বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে গোহাইল রোডে ঢুকলেই চোখে পড়ে সড়কের বেহাল দশা। প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে অসংখ্য গর্ত, উঠে যাওয়া পিচ, বেরিয়ে থাকা খোয়া ও জমে থাকা পানিতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন নগরবাসী। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে পাঁচ হাজারের বেশি গর্ত গোনা হলেও এরপর আর হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি।
কোথাও গর্ত এতটাই গভীর যে মোটরসাইকেল ও স্কুটির নিচের অংশ মাটিতে ঠেকে যাচ্ছে। পানিতে ডুবে থাকা গর্তগুলোর গভীরতা বোঝাও কঠিন। এর মধ্যেই রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাক ও বাস চলাচল করছে।
গর্তে বিপজ্জনক তিন কিলোমিটার
সাতমাথা থেকে গোহাইল রোডের কৈগাড়ী থেকে ফুলতলা অংশে অনেক জায়গায় কার্পেটিং উঠে গেছে। কোথাও ইটের সোলিং দেবে গিয়ে নতুন গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও পিচ উঠে খোয়ার স্তর বেরিয়ে পড়েছে।
সিঅ্যান্ডবি গোডাউন থেকে মাহাবুব নগরের সামনের অংশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সড়কের এমনভাবে কার্পেটিং উঠে গেছে যে এখানে একসময় পাকা সড়ক ছিল কি না, সেটিই বোঝা কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এ অংশে প্রায়ই রিকশা উল্টে যায়। মোটরসাইকেল ও স্কুটি চালকরাও গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকেন।
ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক মনির হোসেন জানান, গর্তে চাকা পড়লে রিকশা উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে গাড়ির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কখনো মোটরও পুড়ে যায়। তাই অনেক চালক এই সড়ক এড়িয়ে চলেন।
অফিসে যাতায়াতকারী মোটরসাইকেলচালক আমির হামজা বলেন, কোন গর্ত কতটা গভীর তা বোঝা যায় না। কোনো কোনো গর্তে চাকা পড়লে মোটরসাইকেলের নিচের অংশ মাটিতে ঠেকে যায়। বৃষ্টির পানি জমলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
২৬ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজের গতি নেই
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে চার মাস আগে গোহাইল রোডের উন্নয়নকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকা। নেকটার থেকে সাতমাথা পর্যন্ত ৩ দশমিক ০৯২ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি তিন কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত ও ৩ দশমিক ০৯২ কিলোমিটার স্ট্রিট লাইট নির্মাণের কথা রয়েছে।
২৭ মে ২০২৬ কাজ শুরুর পর ২০২৭ সালের ২৬ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বগুড়া সিটি করপোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও মূল সড়ক পুনর্নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান নয়। পশ্চিম পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ কয়েক মিটার এগোনোর পরই থেমে গেছে। কোথাও ড্রেনের জন্য মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে, কোথাও পড়ে আছে অর্ধনির্মিত কাঠামো। এতে পুরোনো দুর্ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন খোঁড়াখুঁড়ি ও অসমাপ্ত নির্মাণকাজ।
ড্রেনেজ সংকটে জলাবদ্ধতা
প্রকল্পের মূল্যায়ন নথিতেও গোহাইল রোডের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, সড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত ও উঁচুনিচু পৃষ্ঠ রয়েছে। বিদ্যমান ড্রেন সরু, ক্ষতিগ্রস্ত ও পলিতে ভরা। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয় এবং সড়ক ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের ভাষ্য, গত পাঁচ বছরে এই সড়কে বড় ধরনের কোনো কাজ হয়নি। ছোটখাটো মেরামত করে চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হলেও সেসব সংস্কার দুই-তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি।
ঠিকাদার নিয়ে জটিলতা
প্রকল্পের মূল ঠিকাদার শামিম এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেড ও এসইপিএল-আরএসই (জেভি)। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। মূল ঠিকাদারের হয়ে বগুড়ার আর এস কনস্ট্রাকশন কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম জানান, কাজের পেছনে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিল না পাওয়ায় কাজের গতি কমেছে। তিন কোটি ১৭ লাখ টাকার একটি আংশিক বিল সিটি করপোরেশনে জমা দেওয়া হয়েছে। বিল পাওয়া গেলে কাজ পুরোদমে শুরু করার কথা জানান তিনি।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মুহম্মদ সাইদ আলী বলেন, প্রকল্পের শর্তে বিল পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও সেটিকে কাজ বন্ধ বা ধীরগতির অজুহাত হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ঠিকাদারকে সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাজ শুরু না হলে প্রয়োজনে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীনও জানিয়েছেন, মূল ঠিকাদার কাজে আসছেন না এবং তাদের তাগাদা দিয়েও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















