যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বাইরে থেকে দেখলে বেশ শক্তিশালী বলেই মনে হতে পারে। কর্মসংস্থান আছে, মানুষ খরচ করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে বিনিয়োগ বাড়ছে, উৎপাদনও কিছু ক্ষেত্রে গতি পেয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে জমে আছে অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ। ফলে অর্থনীতির পরিসংখ্যান যতটা আশাব্যঞ্জক, সাধারণ মানুষের অনুভূতি ততটা স্বস্তির নয়।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু স্বস্তি ফেরেনি
মহামারির পর সরবরাহব্যবস্থার সংকট, হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা এবং সরকারি ব্যয়ের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৮০-এর দশকের পর সবচেয়ে দ্রুতগতির সুদহার বৃদ্ধির পথে হাঁটে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করে এবং পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও কিছুটা কঠোর নীতি শিথিল করে।
তবে সেই অগ্রগতি পরে মন্থর হয়ে যায়। ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক বৃদ্ধিতে পণ্যের দাম আবার বাড়ে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা কমলেও তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত গতিতে নামছে না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। কারণ মূল্যস্ফীতি যত দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ থাকে, পরিবারের ওপর তার সামগ্রিক চাপ তত বাড়ে। আর সুদহার দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম থাকায় বাড়ি কেনার ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণের খরচও উঁচু থেকে যাচ্ছে।
বেতন বাড়লেও পকেটের স্বস্তি কমছে
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে মজুরি বৃদ্ধির হার পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের প্রায় তিন বছর ধরে শ্রমিকদের গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু এখন সেই প্রবণতা বদলেছে। মজুরি আবারও দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না।
এর অর্থ খুব সহজ—বেতন হাতে এলেও আগের মতো একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিসংখ্যান ভালো থাকলেও পরিবারের বাজেটে চাপ থেকেই যাচ্ছে।
এই চাপের রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও মানুষের আস্থা কমছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
বেকারত্ব কম, কিন্তু চাকরির বাজারে অস্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার বর্তমানে ৪ দশমিক ১ শতাংশ—যা ঐতিহাসিকভাবে খুব বেশি নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এর চেয়ে বেশি বেকারত্বের হারই দেখা গেছে অধিকাংশ সময়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমবাজারকে শক্তিশালী বলেই মনে হতে পারে।
কিন্তু পুরো চিত্রটি এতটা সরল নয়।
অর্থনীতি প্রতি মাসে আগের তুলনায় কম কর্মসংস্থান তৈরি করছে। জুলাইয়ে বরং কর্মসংস্থান কমেও যায়। একই সময়ে অনেক মানুষ কাজের বাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন—এর একটি কারণ বয়স্ক প্রজন্মের অবসর নেওয়া, আরেকটি কারণ অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের ফলে বিদেশে জন্ম নেওয়া শ্রমশক্তির আকার কমে যাওয়া।
নিয়োগের গতিও বেশ দুর্বল। ছাঁটাইয়ের হার কম থাকলেও নতুন কর্মী নিয়োগের হার এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা সাধারণত মন্দার সময়ের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে উঠেছে।
এর পেছনে বাণিজ্যনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন কাজ করছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কতটা শ্রমশক্তির প্রয়োজন কমিয়ে দেবে?
ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে বেকারত্ব কম থাকলেও সাধারণ মানুষের চোখে চাকরির বাজার আগের মতো স্বস্তিদায়ক মনে হচ্ছে না।
মানুষ খরচ করছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে
অর্থনীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো—চাপের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলো এখনো যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বার্ষিক হিসাবে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে। শেয়ারবাজারের উত্থান থেকে লাভবান উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ও এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও মানুষের ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের অবনতি এখনো দেখা যায়নি। গত দুই বছরে ঋণখেলাপির হার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
তবু মানুষের মন ভালো নেই।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভোক্তা আস্থা কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয় অব মিশিগানের ভোক্তা-আস্থা সূচকও চলতি মাসে কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই হতাশা আরও গভীর হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সেই হতাশা মানুষের ব্যয়ে বড় ধাক্কা দেয়নি। কিন্তু এই প্রবণতা কতদিন থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রি নয় মাসের মধ্যে প্রথমবার কমেছে, যা বছরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের জোয়ার
অর্থনীতির আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ। সফটওয়্যার ও কম্পিউটার খাতে ব্যবসায়িক ব্যয় দ্রুত বেড়েছে, যা এই প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের শক্তিশালী হওয়ার একটি ইঙ্গিত।
উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম, শিল্পপণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা উৎপাদনকে চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। গত চার প্রান্তিকে গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে কর্মীদের আরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
এর একটি সম্ভাব্য সুফল হলো—একজন কর্মী বেশি উৎপাদন করতে পারলে প্রতিষ্ঠান মজুরি বাড়িয়েও পণ্যের দাম একই হারে বাড়াতে বাধ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
কিন্তু এখানেও ঝুঁকি রয়েছে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে এবং আগামী বছর অর্থনীতিতে এর অংশ আরও বড় হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে এই বিনিয়োগের জোয়ার উল্টো বড় ধাক্কায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু তার সুফল চোখে পড়ছে না
প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তার প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি ভোক্তা ব্যয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির একটি অংশকে পুষিয়ে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে উৎপাদনশীলতার সাম্প্রতিক উন্নতি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে কি না, সেটিও এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
আর সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও সরাসরি। তরুণদের বড় একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার চেয়ে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বেশি চিন্তিত। অনেক আমেরিকান মনে করেন, আগামী কয়েক দশকে এই প্রযুক্তির কারণে চাকরির সংখ্যা কমে যেতে পারে।
আসল গল্পটি তাই দ্বিমুখী
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বর্তমান চিত্রকে এক কথায় ভালো বা খারাপ—কোনোটিই বলা যাচ্ছে না।
একদিকে বেকারত্ব কম, ভোক্তা ব্যয় শক্তিশালী, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিনিয়োগের জোয়ার চলছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ওপরে, মজুরি আবার দামের কাছে পিছিয়ে পড়ছে, নিয়োগের গতি দুর্বল এবং ভোক্তা আস্থা নড়বড়ে।
সবচেয়ে বড় কথা, অর্থনীতির শক্তিশালী পরিসংখ্যান আর মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি ফাঁক। জাতীয় অর্থনীতির হিসাব হয়তো আশাবাদের কথা বলছে, কিন্তু বাজারে বেশি দাম, বাড়ির ঋণের উচ্চ খরচ, অনিশ্চিত চাকরির ভবিষ্যৎ এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির বদলে প্রশ্নই বাড়াচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















