ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক জয়ের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইরানের সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। অন্যদিকে দেশটির অর্থনীতি চরম চাপে পড়লেও তেহরান মনে করছে, সময় শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কাজ করবে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন এবং তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি গুরুতর আহত হন। এরপরও ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভেঙে পড়েনি। বরং যুদ্ধের নতুন পর্যায়ে সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধই এখন প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
সামরিক হামলা থেকে অর্থনৈতিক যুদ্ধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের তেল বিক্রির আয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে এমন আর্থিক পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নৌ অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করছে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের নেতৃত্বকে নীতিবদল করানো কঠিন। কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তেহরানের রয়েছে।
অবরোধই হয়ে উঠতে পারে বড় চাপ
কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞার চেয়েও নৌ অবরোধ ইরানের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এখন ইরানের মূল সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করা নয়, বরং সেই চাপের বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসা।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও নিজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালিয়ে এসেছে। ফলে নতুন চাপ তাদের আচরণ দ্রুত বদলে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং চাপ যত বাড়বে, তেহরান তার প্রতিপক্ষের জন্য সংঘাতের মূল্য তত বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার পথে ফেরানোর চেষ্টা করতে পারে ইরান।
লোহিত সাগরের কৌশল অনুসরণের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান তার মিত্র হুথিদের অনুসৃত কৌশলের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে মাঝেমধ্যে হামলা, সীমিত সময়ের আলোচনা এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের নিচে থেকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি।
জাহাজ চলাচল, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের ব্যয় বাড়ানো হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, শক্তির ভারসাম্য তাদের পক্ষেই রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অর্থনীতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তেহরানের কাছে মার্কিন কৌশল পুরোনো
ইরানের কর্মকর্তারা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে ব্যর্থ একটি পুরোনো নীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করবে—এমনটা তারা মনে করেন না।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আরও বড় একটি সমস্যার কথা বলছেন। উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া এবং ইরানের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে অতীতে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই তারা নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ্যগুলো পরিত্যাগ করে না।
ইরানের নেতৃত্বের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেশের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি করা। সেই অসন্তোষ একসময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নেবে—এমন প্রত্যাশাই ওয়াশিংটনের কৌশলের অংশ বলে মনে করছে তেহরান।
অর্থনৈতিক দুর্ভোগে বাড়ছে অস্থিরতার আশঙ্কা
ইরানের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং সেই সংকট থেকে নতুন করে গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়া।
জুলাই মাসে দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দাম বেড়েছে ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১২৮ শতাংশ।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেছেন, দেশের সমস্যাগুলো কয়েক গুণ বেড়েছে, একই সঙ্গে আয়ও কমে গেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক দুর্ভোগকে কেন্দ্র করে ইরানে একাধিকবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এমন বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি রয়েছে।
এরপর চলতি মাসে অতীতে বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হোসেইন তাইবকে বাসিজ বাহিনীর নেতৃত্বে আনা হয়েছে। এটিকে নতুন করে গণঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সরকারের উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে দমননীতির দ্বৈত কৌশল
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য এখানেই। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির ক্ষতি বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা ইরানের শাসকদের নীতিবদলে বাধ্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইরানের নেতৃত্ব অতীতে দেশের ভেতরের বিক্ষোভের জবাব দিয়েছে কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে। আর বাইরের চাপের জবাবে তারা প্রায়ই পাল্টা হুমকি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
ফলে অর্থনৈতিক সংকট যত গভীর হবে, ততই ইরানের শাসকদের সামনে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কঠিন পরীক্ষা তৈরি হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন
এই অচলাবস্থার সবচেয়ে কঠিন হিসাব করতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। তারা আরেক দফা যুদ্ধ চায় না। অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমেই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পক্ষে তারা বেশি আগ্রহী।
কিন্তু একই সঙ্গে তারা ভয় পাচ্ছে, দীর্ঘ অচলাবস্থার সুযোগে ইরান যদি নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথ। সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরবভিত্তিক উপসাগরীয় গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের মনে করেন, ইরানের নেতৃত্বের স্থিতিস্থাপকতা এবং দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সক্ষমতার কারণে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দ্রুত তাদের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন।
তাঁর মতে, ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা পতন খুব দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা কম।
আলোচনাই এখন একমাত্র পথ?
ফলে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে আলোচনা সফল না হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক অচলাবস্থায় আটকে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষমতা ছেড়ে দিক। কিন্তু ওয়াশিংটন একই সঙ্গে তেহরানকে ওই জলপথ পরিচালনায় বড় কোনো ভূমিকা দিতে চায় না।
অন্যদিকে ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হোক, কিন্তু এমনভাবে নয় যাতে তাদের আত্মসমর্পণ করেছে বলে মনে হয়।
আর উপসাগরীয় দেশগুলোর লক্ষ্য হলো যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে রাখা—তবে এমন কোনো পরিস্থিতি তারা চায় না, যাতে ইরান শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ফলে ছয় মাসের যুদ্ধের পর এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বিজয়ের চেয়ে দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অচলাবস্থাই বেশি দৃশ্যমান। সামরিক সংঘাতের তীব্রতা কমলেও অর্থনৈতিক চাপ, পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগামী দিনগুলোতে সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
ইরানের অর্থনীতি যতই দুর্বল হোক, দেশটির শাসনব্যবস্থা যদি টিকে থাকে এবং হরমুজ প্রণালিকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও দ্রুত ও সহজ কোনো সমাধান বের করা কঠিন হবে।
ছয় মাসের যুদ্ধ তাই শেষের দিকে পৌঁছালেও শান্তির দরজা এখনও পুরোপুরি খোলেনি। বরং যুদ্ধের সামরিক অধ্যায়ের জায়গা নিয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, অবরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লড়াই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















