধনীদের এমন একটি শাসক শ্রেণি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এ শব্দটি নিয়ে জনমত যাচাই করা হলে ৪৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এটিকে যথার্থ বলে মনে করেছেন, যেখানে ২৮ শতাংশ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কঠোর রিপাবলিকান ভোটারদের ছাড়া অন্য প্রায় সব ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ অভিজাতদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এখন আর কেবল বামপন্থী ভাষার বিষয় নয়।
প্রযুক্তি খাতও জনআস্থার সংকটে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি, তাদের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশাল ডেটা সেন্টারগুলোও এখন একই ধরনের সন্দেহের মুখে পড়েছে। প্রযুক্তি খাত একসময় ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন তার একটি অংশকে ঘিরে চাকরির নিরাপত্তা, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার প্রশ্ন উঠছে।
ব্যাংকিং খাত যেমন বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর জনআস্থার বড় ধাক্কা খেয়েছিল, প্রযুক্তি খাতও তেমন এক-এর মুখোমুখি হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপ। ট্রাম্প প্রশাসন মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কতটা সফল—এ প্রশ্নে জনমত অত্যন্ত নেতিবাচক। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অভিজাতদের প্রতি অবিশ্বাস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত পরিচয়ও সমস্যায় পড়তে পারে। ভোটারদের কাছে রিপাবলিকান রাজনীতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত যে পরিচয়গুলো উঠে আসে, তার মধ্যে রয়েছে কোটিপতি, স্থানীয় অভিজাত ক্লাবের সদস্য, করপোরেট প্রধান নির্বাহী এবং বিনিয়োগ ব্যাংকার। অর্থাৎ যে অর্থনৈতিক শ্রেণির সঙ্গে দলটির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, সেই পরিচয়ই এখন ভোটারদের একাংশের কাছে রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
বাম ও ডানের নতুন মিল
ডেমোক্র্যাটরাও নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পুনর্বিবেচনা করছে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সামাজিক উদারনীতির কিছু দিক দলটির জন্য কতটা রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করেছিল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওকাসিও-কর্টেজসহ কয়েকজন নেতা অতীতের কিছু ‘ওয়োক’ রাজনীতিকে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন।
এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরিচয়, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে কিছুটা সরে গেলে বাম ও ডানপন্থী পপুলিজমের মধ্যে অর্থনৈতিক মিল আরও দৃশ্যমান হয়।
ইউরোপেও এর উদাহরণ পাওয়া যায়। জার্মানির বিএসডব্লিউ বামঘেঁষা অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রশ্নে রক্ষণশীল অবস্থান মিলিয়েছে। হাঙ্গেরির ফিদেজ এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালির মতো জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী দলও অর্থনীতির ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি জনমুখী ও রাষ্ট্রবাদী অবস্থান নিয়েছে।
এটি বোঝায় যে পপুলিজমের পুরোনো বাম-ডান বিভাজন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
মূল প্রশ্নটি এখন অর্থনীতির ক্ষমতা
হিউই লংয়ের রাজনৈতিক চিন্তার একটি মৌলিক দিক ছিল—অতিরিক্ত সম্পদ যখন অল্প কয়েকজনের হাতে জমা হয়, তখন সাধারণ মানুষের অংশ কমে যায়। এই ধরনের ‘জিরো-সাম’ অর্থনৈতিক চিন্তা আধুনিক পপুলিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণাও এই ধারণার সঙ্গে পপুলিস্ট রাজনীতির সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে।

তবে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি অব্যাহত থাকে, তার সুফল যে শুধু প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা অতিধনীদের কাছে যাচ্ছে না—এটি জনগণকে বোঝাতে হবে। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবনে কেবল অনিশ্চয়তা তৈরি করছে না, বরং নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সুযোগও বাড়াচ্ছে—সেটিও প্রমাণ করতে হবে।
জেডি ভ্যান্সের হিউই লংকে স্মরণ তাই একটি প্রতীকী রাজনৈতিক মুহূর্তের চেয়ে বেশি কিছু। এটি দেখায়, আমেরিকার রাজনীতিতে অর্থনৈতিক পপুলিজম এখন দলীয় সীমানা অতিক্রম করছে।
বাম ও ডান হয়তো একই সমাধান প্রস্তাব করবে না। কিন্তু উভয় পক্ষই বুঝতে শুরু করেছে যে এমন এক অর্থনীতিকে রক্ষা করা কঠিন, যেখানে প্রবৃদ্ধি আছে অথচ সাধারণ মানুষ মনে করে তার ভাগ ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আমেরিকার আগামী দশকের রাজনৈতিক লড়াই হয়তো শুধু ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকান থাকবে না। আরও গভীর প্রশ্নটি হবে—দেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে, অভিজাতবিরোধী পপুলিজম আরও শক্তিশালী হওয়া ঠেকানো কঠিন হবে।
জেমস কানাগসোরিয়াম, ফোকালডাটার প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা
জেমস কানাগসোরিয়াম 



















