ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে এত দিন যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা হয়তো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, সরকার টিকে আছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিও এখনো রয়েছে—এসব কারণে অনেকের ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত ইরানই কৌশলগতভাবে এগিয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে চিত্রটি ভিন্ন হতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের যে বড় ধরনের চাপ তৈরির ক্ষমতা ছিল, তা এখন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং জাহাজ চলাচলের পথ নিরাপদ রাখার তৎপরতার ফলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
যুদ্ধের চতুর্থ অধ্যায়
গত ছয় মাসের সংঘাতকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় ব্যাপক বিমান হামলা এবং প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে তীব্র সামরিক অভিযান চলে।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে। পরে আলোচনা গড়ায় এমন এক সমঝোতায়, যার স্মারক ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেন।
এর কয়েক সপ্তাহ পর তৃতীয় পর্যায়ে ইরান আবার হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
এ সময় অনেকের ধারণা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আর কোনো পথ নেই। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
হরমুজে ইরানের চাপ কেন কমছে
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবার সামরিক অবরোধ কার্যকর করেছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির নৌপথ পরিষ্কার রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলে সহায়তা করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।
এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর কার্যকর বাধা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং জ্বালানির দামও এখন পর্যন্ত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছে বলে সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এর অর্থ হলো, হরমুজকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরির যে কৌশল ইরান নিয়েছিল, সেটি আগের মতো কার্যকর থাকছে না। প্রণালিকে জিম্মি করার সক্ষমতা কমে গেলে ইরানের দর-কষাকষির শক্তিও দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটে আরও চাপে তেহরান
যুদ্ধ শুরুর আগেই দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল ছিল। যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এ বছর ইরানের অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। দেশটির মুদ্রার মূল্যও ব্যাপকভাবে কমেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
ইরানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রথম তিন মাসেই ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে।
এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম যথেষ্ট নয়। একটি সরকারকে তার সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো চালানোর জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদের প্রয়োজন হয়।![]()
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর জন্য নতুন সংকট
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত আসে। এর ফলে দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং সরকারবিরোধী জনগণের ওপর দমন-পীড়নও বেড়েছে।
কিন্তু শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল সম্পদ প্রয়োজন। হরমুজকে ঘিরে বর্তমান সামরিক অবরোধ তাই ইরানের জন্য বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান তার অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এমন ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের মুখে পড়েছে।
এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথও তেহরানের জন্য সহজ নয়। বাণিজ্যিক জাহাজকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করা এবং অবশিষ্ট পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিত্যাগ করাই আলোচনার সম্ভাব্য পথ। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর দৃষ্টিতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হতে পারে এবং তা তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ইরানের হাতে এখনো কিছু অস্ত্র আছে
তবে ইরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে গেছে ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক। তেহরান চাইলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত করা, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানোর চেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা—এগুলো ইরানের সম্ভাব্য কৌশল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও আবার হামলা হতে পারে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরাও লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে হামলার হুমকি দিতে পারে।
তবে আগের কৌশলগুলো ইরানের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনেনি। উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও হরমুজে ইরানের দাবির কাছে নতি স্বীকার করার পক্ষে নয়। ড্রোন ও মাইন ব্যবহার করে হরমুজ বন্ধ করার চেষ্টাও এখন আগের তুলনায় কম কার্যকর হচ্ছে।
কার আগে ভাঙন আসবে?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি দাবি করেছেন, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। তার যুক্তি, এর আগেও বিভিন্ন চাপ ইরানের নীতি বদলাতে পারেনি।
কিন্তু দীর্ঘ সংঘাতে কোনো পক্ষই সীমাহীন চাপ সহ্য করতে পারে না। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একটি সহনসীমা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই সীমায় আগে কে পৌঁছাবে—ইরান, নাকি যুক্তরাষ্ট্র?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ় বলে মনে হচ্ছে। তবে সংঘাতের চূড়ান্ত ফল এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
যুদ্ধের শেষ অধ্যায় এখনো আসেনি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও চলতে পারে। কারণ দুই দেশের বিরোধের শিকড় প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিস্তৃত।
যুদ্ধের আগের পর্যায়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বারবার বদলেছে এবং নীতিগত অবস্থানেও অসঙ্গতি দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান চতুর্থ পর্যায়ে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট।
হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ কার্যকর রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করাই এখন মার্কিন সামরিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক লক্ষ্যও আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—ইরানকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি পরিত্যাগ করতে হবে এবং পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব বিষয়ে সমাধান না হচ্ছে, ততক্ষণ বর্তমান পরিস্থিতিই নতুন বাস্তবতা হয়ে থাকতে পারে।
আর সেই বাস্তবতায় যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো কৌশলগত পাল্লা তেহরানের বদলে ওয়াশিংটনের দিকেই কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















