এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাঁকে ঘিরে ওয়াশিংটনে এবার এমন জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশের নেতারাও সাধারণত পান না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে শিকে স্বাগত জানাতে বিমানঘাঁটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। এরপর হোয়াইট হাউসে থাকবে সামরিক কুচকাওয়াজ, আকাশে যুদ্ধবিমানের প্রদর্শনী, রাজকীয় নৈশভোজসহ নানা আয়োজন।
তবে এই জাঁকজমকের আড়ালে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কিছু আলোচনা। বাণিজ্য ও শুল্কনীতি, বিরল মাটির খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, তাইওয়ান এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক—সবকিছুই ট্রাম্প ও শির বৈঠকের আলোচনায় আসতে পারে।
শি বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর কথা। তাঁকে অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাতে পারেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ মার্কিন সামরিক সদস্য অংশ নেবেন। থাকবে সামরিক বিমানের উড্ডয়ন প্রদর্শনীও। শুক্রবার শেষ হবে শির এই রাষ্ট্রীয় সফর।
যুক্তরাষ্ট্রে এটি শির এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম সফর। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্পের সঙ্গে এটি হবে তাঁর তৃতীয় বৈঠক।
বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতার চেষ্টা
শি-ট্রাম্প বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। গত বছর অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা হয়েছিল। সেই সমঝোতার আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত করেছিল। অন্যদিকে চীন উৎপাদন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ বিরল মাটির খনিজ রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করেছিল।

কিন্তু সেই বাণিজ্যিক বিরতির মেয়াদ আগামী নভেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা। ফলে শির সফরে এই সমঝোতা বাড়ানো হবে কি না, সেটিই বিশেষভাবে নজরে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতিও ট্রাম্পের জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। সর্বশেষ মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৯১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে গত অক্টোবরে হওয়া সমঝোতার পরও যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিরল মাটির খনিজ রপ্তানি কমেছে। আধুনিক গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন শিল্পে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
শির সফরের আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অশুল্ক বাণিজ্য বাধা এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র খোঁজা হয়েছে।
শি ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর বুধবারও দুই দেশের বাণিজ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ট্রাম্প ও শির বৈঠকে আরেকটি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তির নেতৃত্ব দখলের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এই প্রতিযোগিতাকে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত অস্ত্র প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন।
চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতাকে ট্রাম্পও জাতীয় শক্তি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর ভাষায়, যে দেশ এআই প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে, তারাই ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে।
তবে একই সময়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এআই-সম্পর্কিত বেশ কিছু নিরাপত্তা ঘটনা প্রযুক্তিটির ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ফলে এআইয়ের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
)
ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ও শিকে মানবজাতির স্বার্থে দ্রুত একটি চুক্তিতে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, অত্যন্ত উন্নত এআই বা সুপারইন্টেলিজেন্সের ঝুঁকি ঠেকাতে এআই উন্নয়নে সাময়িক বিরতি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশকে আলোচনা করতে হবে।
ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এবং কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
তবে ট্রাম্প এখনো এআই উন্নয়ন থামানোর পক্ষে নন। বরং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখাকেই তিনি বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষক ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, এআই এখন দ্রুত দুই দেশের শীর্ষ আলোচ্যসূচির দিকে উঠে এসেছে। তাঁর ধারণা, ট্রাম্প ও শি এআই নিয়ে সহযোগিতার কিছু সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা করতে পারেন।
এর আগে রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাণিজ্য ও এআই নিয়ে ওই আলোচনাকে তিনি ‘খুবই সফল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, শি-ট্রাম্পের এবারের বৈঠকগুলো থেকে এআই বা অন্য কোনো বড় বিষয়ে তাৎক্ষণিক যুগান্তকারী সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তাইওয়ানও থাকবে আলোচনার টেবিলে
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। এই সফরেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মার্কিন কংগ্রেস তাইওয়ানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। এখন সেই চুক্তিতে ট্রাম্পের স্বাক্ষর বাকি। তবে ট্রাম্প আপাতত এতে স্বাক্ষর না করে বিষয়টিকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছেন।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে এবং দ্বীপটির সঙ্গে ‘পুনরেকত্রীকরণ’-এর লক্ষ্য ঘোষণা করে আসছে। প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও বেইজিং উড়িয়ে দেয়নি।
বিশ্লেষক ফায়ারস্টেইনের ধারণা, শি চাইবেন ট্রাম্প যেন তাইওয়ানের অস্ত্র বিক্রি আরও বিলম্বিত করেন অথবা কোনোভাবে সেই বিক্রি এড়িয়ে যান।
ট্রাম্পের সামনে রাজনৈতিক চাপও কম নয়
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করলেও ট্রাম্পের নিজের প্রশাসন ও রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশ বেইজিংয়ের প্রতি গভীর সন্দেহ পোষণ করে। ফলে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতা করতে গেলে ট্রাম্পকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে।
এর একটি উদাহরণ হলো মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। সেপ্টেম্বরে তিনি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন কর্মসংস্থান রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি এই আহ্বান জানান।
অর্থাৎ, একদিকে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সমঝোতার পথ খুঁজছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনেরই কিছু অংশ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
শি-ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ
সব বাধা সত্ত্বেও ট্রাম্প মনে করছেন, শির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা দুই দেশের সম্পর্ককে সংঘাত থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ন্যাশনাল কমিটি অন ইউএস-চায়না রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন অর্লিন্সের মতে, ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে যেকোনো মূল্যে সংঘাতপূর্ণ পর্যায়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
তাঁর মতে, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন—তিনি ও শি যত বেশি সরাসরি বৈঠক করবেন, দুই দেশের সম্পর্ক তত কম সংঘাতপূর্ণ হবে।
শির এবারের ওয়াশিংটন সফর তাই শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি একই সঙ্গে বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা, এআই প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা, তাইওয়ান ইস্যুতে দর-কষাকষি এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একটি নতুন কাঠামো তৈরির সম্ভাবনার পরীক্ষা।
জাঁকজমকপূর্ণ স্বাগত অনুষ্ঠানের বাইরে শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব সমঝোতা হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ দুই দেশের সম্পর্কের সামনে যেমন বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















