পাকিস্তানে মাতৃমৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের সময় বহু নারীর মৃত্যু এমন পরিস্থিতিতে ঘটছে, যা যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের মাতৃস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর বড় বোঝা পাকিস্তানের ওপর
২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২ লাখ ৬০ হাজার নারী গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের সময় মারা যান। এর মধ্যে পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ভারত ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র মিলেই প্রায় অর্ধেক মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। নাইজেরিয়ায় প্রায় ৭৫ হাজার, ভারত ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে প্রায় ১৯ হাজার করে এবং পাকিস্তানে প্রায় ১১ হাজার মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
পাকিস্তানের এই সংখ্যা বিশ্বের মোট মাতৃমৃত্যুর প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দক্ষ ধাত্রী বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সন্তান প্রসব, জরুরি প্রসূতি সেবা এবং সন্তান জন্মের পর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে বহু নারীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
অগ্রগতি হলেও বৈষম্য রয়ে গেছে
২০০০ সালের তুলনায় বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাসের পেছনে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ও প্রসূতি সেবার উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই অগ্রগতি সব দেশে সমানভাবে হয়নি।
দারিদ্র্যপীড়িত ও সংকটকবলিত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে মাতৃ ও শিশুসেবা সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মসূচি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র নারীদের জন্য এসব সেবা অনেক সময় জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করে।
মহামারি দেখিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বন্ধের ভয়াবহতা
করোনাভাইরাস মহামারি মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কত দ্রুত বাড়তে পারে, তার কঠিন উদাহরণ তৈরি করেছে। হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় অনেক নারী নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা, দক্ষ প্রসবসেবা ও জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ও প্রসূতি সেবাকে কোনোভাবেই গৌণ হিসেবে দেখা যায় না। বরং এমন পরিস্থিতিতে এই সেবা আরও শক্তিশালী রাখা প্রয়োজন।
পাকিস্তানে সংকটের পেছনে বহু কারণ
পাকিস্তানের মাতৃমৃত্যুর পেছনে দারিদ্র্য, গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, পরিবার পরিকল্পনা সেবার সীমিত সুযোগ এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি বড় ভূমিকা রাখছে।
অনেক নারীর জন্য এমন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোই কঠিন, যেখানে জরুরি প্রসূতি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাল্যবিবাহ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
অল্প বয়সে বিয়ে পাকিস্তানের মাতৃস্বাস্থ্যের আরেকটি বড় বাধা। সিন্ধু প্রদেশে ২০১৩ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন করা হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েরা অনেক সময় শারীরিকভাবে সন্তান জন্মদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এর ফলে গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতা এবং পরপর একাধিক সন্তান ধারণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের শিক্ষাজীবনও ব্যাহত হয়। স্কুল থেকে ঝরে পড়লে তারা প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ফলে নিজের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
মেয়েদের শিক্ষাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অন্যতম চাবিকাঠি
মাতৃমৃত্যু কমাতে পাকিস্তানের সবচেয়ে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগগুলোর একটি হতে পারে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করা।
শিক্ষিত মেয়েরা স্বাস্থ্য বিষয়ে বেশি সচেতন হয়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায় এবং বিয়ে ও সন্তান ধারণের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনাও তাদের বেশি থাকে।
তাই শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না। মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যজ্ঞান ও জীবনদক্ষতা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার পরিকল্পনায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে
নারীদের কখন এবং কতটি সন্তান হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবার পরিকল্পনা সেবা তাদের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।
অনাকাঙ্ক্ষিত ও খুব কাছাকাছি সময়ে একাধিক গর্ভধারণ মায়ের পাশাপাশি নবজাতকের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। পরিবার পরিকল্পনা সেবা বিস্তৃত হলে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অপুষ্টি ও অন্যান্য রোগও বড় ঝুঁকি
রক্তস্বল্পতা, ম্যালেরিয়া এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ গর্ভাবস্থাকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে শুধু প্রসবকালীন চিকিৎসা নয়, গর্ভধারণের আগ থেকেই পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি প্রয়োজন।
নারীর শারীরিক ঝুঁকি যত দ্রুত শনাক্ত করা যাবে, তত সহজে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। ছোট একটি স্বাস্থ্যসমস্যা গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয়
কোন এলাকায় মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি, কোন শ্রেণির নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং কোথায় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে—এসব জানতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে সরকারি অর্থ ও স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সহজ হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবে কতটা সফল হচ্ছে, তাও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার, পর্যাপ্ত সরকারি অর্থায়ন এবং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত ও কার্যকর, মাতৃমৃত্যুর হার তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। দরিদ্র নারীদের নিরাপদ গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি অর্থবহ হয় না।
এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন
পাকিস্তানকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রসূতি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষিত ধাত্রী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা সেবা সহজলভ্য করতে হবে এবং মাতৃ ও নবজাতকের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বাল্যবিবাহবিরোধী আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং মেয়েদের শিক্ষায় ধরে রাখতে হবে। তাদের এমন জ্ঞান ও সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা নিজের জীবন, বিয়ে ও সন্তান ধারণের বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ কেবল সন্তান জন্মের সময় একটি প্রাণ বাঁচানোর বিষয় নয়। একজন মায়ের মৃত্যু একটি পরিবারকে দুর্বল করে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে এবং সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।
তাই পাকিস্তানের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য এখন শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ, শিক্ষা, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যানকে আরেকটি উদ্বেগজনক সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পাকিস্তানের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জ্ঞান—দুটিই পৃথিবীতে রয়েছে। এখন দরকার সেই সেবা প্রতিটি নারীর নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া।
মাকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন রক্ষা করা নয়; একটি পরিবারকে রক্ষা করা, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা এবং দেশের আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করা।
Sarakhon Report 



















