জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের হিসাবেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বাসে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে, বেড়েছে রাইড শেয়ারিংয়ের খরচ। ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেকেই এখন প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের হিসাব কষছেন। বাড়তি ব্যয় সামলাতে কেউ গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিচ্ছেন, কেউ বাদ দিচ্ছেন অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত।
রাজধানীর মালিবাগ, ফার্মগেট, গুলশান, বাংলামটর, আসাদগেট, শনির আখড়া, হাজীপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মঙ্গলবার এমন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও বাসকর্মীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতাহাতিতেও গড়িয়েছে।
বাসভাড়ায় বাড়তি চাপ
সরকারি নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই রাজধানীর কয়েকটি রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া বেড়ে ১৫ টাকা হয়েছে, আবার কোনো রুটে প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। তবে কিছু বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।

মৌমিতা পরিবহনে শনির আখড়া থেকে চানখাঁরপুলের ভাড়া আগে ছিল ২০ টাকা। মঙ্গলবার সেখানে ২৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাড়াও ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাসকর্মীদের কথাকাটাকাটিও হয়েছে।
যাত্রীরা প্রশ্ন তুলছেন, নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগে কেন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বাসকর্মীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
ব্যক্তিগত গাড়ি গ্যারেজে
জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারেও। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল হক জানান, আগে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলেও কয়েক মাস ধরে তাঁর গাড়ি গ্যারেজেই পড়ে আছে। গাড়ি বের করার আগে এখন তেলের খরচ হিসাব করতে হয়। প্রয়োজন না হলে রিকশা বা অন্য যানবাহনে চলছেন তিনি।
একইভাবে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী অনেকেই অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছেন। ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা রাকিব হাসান জানান, আগে সময় বাঁচাতে অল্প দূরত্বেও মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন। কিন্তু জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সোমবার থেকে তিনি এমন যাতায়াত বাদ দিয়েছেন।
রাইড শেয়ারিংয়েও বেড়েছে খরচ

রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদেরও এখন বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়া থেকে বসুন্ধরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী ফারজানা রহমান জানান, বাসের যানজট এড়াতে নিয়মিত মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করতেন। কিন্তু অকটেনের দাম বাড়ার পর প্রতি রাইডে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন এই সেবা নেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রাইড শেয়ারিং চালকদেরও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। চালক আরিফ হোসেন জানান, আগে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার তেল দিয়ে দুই দিন চললেও এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার তেল নিতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা সেই অনুপাতে বাড়তি ভাড়া দিতে চাইছেন না। এতে রাইডের সংখ্যাও কমেছে বলে জানান তিনি।
পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি অবিলম্বে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
আইপিডির মতে, দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ডিজেল। পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















