নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে—দেশটি যে নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে, সেগুলোর অনেক বড় ঝুঁকি তৈরি হয় দেশের সীমানার বাইরে। বিশেষ করে তিব্বত মালভূমি থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাহাড়ের ওপারে কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যেতে পারে, ভূমিধস নদীর গতিপথ আটকে দিতে পারে কিংবা বরফধস হঠাৎ নদীর প্রবাহে বিপুল পরিবর্তন আনতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পর সেই পরিবর্তন নেপালের জনপদে ভয়াবহ বন্যা হয়ে আঘাত করতে পারে।
সমস্যা হলো, নেপালের বন্যা প্রস্তুতির বড় অংশ এখনো দেশের ভেতরের নদী পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ভোতে কোসি, কর্ণালি কিংবা অরুণের মতো নদী নেপালে ঢোকার আগেই যদি বিপদের সূচনা হয়, তাহলে শুধু সীমান্তের এপারের তথ্য দিয়ে কার্যকর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিব্বত মালভূমির হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে নেপালের জন্য বন্যা এখন কেবল বর্ষার অতিবৃষ্টির ফল নয়; সীমান্তের ওপারে তৈরি হওয়া ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনও একইভাবে জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।
ভোতে কোসির অভিজ্ঞতা
ভোতে কোসি নদীর দুটি প্রধান প্রবাহই তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করে। একটি কোদারি হয়ে, অন্যটি রাসুয়া দিয়ে। গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে আসা এই নদীগুলোর তীরে রয়েছে বসতি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক এবং নেপাল-চীন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।
গত দুই বছরের ঘটনাই দেখিয়েছে, এই অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
২০২৫ সালের ৮ জুলাই রাসুয়ার ভোতে কোসিতে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়। রাসুয়াগাড়ির ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী সড়ক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, নেপালের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে ওই বিপদের পূর্বাভাস পাওয়ার মতো ভারী বৃষ্টির পরিস্থিতি ছিল না। পরবর্তী স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লেন্দে নদীর উজানে একটি সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদ হঠাৎ পানি হারিয়ে ফেলেছিল। অর্থাৎ নেপালে বন্যা শুরু হওয়ার অনেক আগেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছিল অন্য দেশে।
এই বছরের ঘটনাও একই দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। নেপালের জলবিদ্যুৎ ও আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপালি অংশে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির তথ্য ছিল না। বন্যার পানি বেত্রাবতী এলাকায় পৌঁছানোর পরই দেশটির বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বিষয়টি জানতে পারে।
এরপর অবশ্য দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। ত্রিশূলী উপত্যকার নিচু এলাকার মানুষের কাছে গণ এসএমএসও গেছে। কিন্তু বন্যার পানি যখন ইতিমধ্যে দেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, তখন পাঠানো সতর্কবার্তাকে প্রকৃত অর্থে আগাম সতর্কতা বলা কঠিন।
পূর্বাভাসের অর্থ শুধু বার্তা পাঠানো নয়
একটি কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো বিপদ ঘটার আগে মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেওয়া। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সংজ্ঞায় এ ব্যবস্থার মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস, দ্রুত যোগাযোগ এবং প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
অতএব, নদীর পানি সীমান্ত পার হওয়ার পর মানুষকে সতর্ক করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ আগাম সতর্কতা নয়। প্রকৃত ব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যাতে তিব্বতে কোনো হিমবাহ হ্রদের পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে, বড় ভূমিধস নদী আটকে দিলে কিংবা বরফধসের ঘটনা ঘটলে সেই তথ্য দ্রুত নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।
এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি। নেপালের কাছে চীনের অংশের বৃষ্টিপাত ও নদীর পানিপ্রবাহের নিয়মিত তথ্য পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে সীমান্তের ওপারে ঘটে যাওয়া একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন নেপালের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ধরা পড়ার আগেই নিচের দিকে এগিয়ে আসতে পারে।
ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য অবশ্য কম নেই
বিষয়টি এমন নয় যে নেপাল ঝুঁকির ব্যাপারে কিছুই জানে না। বরং গবেষণা ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সম্ভাব্য বিপদের চিত্র আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কার।
ICIMOD-এর ২০২৬ সালের হিমবাহ মূল্যায়ন বলছে, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের গতি বেড়েছে এবং ২০০০ সালের পর থেকে এই ক্ষয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকা ৩৮টি হিমবাহের মাত্র সাতটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে। অর্থাৎ পাহাড়ি বরফ ও হিমবাহ-ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পর্যাপ্তভাবে পর্যবেক্ষিত নয়।
ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী অববাহিকা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৫ সালের এক মূল্যায়নে পোইকু-ভোতে কোসি ও গ্যিরং-ত্রিশূলী সীমান্তবর্তী অববাহিকায় ২৮টি হিমবাহ-হ্রদকে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চরম পরিস্থিতিতে এসব বন্যা ৩ হাজারের বেশি ভবন, প্রায় ৫০টি সেতু, নয়টি জলবিদ্যুৎ স্থাপনা এবং প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়ককে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
আরেকটি ২০২৬ সালের গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিম তিব্বতের একটি হিমবাহ-হ্রদের আয়তন ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৯৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের মডেলিংয়ে দেখা গেছে, ভূমিধসের কারণে ওই হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হলে চীন ও নেপাল—দুই দেশের অবকাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি হচ্ছে। স্যাটেলাইট ছবি আছে, হিমবাহ-হ্রদের তালিকা আছে, জলপ্রবাহের মডেল আছে এবং কোন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তার হিসাবও করা হচ্ছে।
ঘাটতি হচ্ছে তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে
মূল প্রশ্ন তাই তথ্যের অভাব নয়; প্রশ্ন হলো, সেই তথ্য কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মানুষের নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত বছরের বন্যা এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা স্পষ্ট করেছিল। এবারের আরও প্রাণঘাতী ঘটনা সেটিকে আরও প্রকট করেছে।
১৩ আগস্ট চীনের নায়ালামের কাছে ভূমিধসের কারণে পূর্ব ভোতে কোসির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার পর নেপালের কর্তৃপক্ষ নিচের দিকের বাসিন্দাদের সতর্ক করে এবং নিরাপত্তা বাহিনী নদী পর্যবেক্ষণ শুরু করে। কিন্তু নদী আটকে যাওয়ার আগাম কোনো সতর্কতা নেপাল পায়নি।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ভূমিধস বা বরফধস নেমে এসে লেন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনায় নদীর পানির স্তর কমে যাওয়া নিজেই একটি বিপদের সংকেত হতে পারে। কারণ উজানে পানি আটকে গেলে পরে বাঁধ ভেঙে তা আরও বড় ঢেউ বা আকস্মিক বন্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এমন সংকেত কার্যকর হওয়ার জন্য সীমান্তের দুই পাশে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সীমান্ত এখানে কোনো অজুহাত হতে পারে না
আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময়কে কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দুর্যোগ প্রস্তুতির মৌলিক অংশ হওয়া উচিত।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনেও বহু-ঝুঁকি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং প্রভাবভিত্তিক করণীয় পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করা হয়েছে।
ভোতে কোসি, সুন কোসি ও ত্রিশূলী অববাহিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিয়ে ২০২৪ সালের এক গবেষণায়ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার কথা উঠে এসেছে। সেখানে উন্নত আগাম সতর্কতা, সীমান্ত সহযোগিতা, জনসচেতনতা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
স্যাটেলাইট ও আর্থ অবজারভেশন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে আকস্মিক ধস, পলি-বন্যা ও অস্বাভাবিক জলপ্রবাহ প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করাও এখন প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। সমস্যা হলো, এসব বিচ্ছিন্ন সক্ষমতাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিণত করা।
উদ্ধার নয়, প্রস্তুতিই হওয়া উচিত প্রথম প্রতিরক্ষা
দুর্যোগের পর নেপাল দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে—সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার প্রমাণ মিলেছে। নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ এবং নেপাল পুলিশ দ্রুত মোতায়েন হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার দিয়ে আহত ও আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নদীর পানি ত্রিশূলী ব্যবস্থায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে নিচের এলাকার মানুষকেও সতর্ক করা হয়েছে।
কিন্তু উদ্ধারকাজ সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল। হেলিকপ্টার আকাশে ওঠার সময়ের মধ্যে একটি সেতু হয়তো ভেসে গেছে, সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে কিংবা কোনো জনপদ সম্পূর্ণ আটকা পড়েছে।
প্রস্তুতির আসল পরীক্ষা তার আগের সময়টিতে।
ভোতে কোসির জন্য প্রয়োজন চীনের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়, সীমান্তের ওপারে হিমবাহ-হ্রদ ও অস্থিতিশীল ভূখণ্ড পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট তথ্যকে সরকারি ঝুঁকি মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করা এবং বিপদের সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের জন্য নির্দিষ্ট করণীয় নির্ধারণ করা।
পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা জরুরি। গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেত্রাবতী-রাসুয়াগাড়ি করিডর এবারও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সড়ক ও সেতু আবার ভেসে গেছে।
যে অবকাঠামো একবার ধ্বংস হয়েছে, নতুন ঝুঁকির তথ্য বিবেচনায় না নিয়ে সেটি একইভাবে পুনর্নির্মাণ করা মানে পুরোনো দুর্বলতাকেই নতুন করে তৈরি করা।
নেপাল সব বন্যা পূর্বাভাস দিতে পারবে না। হিমবাহ গলন থামাতে পারবে না। প্রতিটি ভূমিধসও প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিপদ তৈরি হওয়ার পর তার খবর পাওয়ার পরিবর্তে বিপদের সূত্রপাত শনাক্ত করে দ্রুত নিচের দিকে তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
গত বছরের ঘটনা দেখিয়েছে, তথ্য সীমান্ত অতিক্রম করতে দেরি করলে তার মূল্য দিতে হয়। ২৬ আগস্টের বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, নেপালের বাইরে শুরু হওয়া একটি ভূ-প্রাকৃতিক ঘটনা কত দ্রুত জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।
এখন নেপালের সামনে প্রশ্নটি আর এই নয় যে ভোতে কোসি বিপজ্জনক কি না। প্রশ্ন হলো, পরবর্তীবার উজানে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হলে নেপাল সেটি কতটা আগে জানতে পারবে।
কারণ নদী সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার পর দেওয়া সতর্কবার্তা মানুষকে বিপদের কথা জানায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত আগাম সতর্কতা হলো—বিপদ সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
সুশিম থাপালিয়া 



















