আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও খনিজসমৃদ্ধ দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন অবসানের লক্ষ্যে নতুন একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার ট্রাম্পের আগের দাবিকে বাস্তবায়ন করছে না। তবে এর মাধ্যমে দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাটোর ভূমিকা আরও জোরালো করার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
বাড়ছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
চুক্তির প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ আর্কটিক অঞ্চল হয়ে গেছে এবং গ্রিনল্যান্ডেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উত্তরের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পিতুফিক মহাকাশঘাঁটি পরিচালনা করে। নতুন চুক্তির আওতায় নরসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে আরও দুটি সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ পাবে ওয়াশিংটন। নরসারসুয়াক একসময় শীতল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি ছিল। অন্যদিকে মেস্টারসভিগ বর্তমানে ডেনমার্কের বিশেষ বাহিনীর সিরিয়াস ডগ স্লেজ টহল ইউনিটের কাজে ব্যবহৃত হয়।
ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপযুক্ত স্থানে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করবে এবং দুটি বড় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে।
চুক্তিতে কী থাকছে
নতুন চুক্তিটি ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির সংশোধন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির আইনি ভিত্তি আরও বিস্তৃত করেছে। এতে ভবিষ্যতে আরও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সেসবের বিস্তারিত পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
চুক্তিটির কোনো নির্ধারিত মেয়াদ নেই। এর আওতায় গ্রিনল্যান্ড ও এর আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন বিমান ও নৌযানের বিস্তৃত প্রবেশাধিকার থাকবে। একই সঙ্গে ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা গড়তে দেওয়া হবে না।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ন্যাটো সদস্য, ন্যাটোর অংশীদার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ বা বিনিয়োগকারীরা গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সম্পদ আহরণসহ সংবেদনশীল খাতে নিয়ন্ত্রণ বা উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
টানাপোড়েনের পর নতুন সমঝোতা
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। বিশাল আয়তনের এই দ্বীপে মাত্র প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ বসবাস করেন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের পাশাপাশি এর ভৌগোলিক অবস্থানও একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে না দেওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ন্যাটোর ভেতরে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। এরপর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাসের নিবিড় আলোচনা চলে।
চুক্তির পর ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন এটিকে দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতা হিসেবে উল্লেখ করে ন্যাটো জোটের গুরুত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেন। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেনও আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর শক্তিশালী ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তবে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগের হুমকির কারণে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে সময় লাগবে বলে নিলসেন জানিয়েছেন। চুক্তিটি এখন কার্যকর হতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।
শীতল যুদ্ধের পর গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোয় এটিই হবে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ। শীতল যুদ্ধের সময় দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক স্থাপনা এবং ১০ হাজারের বেশি সেনা ছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















