ইতালির পুগলিয়া অঞ্চলের শহর তারান্তোর সঙ্গে ডলফিনের সম্পর্ক যেন ইতিহাস, পুরাণ আর সমুদ্রের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। প্রায় চার হাজার বছর আগে গ্রিক পুরাণের কাহিনিতে একটি ডলফিন সমুদ্রযাত্রায় বিপদে পড়া তারাসকে উদ্ধার করে তীরে পৌঁছে দিয়েছিল। সেই তারাসই পরে যে শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিই আজকের তারান্তো।
হাজার হাজার বছর পর সেই পুরাণের গল্প যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে। এবার তারান্তো শহর বন্দিদশায় থাকা ডলফিনদের জন্য সমুদ্রের বুকেই তৈরি করছে একটি নিরাপদ আশ্রয়। উদ্দেশ্য, দীর্ঘদিন কংক্রিটের জলাধারে বন্দি থাকা ডলফিনদের এমন একটি পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা অন্তত সমুদ্রের স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি ফিরতে পারে।
পুরাণ থেকে বাস্তবের গল্প
ডলফিন তারান্তোর পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শহরের প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য ও নানা প্রতীকে ডলফিনের উপস্থিতি দেখা যায়। শহরের প্রতীক এবং পেশাদার ফুটবল দলের প্রতীকেও ডলফিনের ছবি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ডলফিনের পিঠে বসে থাকতে দেখা যায় শহরের কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠাতা তারাসকে।
তবে পুরাণের স্মৃতির বাইরেও ডলফিন এখন তারান্তোর সমুদ্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আয়োনীয় সাগরের তারান্তো উপসাগরের উষ্ণ পানিতে হাজার হাজার ডলফিনের বিচরণ। বোতলনাক ডলফিন, স্পিনার ডলফিন ও ডোরাকাটা ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রজাতির ডলফিন এখানে দেখা যায়।
পুরোনো শহরের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে দূরের ঢেউয়ের দিকে তাকালেই অনেক সময় পানির ওপর ডলফিনের লাফিয়ে ওঠার দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রতি বছর বহু পর্যটক নৌভ্রমণে গিয়ে কাছ থেকে এসব সামুদ্রিক প্রাণী দেখার সুযোগ নেন।
এবার সেই বুনো ডলফিনদের পাশে যুক্ত হতে যাচ্ছে এমন কিছু ডলফিন, যারা হয়তো কখনোই মুক্ত সমুদ্রের স্বাদ পায়নি।
সমুদ্রের বুকেই তৈরি হচ্ছে আশ্রয়
তারান্তোর কাছে সান পাওলো দ্বীপের পাশে তৈরি হয়েছে ইউরোপের সাবেক বন্দি ডলফিনদের জন্য প্রথম সমুদ্রভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্র। এর নাম সান পাওলো ডলফিন রিফিউজ।
সমুদ্রের ওপর প্রায় সাত হেক্টর জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রটি। পানির ওপর নীল-সাদা রঙের ভাসমান কাঠামোগুলো নির্দিষ্টভাবে সাজানো হয়েছে। হলুদ ভাসমান চিহ্ন দিয়ে এর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুরো ব্যবস্থাটিকে শুধু একটি বড় জলাধার হিসেবে দেখা হচ্ছে না। পানির গুণমান, বাতাসের অবস্থা এবং পানির নিচের শব্দের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে নানা ধরনের যন্ত্র। পানির নিচে বসানো হয়েছে ক্যামেরাও।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ব্যবস্থাও পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করবে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সেটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা জীববিজ্ঞানীদের সতর্ক করবে।
ভাসমান একটি ভবনে থাকবে খাবার সংরক্ষণ ও প্রস্তুতের ব্যবস্থা। কর্মীরা সেখানে কাজ ও অবস্থান করতে পারবেন। প্রাণীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ একটি মঞ্চ, যেখানে পশুচিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারবেন।
কেন বন্দি ডলফিনদের নতুন আশ্রয় দরকার
এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে ইউরোপে ডলফিন ও তিমির প্রদর্শনী বন্ধ করার উদ্যোগের পর।
বিশেষ করে ফ্রান্সে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন আইনের ফলে ডলফিন ও তিমির মতো সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীকে প্রদর্শনীতে ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে। প্রাণী অধিকারকর্মী ও সংরক্ষণবাদীরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।
কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন থেকে গেছে—যেসব ডলফিন এতদিন ধরে জলজ উদ্যান ও অ্যাকুয়ারিয়ামে বন্দি ছিল, তাদের এরপর কোথায় রাখা হবে?
সাগরে ছেড়ে দেওয়া সহজ সমাধান নয়। দীর্ঘদিন কংক্রিটের জলাধারে থাকা প্রাণীকে হঠাৎ উন্মুক্ত সমুদ্রে ছেড়ে দিলে তারা নিজেদের খাবার সংগ্রহ, শিকারি এড়িয়ে চলা কিংবা প্রকৃতির কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার মতো স্বাভাবিক দক্ষতা হারিয়ে থাকতে পারে।
এই বাস্তবতাই তারান্তোর প্রকল্পের মূল ভাবনাকে সামনে এনেছে। ডলফিনদের পুরোপুরি বন্দি রাখাও নয়, আবার সরাসরি বুনো পরিবেশে ছেড়ে দেওয়াও নয়—বরং সমুদ্রের মধ্যেই একটি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
ছোট পরিসরে শুরু হবে পরীক্ষামূলক যাত্রা
প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী কারমেলো ফানিজ্জা। তার প্রতিষ্ঠিত জোনিয়ান ডলফিন কনজারভেশন সংগঠন প্রায় এক দশক ধরে এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
সম্প্রতি দলটি আশ্রয়কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত অনুমতিও পেয়েছে। তবে শুরুতেই সেখানে বিপুলসংখ্যক ডলফিন নেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
প্রথম পর্যায়ে মাত্র কয়েকটি ডলফিনকে রাখা হবে। সম্ভব হলে একটি ছোট পারিবারিক দলকে সেখানে এনে তাদের আচরণ, স্বাস্থ্য এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ফানিজ্জার মতে, এটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। কীভাবে সাবেক বন্দি ডলফিনদের এমন একটি পরিবেশে সবচেয়ে ভালোভাবে রাখা যায়, সেটিই প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা হবে।
সমুদ্রের তলদেশ, বালি, মাছ এবং প্রাকৃতিক শব্দের সঙ্গে প্রাণীগুলোর যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ কংক্রিটের পুলে থাকা ডলফিনদের এসব অভিজ্ঞতা প্রায় থাকে না।
গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষও
তারান্তোতে ডলফিন সংরক্ষণের কাজ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জোনিয়ান ডলফিন কনজারভেশন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সামুদ্রিক পরিবেশ ও ডলফিন রক্ষায় কাজ করছে।
সংগঠনটি পর্যটকদের নিয়ে সমুদ্রে নৌভ্রমণের আয়োজন করে। তবে এটি নিছক পর্যটনভ্রমণ নয়। অংশগ্রহণকারীরা ডলফিন দেখার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেও অংশ নেন।
তাদের ডাকা হয় ‘এক দিনের গবেষক’ হিসেবে। সমুদ্রে ডলফিনের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করা, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ করা এবং গবেষকদের তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করার সুযোগ পান তারা।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করেছে। বর্তমানে তাদের সক্রিয় সদস্যের সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি।
আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যটকদের প্রবেশ থাকবে না
সান পাওলো ডলফিন রিফিউজ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। তবে শহরের পুরোনো অংশে অবস্থিত কেতোস নামের সামুদ্রিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে মানুষ এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
একসময় বারির বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল যে ঐতিহাসিক ভবনটি, সেখানেই এখন তৈরি করা হচ্ছে আধুনিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। মজার বিষয় হলো, ফানিজ্জাও ওই ভবনেই সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান পড়াশোনা করেছিলেন।
প্রাচীন বন্দরমুখী এই ভবনে তৈরি হচ্ছে বড় একটি পর্যবেক্ষণকক্ষ। বিশাল পর্দা ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের মাধ্যমে গবেষক ও দর্শনার্থীরা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ডলফিনদের দেখতে এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে জানতে পারবেন।
এখানে রয়েছে গ্রন্থাগার ও গবেষণাগার। এমনকি রয়েছে বিশাল একটি হিমাগার, যেখানে ডলফিনদের জন্য প্রয়োজনীয় মাছ সংরক্ষণ করা হবে। কারণ দীর্ঘদিন বন্দি থাকা প্রাণীগুলোকে শুরুতেই নিজের খাবার শিকার করে সংগ্রহ করার ওপর নির্ভর করানো সম্ভব হবে না।
শিল্পনগরীর পরিচয় বদলাচ্ছে তারান্তো
তারান্তোর জন্য এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু প্রাণী সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। শহরটি বহু বছর ধরে ভারী শিল্পের জন্য পরিচিত ছিল। বিশেষ করে বিশাল ইস্পাত কারখানা ইলভা কয়েক দশক ধরে শহরের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্পকারখানার কার্যক্রম কমেছে এবং পরিবেশগত সুরক্ষার নিয়ম আরও কঠোর হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন, ক্রুজ জাহাজ এবং নগর পুনর্গঠনের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে তারান্তো নিজের নতুন পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তবে ডলফিন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির সময় শিল্পদূষণ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। আশ্রয়কেন্দ্রের চারপাশের সমুদ্র ডলফিনের জন্য নিরাপদ কি না, সেটি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালানো হয়েছে।
২০১৮ সালে শুরু হয় ওই এলাকার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ। এরপর প্রায় পাঁচ বছর ধরে সমুদ্র, সমুদ্রতল, বাতাস এবং বালুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
এখন আশ্রয়কেন্দ্রেও থাকবে চব্বিশ ঘণ্টা পরিবেশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। ফলে পানির মান বা পরিবেশে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটলে দ্রুত তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
একটি ডলফিনের স্বপ্ন দেখেন ফানিজ্জা
প্রায় এক দশকের পরিশ্রমের পর এখন প্রথম ডলফিনকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাগত জানানোর অপেক্ষা। কিন্তু প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেওয়া ফানিজ্জার কাছে এটি শুধু বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আবেগও।
তিনি প্রায়ই একটি বয়স্ক ডলফিনের স্বপ্ন দেখেন বলে জানান। তার কল্পনায় ডলফিনটি বছরের পর বছর কংক্রিটের একটি জলাধারে সাঁতার কাটছে।
একদিন সেই ডলফিনকে যদি সমুদ্রের এই আশ্রয়কেন্দ্রে আনা যায়, তাহলে সেটি প্রথমবারের মতো সমুদ্রের তলদেশ ছুঁতে পারবে, বালির স্পর্শ অনুভব করতে পারবে এবং ঢেউয়ের স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পারবে।
চার হাজার বছর আগে একটি ডলফিন কিংবদন্তির প্রতিষ্ঠাতা তারাসকে তীরে পৌঁছে দিয়েছিল। আজ তারান্তো সেই পুরোনো ঋণের এক প্রতীকী জবাব দিতে চাইছে—সমুদ্রের সন্তানদের আবার সমুদ্রের কাছাকাছি ফিরিয়ে দিয়ে।
প্রকল্পটি সফল হলে ইউরোপের অন্যান্য দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া সামুদ্রিক প্রাণী প্রদর্শনকেন্দ্রগুলোর জন্যও এটি একটি নতুন পথ দেখাতে পারে। বন্দি প্রাণীদের সরাসরি বনে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না হলেও তাদের জীবনে প্রকৃতির কিছুটা স্বাদ ফিরিয়ে দেওয়ার একটি মানবিক মডেল তৈরি হতে পারে তারান্তোতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















