১১:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
নেপালে বন্যায় শনাক্তহীন মরদেহ দাফন, ডিএনএ মিললে পরে তোলা হবে ডুমডুমায় ব্যবসায়ীদের কাছে উলফা-আইয়ের চাঁদাবাজির চিঠি, জাল বলে দাবি সংগঠনের নেপালে ভয়াবহ বন্যার নেপথ্যে পাহাড়ধস, ড্রোনে ধরা পড়ল ধ্বংসযজ্ঞের শুরু ভাঙ্গায় বাস-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৩ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতর্কিত ডানপন্থী মিলো ইয়ান্নোপোলোসকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠাল আইস ব্রুকলিনের সেই পরাজয়, যেদিন আমেরিকান বিপ্লব প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভার্চুয়াল চাকরি মেলায় নতুন দিগন্ত, এক প্ল্যাটফর্মেই নিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তি হিলি স্থলবন্দর বন্ধ:  নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা চাপ পড়বে? হিলি স্থলবন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের রংপুরে চার খুন: প্রধান আসামি সিদ্ধার্থের বাবা-ভাই ডিবি হেফাজতে

গুম প্রতিরোধে বাংলাদেশে কী পরিবর্তন এসেছে?

  • সজল দাস
  • ১০:৪৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • 10

গুমের ঘটনা তদন্তে পৃথক কমিশন গঠনের কথাও বলছেন অনেকে

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা ভিন্নমতের অনেককে গুমের অভিযোগ বারবার উঠেছে। এমনকি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও একসময় গুমের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

সরকার পতনের পর এমন পরিস্থিতি বদলের দাবি ওঠে। ২০২৫ সালে গুমের ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নেওয়া হয় গুম প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগও।

গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর এই অধ্যাদেশটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় তা কার্যকারিতা হারায়।

যদিও বিষয়টি আরও যাচাই–বাছাই করে গুম ইস্যুতে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার।

গত ২৭শে অগাস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ আকারে যা উত্থাপন করেছেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও উত্থাপিত বিলটির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছিল।

বিশেষ করে, গুমসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব, পৃথক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে রাখার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকে।

ফলে গুম প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আইন কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, এই প্রশ্নও উঠছে।

এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে- গুম কমিশন গঠন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি, অধ্যাদেশ ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াসহ যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার ফলে কী পরিবর্তন এসেছে, এই আলোচনাও হচ্ছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মিরাজ শেখ নামে একজন ব্যক্তির গুম হওয়ার অভিযোগ, এই বিতর্কে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

যেটি শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে গুমের প্রথম ঘটনা বলেই ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

বিষয়টি সামনে আসার পর- বাংলাদেশে গুমের ঘটনা বা এই ধরণের তৎপরতা আবারও শুরু হয়েছে কি না– এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

নিখোঁজ মিরাজ শেখ

নিখোঁজ মিরাজ শেখ

উত্থাপিত বিলে যা আছে

বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধের আইনটিকে, শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যা সংসদে পাশ হলেই আইনে পরিণত হবে।

অনেকেই মনে করছেন, সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়, এটি আইন আকারে পাশ করতে তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না সরকারকে।

বলা হচ্ছে, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই সংক্রান্ত বিলে গুমকে অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বের করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও অধিকারের বিষয়গুলোও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এ গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেফতার-আটক-অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার করা বা গোপন রাখা।

এক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে এই বিলে। বলা হয়েছে, গুমের অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।

তবে, ভুক্তভোগী মারা গেলে বা পাঁচ বছর পরও না পাওয়া গেলে- সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া পরিকল্পিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করার বিষয়টিও রয়েছে।

উত্থাপিত বিলে ভুক্তভোগী ও পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার ও ডিজিটাল সাক্ষ্য নেওয়ার প্রক্রিয়া, সাক্ষী বা তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়েও বলা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশে গুম কমিশন গঠন করা হয়েছিল

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশে গুম কমিশন গঠন করা হয়েছিল

কতটা কার্যকর হবে

অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, উত্থাপিত বিলে সেখানে পরিবর্তন আনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সংস্থার হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়ায় এই আইন বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না।

তারা মনে করেন, অভিযোগ যদি কোনো শৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দেবে।

এটি শুনতে ভালো মনে হলেও বাস্তবে “এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী” তদন্ত করলে সেটি কতটা স্বাধীন হবে, ভুক্তভোগী পরিবার কি ভরসা পাবে– এই প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর সভাপতি ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলছেন, আইনের মধ্যে ফাঁকফোকর থাকলে সেই আইন কখনই কার্যকর হয় না।

“আইনটা এমনভাবে করা দরকার ছিল যাতে তদন্তটা অন্য কেউ, অর্থাৎ পৃথক কোনো কমিশন হোক বা সিভিল প্রশাসন হোক- অন্য কেউ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনী, সেটা করলে খুব একটা ভিন্ন ফলাফল আসবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের জন্য দরকার একটি “পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা”।

যার নিজস্ব জনবল, বাজেট ও গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকবে। তা না হলে তদন্তে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

দুটি হাত মুষ্টিবদ্ধ কারাগারের শিক ধরে আছে

ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আইনে থাকা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা

গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থেকে গেলে, এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বা এমএসএফ এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানের।

তিনি বলছেন, “গুমের মতো ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে স্পেশাল কমিশন বা ইস্যুভিত্তিক বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন করা বাঞ্ছনীয়।”

যদিও এই আইনের মধ্য দিয়ে, গুমের বিষয়ে অভিযোগ করার আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, যা ইতিবাচক বলেই মত এই মানবাধিকারকর্মীর।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ তদন্তের বিষয়টি ছাড়াও বেশ কিছু ত্রুটি দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।

তিনি বলছেন, এই আইনে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির অধিকার এবং তার প্রয়োজনের বিষয়গুলো আমলে নেওয়া হয়নি। এছাড়া, গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতিপূরণ কী হবে সে বিষয়েও কিছু উল্লেখ নেই।

“একটি ঘটনায় আসামির সম্পৃক্ততা আছে কি না সেই বিষয়টি ডিফেন্ড করার অনেক সুযোগ আইনের মধ্যেই রেখে দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ থেকে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. ফারুক বলছেন, বাংলাদেশের আদালতে সাধারণ ফৌজদারি মামলাই বছরের পর বছর চলে। গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা – সব মিলিয়ে ১২০ দিনে শেষ করা বাস্তবে কঠিন। সময়সীমা না মানলে কী শাস্তি, তাও স্পষ্ট নয়।

এছাড়া সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়টি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তাদেরকে সুরক্ষা দেবে কে? এই প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, অতীতে গুমের শিকার বা তাদের পরিবারকে হুমকির মুখে পড়তে দেখা গেছে।

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালে বন্যায় শনাক্তহীন মরদেহ দাফন, ডিএনএ মিললে পরে তোলা হবে

গুম প্রতিরোধে বাংলাদেশে কী পরিবর্তন এসেছে?

১০:৪৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা ভিন্নমতের অনেককে গুমের অভিযোগ বারবার উঠেছে। এমনকি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও একসময় গুমের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

সরকার পতনের পর এমন পরিস্থিতি বদলের দাবি ওঠে। ২০২৫ সালে গুমের ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নেওয়া হয় গুম প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগও।

গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর এই অধ্যাদেশটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় তা কার্যকারিতা হারায়।

যদিও বিষয়টি আরও যাচাই–বাছাই করে গুম ইস্যুতে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার।

গত ২৭শে অগাস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ আকারে যা উত্থাপন করেছেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও উত্থাপিত বিলটির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছিল।

বিশেষ করে, গুমসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব, পৃথক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে রাখার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকে।

ফলে গুম প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আইন কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, এই প্রশ্নও উঠছে।

এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে- গুম কমিশন গঠন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি, অধ্যাদেশ ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াসহ যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার ফলে কী পরিবর্তন এসেছে, এই আলোচনাও হচ্ছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মিরাজ শেখ নামে একজন ব্যক্তির গুম হওয়ার অভিযোগ, এই বিতর্কে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

যেটি শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে গুমের প্রথম ঘটনা বলেই ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

বিষয়টি সামনে আসার পর- বাংলাদেশে গুমের ঘটনা বা এই ধরণের তৎপরতা আবারও শুরু হয়েছে কি না– এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

নিখোঁজ মিরাজ শেখ

নিখোঁজ মিরাজ শেখ

উত্থাপিত বিলে যা আছে

বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধের আইনটিকে, শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যা সংসদে পাশ হলেই আইনে পরিণত হবে।

অনেকেই মনে করছেন, সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়, এটি আইন আকারে পাশ করতে তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না সরকারকে।

বলা হচ্ছে, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই সংক্রান্ত বিলে গুমকে অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বের করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও অধিকারের বিষয়গুলোও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এ গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেফতার-আটক-অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার করা বা গোপন রাখা।

এক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে এই বিলে। বলা হয়েছে, গুমের অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।

তবে, ভুক্তভোগী মারা গেলে বা পাঁচ বছর পরও না পাওয়া গেলে- সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া পরিকল্পিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করার বিষয়টিও রয়েছে।

উত্থাপিত বিলে ভুক্তভোগী ও পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার ও ডিজিটাল সাক্ষ্য নেওয়ার প্রক্রিয়া, সাক্ষী বা তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়েও বলা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশে গুম কমিশন গঠন করা হয়েছিল

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশে গুম কমিশন গঠন করা হয়েছিল

কতটা কার্যকর হবে

অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, উত্থাপিত বিলে সেখানে পরিবর্তন আনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সংস্থার হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়ায় এই আইন বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না।

তারা মনে করেন, অভিযোগ যদি কোনো শৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দেবে।

এটি শুনতে ভালো মনে হলেও বাস্তবে “এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী” তদন্ত করলে সেটি কতটা স্বাধীন হবে, ভুক্তভোগী পরিবার কি ভরসা পাবে– এই প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর সভাপতি ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলছেন, আইনের মধ্যে ফাঁকফোকর থাকলে সেই আইন কখনই কার্যকর হয় না।

“আইনটা এমনভাবে করা দরকার ছিল যাতে তদন্তটা অন্য কেউ, অর্থাৎ পৃথক কোনো কমিশন হোক বা সিভিল প্রশাসন হোক- অন্য কেউ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনী, সেটা করলে খুব একটা ভিন্ন ফলাফল আসবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের জন্য দরকার একটি “পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা”।

যার নিজস্ব জনবল, বাজেট ও গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকবে। তা না হলে তদন্তে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

দুটি হাত মুষ্টিবদ্ধ কারাগারের শিক ধরে আছে

ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আইনে থাকা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা

গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থেকে গেলে, এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বা এমএসএফ এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানের।

তিনি বলছেন, “গুমের মতো ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে স্পেশাল কমিশন বা ইস্যুভিত্তিক বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন করা বাঞ্ছনীয়।”

যদিও এই আইনের মধ্য দিয়ে, গুমের বিষয়ে অভিযোগ করার আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, যা ইতিবাচক বলেই মত এই মানবাধিকারকর্মীর।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ তদন্তের বিষয়টি ছাড়াও বেশ কিছু ত্রুটি দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।

তিনি বলছেন, এই আইনে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির অধিকার এবং তার প্রয়োজনের বিষয়গুলো আমলে নেওয়া হয়নি। এছাড়া, গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতিপূরণ কী হবে সে বিষয়েও কিছু উল্লেখ নেই।

“একটি ঘটনায় আসামির সম্পৃক্ততা আছে কি না সেই বিষয়টি ডিফেন্ড করার অনেক সুযোগ আইনের মধ্যেই রেখে দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ থেকে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. ফারুক বলছেন, বাংলাদেশের আদালতে সাধারণ ফৌজদারি মামলাই বছরের পর বছর চলে। গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা – সব মিলিয়ে ১২০ দিনে শেষ করা বাস্তবে কঠিন। সময়সীমা না মানলে কী শাস্তি, তাও স্পষ্ট নয়।

এছাড়া সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়টি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তাদেরকে সুরক্ষা দেবে কে? এই প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, অতীতে গুমের শিকার বা তাদের পরিবারকে হুমকির মুখে পড়তে দেখা গেছে।

বিবিসি নিউজ বাংলা