চীনে প্রায় দুই বছর ধরে বন্দি থাকা মার্কিন ভূকম্পবিদ ইউলিন চেনকে মুক্ত করতে এবার সরাসরি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে আবেদন জানাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন আশ্বাস পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন চেনের স্ত্রী ইউফাং রং। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দুই নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি এই আশ্বাস পেয়েছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রং বলেন, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তাকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় তার স্বামীর মুক্তির বিষয়টি তুলবেন।
চেনের পাশাপাশি চীনে আটক আরেক মার্কিন নাগরিক মিন জিনের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প তুলবেন বলে তাকে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই দুজনকেই ‘অন্যায়ভাবে আটক’ করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে।
৫৪ বছর বয়সী ইউলিন চেন উত্তর কোরিয়ার ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষার বিস্ফোরণ শনাক্ত ও বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত একজন ভূকম্পবিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতেন। তার গবেষণায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিমানবাহিনীর গবেষণাগারের অর্থায়ন ছিল।
বিমানবন্দর থেকে আটক

চেন ২০১১ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পান এবং পরে বোস্টন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর তিনি চীনের রাজধানী বেইজিং বিমানবন্দরে আটক হন। পরিবারের সঙ্গে দেখা এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
রংয়ের দাবি, চেনকে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আটক করার পর একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত চেনকে ১০০ বারের বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
চেনের স্ত্রী আশঙ্কা করছেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হতে পারে। তবে তার দাবি, চেনের গবেষণা ছিল প্রকাশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত এবং উন্মুক্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা। এমনকি এসব গবেষণার কিছু অংশে চীনা বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও সহযোগিতা ছিল।
রংয়ের আশঙ্কা, চীনা কর্তৃপক্ষ চেনের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্তকরণ এড়ানোর প্রযুক্তি সম্পর্কে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইতে পারে।
পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্তকরণ নিয়ে বিতর্ক
চেনের গবেষণার মূল ক্ষেত্র উত্তর কোরিয়ার ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্ত করা। এ ধরনের বিস্ফোরণের ফলে ভূগর্ভে যে কম্পন বা ধাক্কার তরঙ্গ তৈরি হয়, সেগুলো বিশ্লেষণ করেই বিস্ফোরণের মাত্রা ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
এখানেই ‘ডিকাপলিং’ বা বিস্ফোরণের অভিঘাত কমিয়ে দেওয়ার কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। বড় কোনো ভূগর্ভস্থ কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটালে মাটির ওপর তার কম্পনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। ফলে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ করে কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২২ জুন একটি কম ক্ষমতার পারমাণবিক বিস্ফোরণের অভিঘাত আড়াল করতে এমন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিল। চীন অবশ্য পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে চেনের মতো বিশেষজ্ঞের গবেষণা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

মাসে একবার দেখা করার সুযোগ
রং জানান, চীনে থাকা মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মাসে একবার প্রায় ৩০ মিনিটের জন্য চেনের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সাক্ষাৎও চীনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হয়।
তার লেখা চিঠি দূতাবাসের কর্মকর্তারা চেনকে পড়ে শোনান। এরপর চেন তার উত্তর বলে দেন, যা কর্মকর্তারা পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন।
রং বলেন, চীনা কর্মকর্তারা এসব সাক্ষাতের সময় চেনের শারীরিক উপস্থিতি, মানসিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। তার চীনা আইনজীবীকেও সাক্ষাতের বিষয়ে রংয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
স্বামীর শারীরিক অবস্থাও নিয়ে উদ্বিগ্ন রং। তার দাবি, চেনের চিকিৎসা ও খাবারের মান প্রত্যাশার তুলনায় কম। চেন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন বলেও জানান তিনি।
মে মাসের আলোচনাতেও উঠেছিল বিষয়টি
ট্রাম্প এর আগে মে মাসে চীন সফরের সময় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে চেনের বিষয়টি তুলেছিলেন বলে রং জানিয়েছেন। তবে সেই আলোচনার পরও চেন মুক্তি পাননি।
এবার ট্রাম্প ও শির বৈঠক হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্য, তাইওয়ান, ইরানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে বন্দি মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় মানবিক ইস্যুর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বও বহন করছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্যায়ভাবে আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্ত করা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সবসময়ই অগ্রাধিকার।
তবে চীনের অবস্থান ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জুলাইয়ে জানিয়েছিল, চীনের বিচারব্যবস্থা আইন অনুযায়ী মামলা পরিচালনা করে এবং ‘অন্যায়ভাবে আটক’ বলে কোনো বিষয় নেই।
পরিবারের অপেক্ষা
দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর মুক্তির অপেক্ষায় থাকা রং বলেন, তিনি জানেন না প্রতিদিন চেন কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বন্দিত্বের সময় তার স্বামীর ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
চেনকে সরাসরি দেখা করার সুযোগ পেলে কী বলবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রং বলেন, তিনি স্বামীকে শক্ত থাকতে এবং আশাবাদী থাকতে বলবেন। তার বিশ্বাস, অনেক মানুষ চেনকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করছেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরতে পারবেন।
ট্রাম্প-শি বৈঠকে এই বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পায় এবং চীনা পক্ষ এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই চেনের পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রের নজরে থাকা অন্যতম বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















