মধ্য নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ এবং কয়েকটি নদীতীরবর্তী জনপদের বড় অংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে চীন সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। একই সময়ে ৭ হাজার ২৪৫ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে বিশাল তুষারধসের ঘটনা ঘটে। ওই ধসের ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী লহেন্দে খোলা নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেখানে তৈরি হওয়া জলাধার ভেঙে গেলে কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেপালের দিকে নেমে আসে।
ভূমিকম্প নাকি তুষারধস—কারণ নিয়ে মতভেদ
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাপ্রবাহের কথা জানিয়েছেন। তবে ভূমিকম্পই উত্তর ঢালের ধসের কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। অন্য একটি সম্ভাবনা হলো, ধসটি এতটাই ব্যাপক ছিল যে সেটিই ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে।
লাংটাং লিরুংয়ের তুষার ও বরফ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আগেই অস্থিতিশীল হয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ষার শেষ পর্যায়ে ঢালে পানি জমে থাকা এবং হিমবাহ সরে যাওয়ার ফলে তৈরি মোরেইন এলাকায় পানির স্যাচুরেশন। আগে পারমাফ্রস্ট এসব ঢালকে তুলনামূলকভাবে শক্তভাবে ধরে রাখলেও উষ্ণায়নের কারণে সেই প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে।
হিমালয়ে বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি
নেপালের এই দুর্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয়ে চামোলি ও মেলামচি ২০২১, সিকিম ২০২৩, থামে ২০২৪ এবং ভোতে কোসি ২০২৫-এর মতো বড় বন্যা ও ধস হয়েছে। এর প্রায় সবগুলোই বর্ষাকালে ঘটেছে।
গত বছরের ৮ জুলাই ভোতে কোসির বন্যায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল নেপাল-চীনের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটন চেকপয়েন্ট। মহাসড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা পরে জানান, হিমবাহের ওপর তৈরি বড় জলাধারগুলো একত্রিত হয়ে ভেঙে পড়ার পর ওই বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল। গত বছর চীনা পক্ষ স্থানীয় নেপালি কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করেছিল বলে জানা গেলেও এবার কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুয়াকোটের ২৫ মেগাওয়াটের গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি পলিতে চাপা পড়েছে। নির্মাণাধীন আরও কয়েকটি প্রকল্পেও ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।
ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী নদীর ওপর অন্তত এক ডজন সেতু ভেসে গেছে। এর মধ্যে কিছু সেতু ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার downstream-এ ছিল। ফলে উত্তরের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পর্যটকদের নিয়েও উদ্বেগ
দুর্যোগটি নেপালের ট্রেকিং মৌসুমের শুরুতে এবং তিব্বতের পর্যটনের ব্যস্ত সময়ে আঘাত হেনেছে। ২৮ আগস্টের পূর্ণিমাকে ঘিরে গোসাইকুণ্ডে যাওয়ার পথে হাজারো তীর্থযাত্রী ছিলেন। ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের একটি অংশ রসুয়া-কেরুং সীমান্ত দিয়ে চীনের মানসসরোবরে যাচ্ছিলেন। একই সময়ে তিব্বতে সড়কপথে ভ্রমণরত পর্যটকরাও ওই অঞ্চলে ছিলেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, এলাকায় থাকা ৬৪৪ পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে এর অর্থ তারা দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছেন—এমন নয়; মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকার কারণেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তালিকায় ভারতের ১৭৮, নেপালের ১২৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫, ইউক্রেনের ৫৩, মালয়েশিয়ার ৫১, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫, যুক্তরাজ্যের ৩৩, কানাডার ২৫, সিঙ্গাপুরের ৯, রাশিয়া ও জার্মানির ৮ জন করে এবং লাটভিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার ৬ জন করে পর্যটক রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ হেলিকপ্টারে করে ত্রিশূলী এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে ত্রাণ সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। একই সঙ্গে এই দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ইস্যুকেও নতুন করে সামনে আনতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















