ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চুক্তি হবে, নাকি সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—এই প্রশ্নের মধ্যেই মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানকে কঠোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। তবে চুক্তি না হলে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকিও দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ইরান যাতে ভবিষ্যতে অন্য দেশ ও মানুষের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘প্রচারণা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, আগ্রাসনের জবাবে আরও কঠোর, বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত হামলা চালানোর জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চলছে পর্দার আড়ালের আলোচনা

কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে আলোচনাও এগিয়ে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মঙ্গলবার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীরা দিনভর যাতায়াত করে আলোচনা এগিয়ে নেন।
উইটকফ বলেন, মধ্যস্থতার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং মঙ্গলবারের আলোচনা গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
প্রায় সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাত শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, বেড়েছে তেলের দাম এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও।
হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের শর্ত
যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করত। যুদ্ধের কারণে এর নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে পারে তেহরান। ইরানের প্রস্তাব গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে উপসাগরীয় জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ স্পষ্ট করেছেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তাঁর বক্তব্য, ইরানি জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি চাপিয়ে দিতে পারবে না।
উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও ইয়েমেন সংকট
ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের বৈঠকেও ইরান ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। কাতার ইরান ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের অগ্রগতিতে সৌদি আরবও সংঘাতে আরও জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে হুথিরা অগ্রসর হয়েছে এবং লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানির ওপরও হুমকি তৈরি হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের অনুরোধ সত্ত্বেও হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে সমর্থন করবে, তবে হুথি সংঘাত একটি জটিল ও দীর্ঘদিনের সংকট।
তেলের বাজারে সাময়িক স্বস্তি
তবে মঙ্গলবার তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে সীমিত পরিমাণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেল রপ্তানি ফের শুরু হতে পারে।
এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। চলতি মাসে হামলার পর এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই হামলার জন্য রিয়াদ ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছিল।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরান পরিস্থিতির অবসান ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর, এমনকি তার আগেও হতে পারে। তবে আলোচনার ফল কী হবে, নাকি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তার ওপর পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















