বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন বা এনএসএ বাহরাইনে হামলার পর যে চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে, তা শুধু একটি সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির গল্প নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র শুরুর দিনগুলোতে ইরানের হামলায় ঘাঁটিটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রথম দিকে প্রকাশ্যে আসেনি। এখন যত তথ্য সামনে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক অবকাঠামো কয়েক দিনের মধ্যেই কার্যত অচল হয়ে পড়ার ঘটনা উপেক্ষা করার মতো নয়।
এনএসএ বাহরাইন শুধু একটি প্রশাসনিক সদর দপ্তর নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে রয়েছে নেভাল ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং আরও বহু সামরিক ও সহায়ক কমান্ড। উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর আশপাশে মার্কিন জাহাজ, বিমান, জনবল কিংবা সামরিক সরঞ্জাম যখন চলাচল করে, তখন কোনো না কোনোভাবে এই ঘাঁটির সহায়তা তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই বাস্তবতাই বাহরাইনের ক্ষয়ক্ষতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
একটি ঘাঁটির চেয়েও বড় ক্ষতি
এনএসএ বাহরাইনের অবকাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছিল, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর রাখা যায়। জাহাজের রসদ সরবরাহ, কর্মীদের সহায়তা, যোগাযোগ, পরিবহন এবং বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক কার্যক্রমের জন্য এটি ছিল একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
হামলায় পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, ব্যারাক, একাধিক গুদাম, যোগাযোগ টাওয়ার এবং বিশুদ্ধ পানির একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে। বেশ কিছু জাহাজ, যার মধ্যে মার্কিন কোস্ট গার্ডের কয়েকটি জাহাজও রয়েছে, অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের ব্যবহৃত সুবিধাও স্থানান্তর করতে হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘাঁটিতে কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আহতের ঘটনা ঘটেনি বলে মার্কিন সামরিক সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু প্রাণহানি না হওয়া মানেই যে ক্ষতির মাত্রা কম, তা নয়। একটি সামরিক ঘাঁটির কার্যক্ষমতা হারানো কখনো কখনো প্রাণহানির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে পারে।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, খাদ্য, ডাক ও অন্যান্য সরবরাহের ঘাটতির খবরে। একসময় যে সরবরাহব্যবস্থা কয়েক শ মাইলের মধ্যে ছিল, সেটিই এখন অনেক বেশি দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পরিচালনা করতে হচ্ছে। সামরিক অভিযানে এই পরিবর্তন শুধু সময় ও ব্যয় বাড়ায় না; এটি সামনের সারিতে মোতায়েন জাহাজ ও সেনাদের কার্যক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
একটি পূর্বানুমেয় হামলা ঠেকানো গেল না কেন
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হলো, এনএসএ বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ইরানের সম্ভাব্য হামলা কি সত্যিই অপ্রত্যাশিত ছিল?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং প্রতিশোধমূলক হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিলে এমন আক্রমণের ঝুঁকি অনুমান করা কঠিন ছিল না। তাহলে কেন ঘাঁটিতে থাকা পরিবার ও নির্ভরশীলদের আগেই সরিয়ে নেওয়া হলো না? কেন স্থাপনাটিকে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দিয়ে সুরক্ষিত করা হলো না?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অত্যাধুনিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবসতি রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে সক্ষম মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলোও সমুদ্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারত।
তা হলে বাহরাইনে এমন প্রস্তুতি কতটা নেওয়া হয়েছিল, আর কেন তা যথেষ্ট ছিল না—এই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর প্রয়োজন।
কারণ এখানে শুধু একটি ঘাঁটির নিরাপত্তার বিষয় নেই। প্রশ্নটি হলো, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক শক্তি কোনো প্রতিপক্ষের নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে কতটা স্থিতিশীল এবং টেকসই।
‘ফুটপ্রিন্ট কমানো’ কি সমাধান?
এখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমানোর কথা শোনা যাচ্ছে। বাহরাইনের মতো স্থাপনা হারানোর পর এই নীতিকে কেউ কেউ কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখতেই পারেন। কিন্তু বাস্তবে যদি এর অর্থ হয় সরবরাহ, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া, তাহলে এর ফল উল্টো হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ও সেনাদের কার্যক্রম নির্ভর করে একটি বিস্তৃত সহায়ক অবকাঠামোর ওপর। সেই অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দুর্বল হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থাগুলোকে আরও বেশি দূরত্ব, সময় ও সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সামরিক উপস্থিতি কমানোর পরিবর্তে বিদ্যমান বাহিনীই আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র একা কাজ করে না। আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও পঞ্চম নৌবহরের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। এনএসএ বাহরাইন যদি আগের সক্ষমতায় ফিরতে না পারে, তাহলে সেই সহযোগিতার কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ছয় মাস পরও অনিশ্চয়তা কেন
নেভাল ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড, পঞ্চম নৌবহর এবং কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল কার্ট রেনশর বক্তব্যে পরিস্থিতির জটিলতা স্পষ্ট হয়েছে। বাহরাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে এক টাউন হলে তিনি বলেছেন, শুরুতে পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু পরিষ্কার নিয়ম ছিল, কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যার জন্য প্রস্তুত কোনো পূর্বনির্ধারিত কাঠামো নেই।
এই মন্তব্যের গুরুত্ব কম নয়। কারণ হামলার ছয় মাস পরও যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ সদর দপ্তরের কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ অবস্থা এবং সেখানে কর্মরত সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সেটি কেবল পুনর্গঠনের সমস্যা নয়; এটি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির প্রশ্নও।
অনেক পরিবার এখনও অস্থায়ী অবস্থায় রয়েছে। অনেকে তাদের পোষা প্রাণী ও ব্যক্তিগত সামগ্রী থেকে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘ সময় ধরে এমন অনিশ্চয়তা সামরিক বাহিনীর মনোবল ও কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
পঞ্চম নৌবহর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সেই কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মূল প্রশ্ন এখন শুধু ঘাঁটিটি কখন পুনর্নির্মাণ হবে তা নয়। প্রশ্ন হলো, হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের আঘাত কীভাবে প্রতিহত করা হবে।
বাহরাইনকে পুনর্গঠন করতেই হবে
এনএসএ বাহরাইনকে যদি হামলার আগের অবস্থার কাছাকাছি সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর পরিচালন পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। জাহাজের রসদ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের সহায়তা এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়বে।
তাই বাহরাইনের ঘটনাকে কেবল অতীতের একটি হামলা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য একটি বাস্তব পরীক্ষা। শত্রু যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্রের ওপর আঘাত হেনে সেটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অকার্যকর করে দিতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য ফরোয়ার্ড ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা, বিকল্প সরবরাহপথ এবং দ্রুত পুনর্গঠনের সক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।
একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর পরিচয় শুধু তার আক্রমণক্ষমতায় নয়; আঘাতের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যেও। এনএসএ বাহরাইনের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতারই পরীক্ষা চলছে।
আমার আশা, ঘাঁটিটি শুধু পুনর্নির্মাণ করা হবে না, বরং আগের তুলনায় আরও নিরাপদ ও কার্যকর কাঠামোতে ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ বাহরাইনকে হারানোর অর্থ শুধু একটি ভবন বা ঘাঁটি হারানো নয়। এর অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। আর সেটি যদি স্থায়ী হয়, তাহলে এর কৌশলগত মূল্য দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকেই।
লেখক: ক্যাপ্টেন জন কর্ডল (অব.) ৩০ বছরের সামরিক জীবনে ইউএসএস অস্কার অস্টিন ডেস্ট্রয়ার এবং ইউএসএস সান জাসিন্টো ক্রুজারের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেভি লিগের জন পল জোন্স অ্যাওয়ার্ড ফর ইনস্পিরেশনাল লিডারশিপ পুরস্কারপ্রাপ্ত।
ক্যাপ্টেন জন কর্ডল (অব.) 


















