অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের আন্তর্জাতিক চক্রের জন্য কম্বোডিয়া কোনো ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত। বুধবার রাজধানী নমপেনে অনলাইন প্রতারণা দমনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
দুই দিনের এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ এক ডজনের বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সম্মেলনের মাধ্যমে কম্বোডিয়া একদিকে আন্তঃদেশীয় প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযান তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
হুন মানেত বলেন, অপরাধী চক্রকে কম্বোডিয়ার অগ্রগতি এবং দেশটির ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা, বিশেষ করে তাৎক্ষণিকভাবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘কম্বোডিয়া কখনোই অনলাইন প্রতারণার জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে না।’
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় প্রতারণা নেটওয়ার্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এসব চক্রের সঙ্গে প্রধানত চীনা অপরাধী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বড় বড় ভবন বা কম্পাউন্ডে মানুষকে আটকে রেখে তাদের দিয়ে অনলাইন প্রতারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানে আটকে পড়া অনেকেই মানব পাচারের শিকার হয়ে সেখানে পৌঁছান। পরে তাদের জোর করে প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণা, পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তার পরিচয়ে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়।
গত সোমবার ও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের কয়েকটি বড় কম্পাউন্ড ঘুরিয়ে দেখায় কম্বোডিয়ার সরকার। এসব স্থাপনার মধ্যে এমন একটি কেন্দ্রও ছিল, যেখানে একসময় প্রায় ২০ হাজার কর্মী থাকার ব্যবস্থা ছিল। পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে যেসব সামগ্রী জব্দ করেছে, তার মধ্যে ভুয়া এফবিআই ও চীনা পুলিশের ব্যাজও ছিল। এসব পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হতো বলে অভিযোগ।
শত শত কম্পাউন্ডে অভিযান
কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শিল্প পর্যায়ে পরিচালিত প্রতারণা কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। গত এক বছরে দেশটিতে শত শত কম্পাউন্ডে অভিযান চালানো হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সরকার।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কম্বোডিয়ার এই অভিযানের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে, শুধু ২০২৪ সালেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিচালিত প্রতারণা চক্রের কারণে মার্কিন নাগরিকদের ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ হারানোর ঘটনা ঘটেছে।
তবে কম্বোডিয়া সরকারের অভিযানের দাবি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষকের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে অভিযান হলেও প্রতারণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, বড় কম্পাউন্ডে অভিযান চালানোর পর অনেক অপরাধী চক্র ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ কার্যক্রম অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের আঞ্চলিক প্রতিনিধি দেলফিন শঁৎস বলেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কম্বোডিয়ার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার আগ্রহকে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। তবে জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র—দুই জায়গাতেই আরও অনেক কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রতারণা চক্রের পরিবর্তনশীল কর্মকৌশল সম্পর্কে দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন ধারণা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে কার্যকর ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
কারণ অনলাইন প্রতারণা এখন আর কোনো একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি দেশের নাগরিককে অন্য দেশে বসে প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে, অর্থ স্থানান্তর হচ্ছে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে এবং অপরাধীরা দ্রুত তাদের অবস্থান ও পদ্ধতি বদলে ফেলছে। ফলে শুধু স্থানীয় অভিযান দিয়ে এ ধরনের চক্র পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
কম্বোডিয়ার সরকার বলছে, প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে সমালোচকদের মতে, অভিযানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতগুলো ভবনে অভিযান চালানো হলো বা কত মানুষকে আটক করা হলো তার ওপর নয়; বরং এসব নেটওয়ার্কের পেছনে থাকা অর্থদাতা, সংগঠক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তার ওপর।
নির্বাসিত বিরোধী রাজনীতিক মু সোচুয়া বলেছেন, কম্বোডিয়ার অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে রাষ্ট্র সব বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তদন্ত করতে কতটা প্রস্তুত তার ওপর—অভিযুক্ত ব্যক্তি যত ধনী, প্রভাবশালী বা সরকারি পদে থাকুক না কেন।
ফলে নমপেনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন কম্বোডিয়ার জন্য শুধু নিজেদের অভিযান তুলে ধরার সুযোগ নয়; বরং অনলাইন প্রতারণা, মানব পাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় দেশটি বাস্তবে কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, তারও একটি পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















