চোখের নিচের ফোলা ভাব, ঝুলে পড়া চোখের পাতা কিংবা চোখের চারপাশের বয়সের ছাপ কমাতে অনেকেই চোখের পাতায় অস্ত্রোপচার বা ‘ব্লেফারোপ্লাস্টি’ করান। তুলনামূলক কম খরচে এই ধরনের অস্ত্রোপচার করানোর সুযোগ থাকায় অনেক মানুষ বিদেশেও চিকিৎসা নিতে যান। কিন্তু সস্তায় করানো এই সৌন্দর্য অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর জটিলতায় পড়ার ঘটনা নিয়ে এখন উদ্বেগ বাড়ছে।
চোখের চারপাশের অস্ত্রোপচারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, বিদেশে কম খরচে চোখের পাতার অস্ত্রোপচার করিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী বিভিন্ন সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। কারও অস্ত্রোপচারের ক্ষত ঠিকভাবে শুকাচ্ছে না, কারও চোখের চারপাশে দাগ তৈরি হয়েছে, আবার কেউ তীব্র ব্যথা ও সংক্রমণের শিকার হয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন নারীর অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে, যারা বিদেশে চোখের পাতার অস্ত্রোপচার করানোর পর দেশে ফিরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। তাদের কারও ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পরের ক্ষত স্বাভাবিকভাবে সেরে ওঠেনি। এমনকি একজন জানিয়েছেন, তার চোখের পাতায় সংক্রমণ এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে ঘুমাতেও তিনি ভয় পাচ্ছিলেন।

চোখের পাতার অস্ত্রোপচারকে সাধারণত একটি তুলনামূলক ছোট ধরনের সৌন্দর্য চিকিৎসা হিসেবে দেখা হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এটি আসলে চোখের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে করা অস্ত্রোপচার। চোখের পাতা শুধু মুখের সৌন্দর্যের অংশ নয়, চোখকে আর্দ্র রাখা, ধুলোবালি থেকে রক্ষা করা এবং চোখের স্বাভাবিক সুরক্ষায়ও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ফলে অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত চামড়া সরিয়ে ফেলা, সঠিকভাবে ক্ষত বন্ধ না করা কিংবা পরবর্তী পরিচর্যায় সমস্যা হলে চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। সংক্রমণ হলে ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব ও ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে চোখের দৃষ্টির ওপরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, কম খরচের অস্ত্রোপচারের বিজ্ঞাপন দেখে রোগীরা অনেক সময় চিকিৎসক, ক্লিনিকের মান, অস্ত্রোপচারের নিরাপত্তা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজ না নিয়েই বিদেশে চলে যান।
বিদেশে অস্ত্রোপচার করানোর ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসক বা ক্লিনিকের কাছে দ্রুত ফিরে যাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। রোগী দেশে ফেরার পর স্থানীয় চিকিৎসকদেরই সেই জটিলতা সামলাতে হয়। ফলে অস্ত্রোপচারের বিস্তারিত তথ্য, কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বা কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে—এসব জানা না থাকলে পরবর্তী চিকিৎসাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চোখের বিশেষজ্ঞরা তাই শুধু অস্ত্রোপচারের খরচ নয়, চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা, ক্লিনিকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসার সুযোগ এবং অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা—সবকিছু বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রত্যাশা থেকে করা কোনো চিকিৎসা যেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ না হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে চোখের মতো স্পর্শকাতর অঙ্গের অস্ত্রোপচারে শুধু কম দাম দেখেই সিদ্ধান্ত না নেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন।
চোখের পাতার অস্ত্রোপচার করানোর আগে রোগীর নিজের প্রত্যাশা, সম্ভাব্য ঝুঁকি, চিকিৎসকের যোগ্যতা এবং জটিলতা হলে কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। কারণ একটি ছোট সৌন্দর্যগত পরিবর্তনের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত যেন চোখের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব না ফেলে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















