মানুষের সরাসরি উপস্থিতি বন্যপ্রাণীর চলাফেরা ও আবাসস্থল ব্যবহারে বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি প্রাণীর ওপর চালানো নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি মানুষের উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূমি পরিবর্তনের প্রভাবকে আলাদাভাবে বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
গবেষণায় প্রাণীর জিপিএস ও মানুষের চলাচলের তথ্য
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা বারবারা (ইউসিএসবি), স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু অ্যান্ড কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ প্রজাতির প্রাণীর জিপিএস তথ্যের সঙ্গে বেনামি মোবাইল ফোন লোকেশন ডেটা মিলিয়ে দেখেন।
গবেষকেরা ২০১৯ ও ২০২০ সালের তুলনীয় সময়ের প্রতি সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে ৪ হাজার ৫৮১টি স্তন্যপায়ী ও পাখির পৃথক জিপিএস রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানুষের চলাচল বোঝার জন্য ব্যবহার করা হয় আশপাশের এলাকার পর্যায়ের বেনামি মোবাইল ফোন লোকেশন তথ্য।
গবেষকদের মতে, মানুষের শারীরিক উপস্থিতি বন্যপ্রাণীর চলাচলে কী ধরনের সরাসরি প্রভাব ফেলে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য ব্যবহারের ঘটনা এটাই প্রথম।
করোনাকালীন লকডাউন হয়ে ওঠে গবেষণার সুযোগ
গবেষণায় কোভিড-১৯ মহামারির লকডাউনকে বিশেষ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো হয়। বিধিনিষেধের কারণে মানুষের চলাচল হঠাৎ কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আচরণে মানুষের উপস্থিতির প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
গবেষণাটি ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা দেখতে পান, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫৭ শতাংশ প্রজাতি মানুষের উপস্থিতি এবং ভূদৃশ্যের পরিবর্তন—দুই ধরনের প্রভাবেই সাড়া দিয়েছে।
মানুষের উপস্থিতিতে বদলেছে প্রাণীর আবাসস্থল ব্যবহার
মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে ৬৭ শতাংশ স্তন্যপায়ী এবং ৬৮ শতাংশ পাখি প্রজাতির ব্যবহৃত এলাকা বা পরিবেশগত আবাসস্থলে পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মানুষের উপস্থিতি ও ভূদৃশ্যের পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করলে প্রায় ৬৭ শতাংশ স্তন্যপায়ী এবং ৪১ শতাংশ পাখি তাদের ব্যবহৃত আবাসস্থলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
তবে সব প্রাণীর প্রতিক্রিয়া এক ছিল না। তুলনামূলকভাবে কম উন্নত এলাকায়, যেমন জাতীয় উদ্যানগুলোতে, প্রাণীরা মানুষের উপস্থিতির প্রতি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল ছিল।
নেকড়ে, হরিণ ও সারসের আচরণে ভিন্নতা
নেকড়েরা মানুষের উপস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় তাদের ব্যবহৃত আবাসস্থল বাড়িয়েছে। গবেষকদের ধারণা, মানুষকে এড়িয়ে চলতে তারা দূরে সরে গিয়ে বা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, হোয়াইট-টেইলড হরিণের ক্ষেত্রে ভূদৃশ্য যত বেশি উন্নত হয়েছে, তাদের পরিবেশগত আবাসস্থল তত বেড়েছে। কিন্তু মানুষের উপস্থিতি বাড়লে সেই পরিসর ছোট হয়েছে। স্যান্ডহিল ক্রেনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিপরীত প্রবণতা।
গবেষকেরা বলছেন, প্রাণীর প্রজাতিভেদে আচরণ, আবাসস্থলের প্রয়োজন এবং হুমকি ভিন্ন হওয়ায় সংরক্ষণ নীতিতেও প্রজাতিভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এই গবেষণা কোভিড-১৯ বায়ো-লগিং ইনিশিয়েটিভের অংশ। আন্তর্জাতিক এই উদ্যোগে প্রায় ৬০০ গবেষক ও অংশীদার যুক্ত ছিলেন এবং প্রায় ১৩ হাজার প্রাণীর কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি লোকেশন রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়।
গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, মানুষের কার্যক্রম ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাণীর আচরণে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা তাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করছে নাকি বাড়তি চাপ তৈরি করে মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কোথায় এবং কখন প্রাণীদের বেশি জায়গা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে এ গবেষণার ফল ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















