২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব সৃষ্টি করে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পদত্যাগে বাধ্য করা, হেনস্তা এবং কর্মস্থল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সহস্রাধিক শিক্ষক এখনও নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের একটি সংগঠন দাবি করেছে। অথচ ঘটনার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে এ ধরনের ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।
মবের মুখে পদত্যাগ
বরিশালের গৌরনদীর শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কণিকা মুখার্জী ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শ্রেণিকক্ষে মবের হেনস্তার শিকার হন। কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ একটি দল তাঁর শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয় এবং তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল ও পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়। স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় তিনি সেদিন প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে সক্ষম হন। পরে বিদ্যালয়ে ফিরেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, কোথাও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল আবার কোথাও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব তৈরি করেন। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা পদ-পদবি নিয়ে দ্বন্দ্বও এসব ঘটনার পেছনে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ যাচাই বা নিয়মতান্ত্রিক তদন্তের আগেই শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

দুই হাজারের বেশি শিক্ষক-প্রধান সরানোর তথ্য
সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া বা পদত্যাগে বাধ্য করার তথ্য এসেছে। অন্যদিকে ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দাবি, প্রায় দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক হয়রানি, অপমান, পদত্যাগে বাধ্য হওয়া বা কর্মস্থল থেকে বিতাড়নের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন এবং শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংগঠনটির দাবি।
ঢাকা জেলাতেই ৫ আগস্টের পর দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক পদত্যাগ, অপসারণ, বরখাস্ত কিংবা কর্মস্থলে বাধার মুখে পড়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দেশের আরও বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
বেতন বন্ধ, বাড়ছে আর্থিক সংকট
জোরপূর্বক পদত্যাগের পর অনেক শিক্ষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে দেওয়া হয়। পদত্যাগের পর তাদের অনুপস্থিত দেখিয়ে তথ্য পাঠানো হলে একপর্যায়ে বেতন বন্ধ হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন আয় বন্ধ থাকায় পারিবারিক জীবনেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
কর্মস্থলে ফেরার পথেও বাধা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর ১৫ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত করতে হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছিল।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেছেন, জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এখনও কাজে ফিরতে পারেননি, তাদের স্থানীয় প্রশাসন এবং জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ
জোরপূর্বক পদত্যাগের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। একটি মামলায় ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধানের এমপিও বন্ধসহ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
সাত জেলার তথ্যেও দীর্ঘ অনিশ্চয়তা
বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ ও মৌলভীবাজারের ৬৫টি স্কুল-কলেজের ৬৬ জন শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে ২১ জন কর্মস্থলে ফিরলেও ৪৫ জন এখনও ফিরতে পারেননি। বগুড়ায় ২৭ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের মধ্যে ১৬ জন ফিরেছেন, ১১ জন এখনও বাইরে। সিরাজগঞ্জে কয়েকজন শিক্ষক আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরও যোগ দিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, অভিযোগ থাকলে নিয়মতান্ত্রিক তদন্ত ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রকাশ্যে শিক্ষককে অপমান করলে তা শুধু ব্যক্তির মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না, শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও আস্থার সংকট তৈরি করে।
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে ফিরতে না পারা, বেতন বন্ধ থাকা এবং আদালতের নির্দেশের পরও কোথাও কোথাও যোগদানে বাধা থাকার ঘটনাগুলো ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















