জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসরায়েল। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং সেখানে হামাসের হামলা হয়নি—ম্যাক্রোঁর এমন মন্তব্যকে ‘চরম অযৌক্তিক’ ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে আখ্যা দিয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যটি ছিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাক্রোঁর শেষ ভাষণ। সেখানে তিনি গাজায় চলমান মানবিক সংকটের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডেরও কঠোর সমালোচনা করেন।
গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ম্যাক্রোঁ বলেন, ওই হামলার পর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তবে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘পশ্চিম তীরে কী ঘটছে, তা দেখুন। প্রতিদিন সেখানে লঙ্ঘন ঘটছে। কেন? হামাস কখনো পশ্চিম তীরে হামলা চালায়নি।’ তাঁর মতে, পশ্চিম তীরে প্রতিদিনের সহিংসতা ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
ম্যাক্রোঁর এই মন্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ইসরায়েল।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের ‘চরম অযৌক্তিকতা বিস্ময়কর’। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, পশ্চিম তীরে হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’—পশ্চিম তীরের জন্য ইসরায়েলের ব্যবহৃত বাইবেলীয় নাম—এ বহু ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেছে। রোববার ইহুদিদের পবিত্রতম দিন ইয়োম কিপুরের আগের দিন পশ্চিম তীরে এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হন। নিহত ব্যক্তি নেটানেল শুকরুন ছয় সন্তানের বাবা ছিলেন এবং তাঁর ফরাসি নাগরিকত্বও ছিল বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীকে একটি হাসপাতালে আটক করা হয়। পরে সেনারা তাঁর গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালায়। নেতানিয়াহু সরকারের এক মন্ত্রী নতুন একটি আইনের আওতায় ওই হামলাকারীর মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন।
তবে পশ্চিম তীরের সহিংসতার আরেকটি দিকও রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, বাড়িঘর ও সম্পত্তিতে আক্রমণ এবং লুটপাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি মানুষ বা তাঁদের সম্পত্তিকে লক্ষ্য করে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনা দিনে গড়ে প্রায় ছয়টি ছিল।
অর্থাৎ পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে ইসরায়েল নিরাপত্তা ও সশস্ত্র হামলার হুমকির কথা তুলে ধরছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ করে আসছে।

ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, জাতিসংঘে ম্যাক্রোঁর মতো ‘বাস্তবতা থেকে এতটা বিচ্ছিন্ন’ বক্তব্য কল্পনা করা কঠিন। তাঁর ভাষায়, হামাস একটি ‘অশুভ অভিশাপ’ এবং তারা নিরপরাধ মার্কিন নাগরিকদেরও হত্যা করেছে।
তবে জাতিসংঘে নিজের বক্তব্যে ম্যাক্রোঁ শুধু পশ্চিম তীর নয়, গাজার মানবিক পরিস্থিতিকেও সামনে আনেন। তিনি বলেন, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পরিস্থিতি যথেষ্ট উন্নত হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে?
ম্যাক্রোঁ বলেন, কেউ কেউ দাবি করছেন যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু যদি সেই কথিত শান্তির পরও গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছানো না যায়, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য লজ্জার বিষয়।

পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক বাস্তবতাও জটিল। হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরের প্রধান শহরগুলোর কিছু এলাকায় সীমিত স্বায়ত্তশাসন পরিচালনা করে। তবে ভূখণ্ডটির বড় অংশে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
২০০৭ সালে হামাস গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর দুই বছর আগে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং সেখানে থাকা বসতিগুলো সরিয়ে নেয়।
পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের পাশাপাশি ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নেতানিয়াহু সরকারের সম্পর্কও বেশ টানাপোড়েনের। গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগে ম্যাক্রোঁ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সম্প্রতি ফ্রান্সও ব্রিটেনের সঙ্গে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে আসা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এই পদক্ষেপেও ইসরায়েল সরকার ক্ষুব্ধ হয়েছে।
ফলে জাতিসংঘে ম্যাক্রোঁর সর্বশেষ বক্তব্য শুধু পশ্চিম তীরের সহিংসতা নিয়ে নতুন বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, ইসরায়েলি বসতি, গাজার মানবিক সংকট এবং হামাসের হামলার মতো পুরোনো ও জটিল প্রশ্নগুলোকে আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















