ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশের মাটিতে সেনাদের জন্য যুদ্ধের পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করছে পশ্চিমা সামরিক বাহিনী। পোল্যান্ডে নরওয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন লেজিও’-তে ইউক্রেনীয় সেনাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে প্রশিক্ষণের অন্যতম ভিত্তি করা হয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধের আদলে প্রশিক্ষণ
পোল্যান্ডের একটি বিশেষভাবে তৈরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে গভীর পরিখা, ট্যাংক চলাচলের এলাকা, গ্রাম ও শহরভিত্তিক যুদ্ধের অবস্থান এবং বিভিন্ন ধরনের গোলাগুলির অনুশীলন ক্ষেত্র। লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের সেনারা যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, যতটা সম্ভব তার কাছাকাছি পরিবেশ তৈরি করা।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা হলেও তারা সেটিকে যথেষ্ট বাস্তবসম্মত মনে করেননি। এরপর পুরো কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে ইউক্রেনের তৎকালীন সামরিক প্রয়োজন অনুযায়ী তা সাজানো হয়।
প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে হওয়ায় ইউক্রেনীয় অংশীদারদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগও রয়েছে।
ইউক্রেনীয় সেনারাই দিচ্ছে বাস্তব যুদ্ধের শিক্ষা
এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, ইউক্রেনীয় সেনা ও প্রশিক্ষকেরা সরাসরি এতে যুক্ত। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা সেনারা কোন কৌশল কার্যকর, কোনটি ব্যর্থ এবং কোন বিষয়গুলো পরিবর্তন করা দরকার—এসব অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণসূচিতে যুক্ত করছেন।
পোল্যান্ডের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির পরিখাগুলোও ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব পরিখা ও অনুশীলন ক্ষেত্রও নিয়মিত বদলে ফেলা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণে সৈন্যদের এমন সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তারা প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহার করবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রাতের দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র ও তাপ শনাক্তকারী দৃষ্টিযন্ত্র।
চালকবিহীন উড়োজাহাজ ও স্থলযন্ত্রের ব্যবহার
ইউক্রেনের যুদ্ধে চালকবিহীন উড়োজাহাজ এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এগুলো ছাড়া আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ সম্ভব নয়। তাই পোল্যান্ডের অনুশীলনেও ব্যাপকভাবে এসব যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে ইউক্রেনীয় সেনাদের এগুলো চালানো শেখানো পশ্চিমা প্রশিক্ষণের প্রধান লক্ষ্য নয়। কারণ দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ইউক্রেন ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেছে। বরং পশ্চিমা সেনারা ইউক্রেনীয়দের কাছ থেকেই এসব যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে শিখছে।
একইভাবে স্থলভিত্তিক চালকবিহীন যন্ত্রের ব্যবহারও প্রশিক্ষণের অংশ হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন এসব যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াচ্ছে এবং এ নিয়ে নিজেদের সামরিক কৌশলও তৈরি করছে। ফলে এই ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে ইউক্রেনীয় সেনারাই।
শত্রুপক্ষের ভূমিকায় পশ্চিমা সেনারা
প্রশিক্ষণে পশ্চিমা সেনারা কখনো কখনো শত্রুপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। তারা ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যা ইউক্রেনীয় সেনারা সম্মুখযুদ্ধে দেখতে পারে।
আঘাতের বাস্তবতা বোঝাতে ব্যবহার করা হচ্ছে আলোকভিত্তিক অনুকরণ ব্যবস্থা। কোথাও চালকবিহীন উড়োজাহাজ আঘাত হানলে মাটিতে ছোট বিস্ফোরক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিস্ফোরণের শব্দ ও অভিঘাতও তৈরি করা হচ্ছে।
তবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, কোনো অনুশীলনই প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়, বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানির ঝুঁকি পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করতে পারে না। লক্ষ্য হলো সেই বাস্তবতার যতটা সম্ভব কাছাকাছি যাওয়া।
পশ্চিমও শিখছে ইউক্রেনের কাছ থেকে
প্রশিক্ষণ শুধু ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য নয়, পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর জন্যও একটি শিক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের সেনারা এমন কিছু যুদ্ধকৌশল ও সরঞ্জাম ব্যবহারে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যার তুলনায় অনেক পশ্চিমা বাহিনীর অভিজ্ঞতা সীমিত।
নরওয়ের প্রশিক্ষকেরা তাই ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতাকে নিজেদের সামরিক ব্যবস্থাতেও কাজে লাগাচ্ছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেনীয় সেনাদের নিজেদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক কৌশল মিলিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষমতা ও টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানো। এর মাধ্যমে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেদের শর্তে আলোচনায় বসার সক্ষমতাও ধরে রাখতে পারবে বলে প্রশিক্ষকেরা মনে করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















