ভারতের বহুল ব্যবহৃত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেসে (ইউপিআই) নতুন ফি চালুর সিদ্ধান্ত বড় দুই অ্যাপ ফোনপে ও গুগল পের বাজার দখল আরও শক্তিশালী করতে পারে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার রুপির বেশি ইউপিআই লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা বণিক ফি নেওয়া যাবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইউপিআই লেনদেনের মোট মূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশই পরিচালনা করে ওয়ালমার্ট-সমর্থিত ফোনপে ও গুগল পে। নতুন ফি থেকে ২০২৮ সালের মার্চ নাগাদ বছরে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ডলার আয় হতে পারে বলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইনের হিসাব। বাজারের বর্তমান অংশীদারত্ব ধরে নিলে এর প্রায় ৯০ কোটি ডলার যেতে পারে এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে।
ফ্রি লেনদেনের ছয় বছরের অবসান
ভারতে ছয় বছর ধরে বিনা ফিতে চলা ইউপিআই ব্যবস্থা এখন নতুন বাণিজ্যিক কাঠামোয় প্রবেশ করছে। ২০১৬ সালের নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত, করোনাভাইরাস মহামারি এবং গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন প্রণোদনার ফলে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইউপিআই। বর্তমানে ৫০ কোটির বেশি মানুষ চা কেনা থেকে শুরু করে দামি ইলেকট্রনিক পণ্য কেনা—প্রায় সব ধরনের দৈনন্দিন লেনদেনে এটি ব্যবহার করেন।

নতুন ফি কাঠামোর ফলে ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থা চীন, সিঙ্গাপুর ও ব্রাজিলের বড় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোর কাছাকাছি চলে আসবে। এসব ব্যবস্থায় লেনদেনের ওপর সাধারণত শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ফি রয়েছে।
ফি থেকে গ্রামীণ বাজারে বিস্তারের সুযোগ
নতুন আয়ের উৎস ফোনপে ও গুগল পেকে বড় শহরের বাইরে গ্রামীণ বাজারে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রতিটি লেনদেনের অঙ্ক তুলনামূলক কম হলেও এসব লেনদেন থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক পণ্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফোনপের সহপ্রতিষ্ঠাতা রাহুল চারি বলেছেন, মার্চেন্ট ফি চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য পরিচালন ব্যয় ও দায়ভার সামাল দিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। গুগল পেও এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ছোট অ্যাপগুলোর সামনে নতুন প্রতিযোগিতা
বড় দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে বাড়তি অর্থ আসায় ইউপিআই বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। ইউপিআই পরিচালনাকারী ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া এর আগে ইউপিআই বাজারে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ অংশীদারত্ব নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দুবার পিছিয়েছে।
ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি মূল্যের লেনদেন—যেমন টিকিট বুকিং, ব্যবসায়িক পেমেন্ট ও ইউটিলিটি বিল—নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ইউপিআইভিত্তিক ঋণসেবা সম্প্রসারণের দিকেও তাদের মনোযোগ বাড়তে পারে।
![]()
মোবিকুইকের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিপিন প্রীত সিং বলেছেন, নতুন ফি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউপিআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখার সরাসরি বাণিজ্যিক কারণ দেবে। তার মতে, এতে বিল পরিশোধ ও অনলাইন বাণিজ্যের মতো সেবার দিকে বাজার আরও ঝুঁকতে পারে।
নগদে ফিরবেন না গ্রাহকরা?
নতুন ফি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করলেও তা সরাসরি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কিছু ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে এই ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক, শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা মুম্বাইয়ের কয়েকজন ব্যবসায়ী মনে করেন, এর ফলে ব্যাপকভাবে নগদ লেনদেনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
মুম্বাইয়ের একটি বড় পোশাকের দোকানের ব্যবস্থাপক গোবিন্দ রাওয়াল জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ রুপির বিক্রির ৮০ শতাংশই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হয়। নতুন ফি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। তার মতে, মানুষ ইউপিআই ব্যবহারে এতটাই অভ্যস্ত যে সামান্য খরচের কারণে ব্যবস্থাটি ছেড়ে নগদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
মূল কথা হলো, নতুন ফি ইউপিআইকে বিনামূল্যের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা থেকে একটি বাণিজ্যিক মডেলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এতে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর হাতে বাড়তি অর্থ আসবে, একই সঙ্গে ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের নতুন কৌশলে বাজার ধরে রাখার চাপও বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















