যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যেই এআইয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এআই নিয়ন্ত্রণকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন চীনবিষয়ক প্রযুক্তিনীতি বিশ্লেষক আন্তোনিয়া হমাইদি। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে যে ধরনের যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সম্ভব, এআইয়ের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি কঠিন।
হমাইদি জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কর্মসূচির প্রধান। সম্প্রতি এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এআই পারমাণবিক অস্ত্রের মতো নয় এবং বর্তমানে এআই প্রযুক্তির অবস্থাও পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পর্যায়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে মূল পার্থক্য কোথায়
হমাইদির ব্যাখ্যায়, পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো দেশের অস্ত্রভাণ্ডার কত বড় বা কোথায় রয়েছে—এসব বিষয় অন্তত বড় পরিসরে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। বিপুল সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র গোপনে কোথাও মজুত রাখা তুলনামূলকভাবে কঠিন। স্যাটেলাইট নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য, পরিদর্শন ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে পারমাণবিক কর্মসূচির অনেক বিষয় যাচাই করা সম্ভব।
কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ধরা যাক, কোনো দেশ ঘোষণা করল যে তারা জৈবপ্রযুক্তি বা জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন এআই উন্নয়ন বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য দেশ কীভাবে নিশ্চিত হবে যে সত্যিই সেই দেশের গবেষণাগারগুলো এ ধরনের কাজ বন্ধ করেছে?
এটাই এআই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি বলে মনে করেন হমাইদি।
কারণ উন্নত এআই তৈরির জন্য সবসময় বিশাল সামরিক ঘাঁটি বা সহজে শনাক্তযোগ্য অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। গবেষণাগার, কম্পিউটিং অবকাঠামো, তথ্যভাণ্ডার ও সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রযুক্তির উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া যায়। ফলে কোনো দেশ প্রকাশ্যে যে দাবি করছে, বাস্তবে তার গবেষণা ঠিক একই জায়গায় থেমে আছে কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন।
ট্রাম্প-শির আলোচনায় এআই কেন গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্প ও শির বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে এআইকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্য ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুই দেশ প্রযুক্তিটির জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে যোগাযোগ রাখবে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই সংলাপ এবং জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে পৌঁছানো এআই-সংক্রান্ত বড় ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে পরস্পরকে জানানোর একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাবের কথা জানিয়েছেন।
এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে যোগাযোগের একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেটি এআই উন্নয়নের ওপর বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
‘রেড লাইন’ নির্ধারণও কঠিন
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা বা ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করার আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন হলো—কোন পরিস্থিতিকে এমন সীমা অতিক্রম হিসেবে ধরা হবে?
একটি এআই মডেল কতটা শক্তিশালী হলে সেটিকে বিপজ্জনক বলা হবে? কোন ধরনের গবেষণা বন্ধ করতে হবে? কোন প্রযুক্তি সামরিক ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করছে? আর কোন পর্যায়ে কোনো দেশকে অন্য দেশের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে?
এআই প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া আরও কঠিন।
হমাইদির মতে, ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটিই এখনো পরিষ্কার নয়। এটি হয়তো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআইয়ের দিকে এগোতে পারে, আবার কোনো পর্যায়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ধীর বা স্থবিরও হয়ে যেতে পারে। এজিআই বলতে এমন এআইকে বোঝানো হয়, যা মানুষের মতো বিস্তৃত পরিসরের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করতে সক্ষম।
এই অনিশ্চয়তার কারণে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের পক্ষে এআই উন্নয়নের ওপর কঠোর সীমা আরোপে একমত হওয়া কঠিন হতে পারে।
এআই নিয়ে প্রতিযোগিতাও চলছে
এদিকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক বাড়ছে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী বা অত্যন্ত উন্নত এআই তৈরির গতি কমানোর পক্ষে কথা বলেছেন।
তাঁর আশঙ্কা, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা দ্রুত উন্নত হতে থাকলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে নন। তাঁর অবস্থান হলো, চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব ধরে রাখতে হবে।
ফলে একদিকে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ কমানোর আলোচনা চলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকবে—সেই প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই ভবিষ্যতের এআই নীতির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তি হলেও তা কতটা কার্যকর হবে?
ট্রাম্প ও শি যদি বৈঠকে এআই নিয়ে কোনো উদ্যোগের ঘোষণা দেন, সেটি সরাসরি বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন হমাইদি।

বরং প্রযুক্তিগত তথ্য বিনিময়, দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ, ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা এবং কিছু সাধারণ নীতিগত অবস্থানে সম্মত হওয়ার মতো পদক্ষেপ বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের হাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাখার মতো প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন। রাজনৈতিকভাবে এ ধরনের নীতিতে সম্মত হওয়া সহজ হলেও বাস্তবে কোনো দেশ সেটি মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কোনো দেশ যদি ঘোষণা করে যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষই চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে, বাস্তবে এআই ব্যবস্থাটি কতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করছে তা বাইরের পক্ষ কীভাবে যাচাই করবে—সেটি পরিষ্কার নয়।
হমাইদির মূল্যায়ন তাই বেশ সতর্ক। তাঁর মতে, ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে এআই নিয়ে কোনো ঘোষণা এলেও সেটি বাস্তবে এআই নিরাপত্তা কতটা বাড়াবে, তা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই।
পারমাণবিক যুগের চুক্তি, এআই যুগের অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সময় অস্ত্রের সংখ্যা, পরীক্ষার স্থান, উৎপাদন সক্ষমতা ও মোতায়েন ব্যবস্থা নিয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ছিল। এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এআই একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি। আজ যে ক্ষমতাকে উন্নত বা সীমান্তবর্তী প্রযুক্তি বলা হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো সাধারণ প্রযুক্তিতে পরিণত হতে পারে। আবার নতুন কোনো ক্ষমতা হঠাৎ করে নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই ট্রাম্প ও শির বৈঠকে এআই নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা গেলেও, সেটিকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো কোনো স্থায়ী ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থার সূচনা হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি।
বরং এই বৈঠক থেকে দুই দেশের মধ্যে এআই ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরি হয় কি না, সেটিই হতে পারে প্রথম বাস্তব পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















