ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের জন্য গ্রীষ্মকালটা বেশ স্বস্তির মধ্য দিয়েই কেটেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি জনবান্ধব পদক্ষেপে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভালো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। কিন্তু আগামী সপ্তাহে পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে সেই স্বস্তির সময় শেষ হয়ে সামনে আসতে পারে কঠিন বাস্তবতা—প্রতিশ্রুত বড় বড় নীতি বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে।
৫৬ বছর বয়সী বার্নহাম জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি এমন একটি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোতে বড় ধরনের মোড় আনবে।
জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু সময়ও কম
বর্তমানে জনসমর্থনের দিক থেকে বার্নহাম তাঁর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে আছেন। জনতুষ্টিবাদী রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ এবং প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনকের তুলনায় তাঁর জনপ্রিয়তা বেশি।
তবে ব্রিটেনের এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বার্নহাম জানেন, এই জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত কমেও যেতে পারে। তাঁর নীতি যদি ভোটারদের বড় অংশের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে।
বার্নহাম এখন আগামী ১০ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা সামনে আনতে চান। এর মধ্যে বয়স্কদের সামাজিক সেবা ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাস্তায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমানোর মতো বড় প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থ কোথায়?
বার্নহামের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাঁর পরিকল্পনাগুলোর অর্থায়ন। সামাজিক সেবার মতো ব্যয়বহুল খাতে পরিবর্তন আনতে সরকারকে প্রতিবছর কয়েকশ কোটি পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, সরকার আর্থিক শৃঙ্খলার নিয়ম মেনে চলবে। এসব নিয়মের মধ্যে দশকের শেষ নাগাদ দৈনন্দিন সরকারি ব্যয়কে কর রাজস্বের সঙ্গে ভারসাম্যে আনার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
তবে সরকার একই সঙ্গে এসব নিয়মের মধ্যে থাকা কিছু সুযোগ কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এর অর্থ হতে পারে বিনিয়োগের জন্য আরও ঋণ নেওয়া এবং প্রয়োজনে কর বাড়ানো। অথচ লেবার পার্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে কর্মজীবী মানুষের ওপর করের বোঝা না বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
কল্যাণ ভাতা নিয়েও সামনে রয়েছে পর্যালোচনা। তরুণদের বেকারত্ব এবং প্রতিবন্ধী ভাতা—দুটি বিষয়েই পর্যালোচনা বাজেটের পর প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বার্নহাম অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, তিনি কোনো ধরনের হঠাৎ বা নির্বিচারে কাটছাঁটের পক্ষে নন।
প্রতিরক্ষায় ৪৭০ কোটি পাউন্ডের ঘাটতি
সরকারের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলোর একটি হলো প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ৪৭০ কোটি পাউন্ডের ঘাটতি পূরণ করা।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, বর্তমান পরিকল্পনা ন্যাটো ও ইউক্রেনকে আরও শক্তিশালীভাবে সহায়তা করার ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান রিচার্ড ড্যানাট মনে করেন, প্রতিরক্ষা খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা অর্থমন্ত্রী জন হিলি এই অর্থ জোগাড়ের পথ বের করতে পারবেন।
তেল-গ্যাস ও কারাগার নিয়েও চাপ
বার্নহাম সরকারকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কয়েকটি প্রকল্পের অনুমোদন নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসব প্রকল্পের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন রয়েছে। তবে প্রকল্পগুলো অনুমোদন করলে ব্রিটেনের কিছু ভোটারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় কমাতেও সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। গুরুতর কিছু অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
একই বিষয়ে বার্নহাম ইতিমধ্যে দুবার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। জনমতের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর ২০২০ সালে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আগাম মুক্তি ঠেকানোর উপায় খুঁজে বের করার দায়িত্ব তিনি বিচারমন্ত্রী অ্যালেক্স নরিসকে দিয়েছেন।
অবৈধ অভিবাসনও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
গ্রীষ্মজুড়ে ব্রিটেনে অবৈধ অভিবাসীদের আগমনও সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গত বছরের তুলনায় সংখ্যা কমলেও তা এখনও যথেষ্ট বেশি।
তাদের আবাসনের ব্যবস্থা কোথায় করা হবে, সেটিও বার্নহামের জনপ্রিয়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেছেন, অভিবাসীদের থাকার ব্যবস্থা ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং তুলনামূলকভাবে সচ্ছল এলাকাগুলোকেও এর অংশ নিতে হবে।
তবে সম্ভাব্য নতুন আবাসনকেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় এই পরিকল্পনা নিয়ে জনমত সামলানো সহজ হচ্ছে না।
গ্রীষ্মের তুলনামূলক স্বস্তির পর এখন বার্নহামের সামনে শুরু হচ্ছে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা। প্রতিশ্রুতি, জনসমর্থন এবং সীমিত সরকারি অর্থ—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী মাসগুলোতে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















