০৭:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কায় বিশ্ব ভয়াবহ পরিবর্তনের মুখে, প্রস্তুতি নেই: বিল গেটস টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে আদিয়ালা কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে বোন নূরিন নিয়াজির সাক্ষাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কিশোরদের ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে কারফিউ ও দৈনিক সময়সীমা পাঞ্জাবে ক্যানসারের উন্নত চিকিৎসা আরও বিস্তৃত, বসছে পাঁচ নতুন ক্রায়োঅ্যাবলেশন যন্ত্র মানুষের উপস্থিতিতে বদলে যায় বন্যপ্রাণীর আচরণ, ৪,৫০০ প্রাণীর গবেষণায় নতুন তথ্য হানইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের চাকরির সেতুবন্ধন, ক্যারিয়ার মেলায় রেকর্ড অংশগ্রহণ অর্থনীতি ভালো দেখালেও কেন স্বস্তিতে নেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নেপালের ভোতে কোশি: বন্যা নয়, প্রস্তুতির ঘাটতিই বড় বিপদ জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন: স্বচ্ছতার দাবিতে মিসরের কূটনৈতিক চাপ নেপালে ভয়াবহ ভোতেকোশি বন্যা: বাড়ছে মরদেহ উদ্ধারের চাপ

ইসরায়েল-তুরস্ক দ্বন্দ্বে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলার পর তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন এক সংঘাতের মাত্রা পেয়েছে। হামলাটির পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নিন্দা জানায়। ইসরায়েলের দাবি ছিল, ওই ঘাঁটিতে তুরস্কের সামরিক বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্বভাবে তথ্য যাচাই করে এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি।

সিরিয়ায় ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনা

হামলার আগে ইসরায়েল তুরস্ককে সতর্ক করেনি। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্কবিষয়ক রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকও বলেছেন, ইসরায়েল হামলার ছয় দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিজস্ব যাচাইয়ে ওই তথ্যের ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আঙ্কারা হামলাটিকে উসকানি হিসেবে দেখলেও সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে উত্তেজনা কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। তুরস্ক বিষয়টিকে কেবল ইসরায়েল-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে না দেখে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের সঙ্গে ইসরায়েলের বিরোধ হিসেবে তুলে ধরেছে।

সাধারণত তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এবারের হামলার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাও কার্যকর ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে এমন একটি সমন্বয়ব্যবস্থার আহ্বান জানালেও, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আন্তরিকভাবে উত্তেজনা কমাতে না চাইলে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তুরস্কের চোখে বদলে গেছে ইসরায়েল

সিরিয়ার পরিস্থিতি তুরস্কের কাছে ইসরায়েলকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রতি আঙ্কারার অসন্তোষের কেন্দ্রে ছিল ফিলিস্তিন প্রশ্ন। মানবিক বিবেচনা, পরিচয় ও সংহতির মতো বিষয় সেখানে বড় ভূমিকা রাখত।

কিন্তু এখন তুরস্ক মনে করছে, সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরকে দুর্বল করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। ফলে ইসরায়েলকে আর শুধু ফিলিস্তিন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দেখছে না আঙ্কারা। বরং ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতিকে তুরস্ক ক্রমেই একটি জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে আফ্রিকার শৃঙ্গ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নানা বিষয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের নীতি, অগ্রাধিকার ও নিরাপত্তা-ভাবনায় পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।Is Turkiye Israel’s next target in the Middle East?

সিরিয়া নিয়ে দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবনা

সিরিয়া এই বৃহত্তর দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। তুরস্ক চায় তার দক্ষিণের প্রতিবেশী সিরিয়া একটি ঐক্যবদ্ধ, স্থিতিশীল ও সামরিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে উঠুক। বিপরীতে ইসরায়েল এমন একটি সিরিয়া চায়, যা দুর্বল, বিভক্ত এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতাহীন।

তবে সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান শুধু তুরস্কের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করছে না; এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্তর মতৈক্যের সঙ্গেও সংঘর্ষ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ একটি কেন্দ্রীভূত ও স্থিতিশীল দামেস্ক সরকারকে সমর্থন করছে।

অন্যদিকে একটি দুর্বল বা ব্যর্থ সিরিয়া দেখতে আগ্রহী আরেকটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের নামও সামনে আসে।

দুর্বল রাষ্ট্র কি ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাড়াবে?

কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল ও বিভক্ত রেখে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইসরায়েলি ধারণা দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিলে সেখানে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, চরমপন্থা ও অস্থিতিশীলতার বিস্তার ঘটার আশঙ্কা বাড়ে। সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তর ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো অঞ্চলই তার মূল্য দিতে পারে।

লেবাননের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হতে পারে। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং দুর্বল লেবানিজ রাষ্ট্রের পরিবেশ থেকেই হিজবুল্লাহর উত্থান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাই একটি দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্র সব সময় নিরাপদ প্রতিবেশী তৈরি করে না।

আব্রাহাম চুক্তির আঞ্চলিক স্বপ্ন কি ভেঙে পড়ছে?

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে একত্রিত করা সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী কোনো উদ্যোগ নয়। তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পরিবর্তন একই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করছে। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর কিংবা ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারত্বও একই ধরনের আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ ছিল।

আব্রাহামভিত্তিক এই আঞ্চলিক ধারণার মূল ভিত্তি ছিল আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা, যার নিরাপত্তা ছাতার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরানকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, তুরস্কের প্রভাব সীমিত রাখা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে তুলনামূলকভাবে আড়ালে রাখার প্রবণতাও এই কাঠামোর অংশ ছিল।

কিন্তু এই ব্যবস্থা মূলত ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। আর ইসরায়েলের আগ্রাসী ও পরিবর্তনবাদী নীতি এখন সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও কি অবস্থান বদলাচ্ছে?

ইসরায়েল মক্কা চুক্তির বিরোধিতা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। এর পেছনে আঞ্চলিক মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ানোর মার্কিন কৌশল এবং এই উদ্যোগের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা—দুই বিষয়ই কাজ করতে পারে।

এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। গত এক দশকে ওয়াশিংটন ইসরায়েল ও আরব-উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিপুল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু সেই ইসরায়েলকেন্দ্রিক কাঠামো এখন আর আগের মতো টেকসই নয়। বরং ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নীতিই এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতায় তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সামনে রেখে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ফলে আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি শুধু ইসরায়েলকে ঘিরে আবর্তিত হবে—এমন ধারণা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন আঞ্চলিক বিন্যাস তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রে একক কোনো শক্তি নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কায় বিশ্ব ভয়াবহ পরিবর্তনের মুখে, প্রস্তুতি নেই: বিল গেটস

ইসরায়েল-তুরস্ক দ্বন্দ্বে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

০৫:৫৪:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলার পর তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন এক সংঘাতের মাত্রা পেয়েছে। হামলাটির পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নিন্দা জানায়। ইসরায়েলের দাবি ছিল, ওই ঘাঁটিতে তুরস্কের সামরিক বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্বভাবে তথ্য যাচাই করে এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি।

সিরিয়ায় ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনা

হামলার আগে ইসরায়েল তুরস্ককে সতর্ক করেনি। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্কবিষয়ক রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকও বলেছেন, ইসরায়েল হামলার ছয় দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিজস্ব যাচাইয়ে ওই তথ্যের ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আঙ্কারা হামলাটিকে উসকানি হিসেবে দেখলেও সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে উত্তেজনা কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। তুরস্ক বিষয়টিকে কেবল ইসরায়েল-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে না দেখে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের সঙ্গে ইসরায়েলের বিরোধ হিসেবে তুলে ধরেছে।

সাধারণত তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এবারের হামলার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাও কার্যকর ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে এমন একটি সমন্বয়ব্যবস্থার আহ্বান জানালেও, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আন্তরিকভাবে উত্তেজনা কমাতে না চাইলে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তুরস্কের চোখে বদলে গেছে ইসরায়েল

সিরিয়ার পরিস্থিতি তুরস্কের কাছে ইসরায়েলকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রতি আঙ্কারার অসন্তোষের কেন্দ্রে ছিল ফিলিস্তিন প্রশ্ন। মানবিক বিবেচনা, পরিচয় ও সংহতির মতো বিষয় সেখানে বড় ভূমিকা রাখত।

কিন্তু এখন তুরস্ক মনে করছে, সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরকে দুর্বল করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। ফলে ইসরায়েলকে আর শুধু ফিলিস্তিন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দেখছে না আঙ্কারা। বরং ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতিকে তুরস্ক ক্রমেই একটি জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে আফ্রিকার শৃঙ্গ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নানা বিষয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের নীতি, অগ্রাধিকার ও নিরাপত্তা-ভাবনায় পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।Is Turkiye Israel’s next target in the Middle East?

সিরিয়া নিয়ে দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবনা

সিরিয়া এই বৃহত্তর দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। তুরস্ক চায় তার দক্ষিণের প্রতিবেশী সিরিয়া একটি ঐক্যবদ্ধ, স্থিতিশীল ও সামরিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে উঠুক। বিপরীতে ইসরায়েল এমন একটি সিরিয়া চায়, যা দুর্বল, বিভক্ত এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতাহীন।

তবে সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান শুধু তুরস্কের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করছে না; এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্তর মতৈক্যের সঙ্গেও সংঘর্ষ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ একটি কেন্দ্রীভূত ও স্থিতিশীল দামেস্ক সরকারকে সমর্থন করছে।

অন্যদিকে একটি দুর্বল বা ব্যর্থ সিরিয়া দেখতে আগ্রহী আরেকটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের নামও সামনে আসে।

দুর্বল রাষ্ট্র কি ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাড়াবে?

কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল ও বিভক্ত রেখে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইসরায়েলি ধারণা দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিলে সেখানে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, চরমপন্থা ও অস্থিতিশীলতার বিস্তার ঘটার আশঙ্কা বাড়ে। সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তর ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো অঞ্চলই তার মূল্য দিতে পারে।

লেবাননের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হতে পারে। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং দুর্বল লেবানিজ রাষ্ট্রের পরিবেশ থেকেই হিজবুল্লাহর উত্থান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাই একটি দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্র সব সময় নিরাপদ প্রতিবেশী তৈরি করে না।

আব্রাহাম চুক্তির আঞ্চলিক স্বপ্ন কি ভেঙে পড়ছে?

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে একত্রিত করা সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী কোনো উদ্যোগ নয়। তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পরিবর্তন একই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করছে। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর কিংবা ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারত্বও একই ধরনের আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ ছিল।

আব্রাহামভিত্তিক এই আঞ্চলিক ধারণার মূল ভিত্তি ছিল আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা, যার নিরাপত্তা ছাতার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরানকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, তুরস্কের প্রভাব সীমিত রাখা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে তুলনামূলকভাবে আড়ালে রাখার প্রবণতাও এই কাঠামোর অংশ ছিল।

কিন্তু এই ব্যবস্থা মূলত ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। আর ইসরায়েলের আগ্রাসী ও পরিবর্তনবাদী নীতি এখন সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও কি অবস্থান বদলাচ্ছে?

ইসরায়েল মক্কা চুক্তির বিরোধিতা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। এর পেছনে আঞ্চলিক মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ানোর মার্কিন কৌশল এবং এই উদ্যোগের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা—দুই বিষয়ই কাজ করতে পারে।

এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। গত এক দশকে ওয়াশিংটন ইসরায়েল ও আরব-উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিপুল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু সেই ইসরায়েলকেন্দ্রিক কাঠামো এখন আর আগের মতো টেকসই নয়। বরং ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নীতিই এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতায় তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সামনে রেখে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ফলে আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি শুধু ইসরায়েলকে ঘিরে আবর্তিত হবে—এমন ধারণা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন আঞ্চলিক বিন্যাস তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রে একক কোনো শক্তি নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।