নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভোতেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার তৃতীয় দিনেও পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়নি। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৯৭৭ জন, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়ার টিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা আঘাত হানে। ভোতেকোশি নদী দিয়ে নেমে আসা প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানুষের পাশাপাশি যানবাহন ও স্থাপনাও স্রোতে ভেসে যায়। পরে বন্যার পানি ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করায় বিপর্যয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু দূর পর্যন্ত।
দূরবর্তী জেলাতেও মিলছে মরদেহ
ভোতেকোশি ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার অংশ হওয়ায় বন্যার স্রোত মানুষ ও ধ্বংসাবশেষ বহুদূর নিয়ে গেছে। ফলে রাসুয়ার বাইরেও নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নওয়ালপরাসিতে মরদেহ ও মানবদেহের অবশেষ পাওয়া যাচ্ছে। এতে উদ্ধার অভিযান পরিণত হয়েছে বড় ধরনের অনুসন্ধান ও মরদেহ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে।
মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম
চিতওয়ানে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ১৮৬টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতপুরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
নওয়ালপরাসি ইস্টেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। জায়গা না থাকায় মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠাতে হয়েছে। পোখারায় তানাহুন, গোরখা, নওয়ালপরাসি ইস্ট ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে। কাসকি জেলার হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত মর্গ সক্ষমতা ৮৮টি হওয়ায় সেখানেও ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মরদেহগুলো ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হচ্ছে।
পরিচয় শনাক্তকরণে বড় চ্যালেঞ্জ
নিহতদের পরিচয় শনাক্তে পুলিশ মরদেহের ছবি তুলছে, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করছে, ময়নাতদন্ত করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা নিচ্ছে। সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুর নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে। শনাক্ত করা সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট নম্বর দিয়ে মরদেহের দাফনের তথ্য সংরক্ষণের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
নিখোঁজদের খুঁজছেন স্বজনরা
নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে চিতওয়ানসহ ভাটির জেলাগুলোতে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে অস্থায়ী মরদেহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের কাছে অপেক্ষা করছেন। একই সময়ে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বেসামরিক মানুষ, পর্যটক, ট্রেকার ও যাত্রীদেরও অনেকে এখনো নিখোঁজ তালিকায় আছেন।
বিদেশি পর্যটক উদ্ধার
বন্যাকবলিত রাসুয়া থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন মার্কিন ও ২ জন ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন। আরও তিনজনের জাতীয়তা তখনও নিশ্চিত হয়নি। উদ্ধার ও অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য কাজ করছেন; নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীও অভিযানে যুক্ত রয়েছে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা
চীনের দিকে ছোছেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় ব্যারিয়ার লেক তৈরি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার হ্রদটির আয়তন প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার বলে জানিয়েছিল এবং পরবর্তী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশের আশঙ্কা জানিয়েছিল। পরে হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও নেপাল সরকার বড় কোনো হ্রদ বা বাঁধ ধসের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
নেপাল সরকার ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নদীর কাছাকাছি বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রী ও সব মন্ত্রী এক মাসের বেতন ও পারিশ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারত অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
ভোতেকোশি বন্যার তৃতীয় দিনে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি মরদেহ শনাক্তকরণ, সংরক্ষণ ও স্বজনদের সহায়তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নদীর পানি বাড়ার সম্ভাবনা এবং চীনের দিকের ব্যারিয়ার লেক নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নেপালে ভোতেকোশি বন্যায় নিহত ৫৩৮, নিখোঁজ ৯৭৭ জন; বহু জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে উদ্ধার ও মরদেহ শনাক্তের অভিযান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















