ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে জোরদার হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠবে; অথবা যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় রয়েছে।’ তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হলে তিনি সেই পথ বেছে নিতে পারেন। কিন্তু চুক্তি না হলে ইরানকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করার হুমকিও দেন, যাতে দেশটি আর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে না পারে।
তবে ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। প্রায় সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাত শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, তেলের দাম বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীরা সারা দিন এক পক্ষ থেকে আরেক পক্ষের কাছে যাতায়াত করেছেন বলে তিনি জানান।

উইটকফ আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনাগুলো গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক ফল বয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে দুই দেশের বক্তব্য যতটা কঠোর, পর্দার আড়ালে সমঝোতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়াও ততটাই সক্রিয় রয়েছে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব দেশ যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদে চালু করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাসের চালান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের বার্তা
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে তেহরান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান গত সপ্তাহেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে। তেহরানের দাবিগুলো মেনে নেওয়া হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের জন্য সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এটি যুদ্ধের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

তবে ইরানের অবস্থান যে এখনো কঠোর, সেটিও স্পষ্ট। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘প্রচার’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে আরও ‘কঠোর, বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত’ হামলা চালানোর জন্য তারা প্রস্তুত।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফও বলেছেন, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। তাঁর বক্তব্য, ট্রাম্পকে বুঝতে হবে যে ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর শক্তি প্রয়োগ করে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আলোচনায় কাতারের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাবও উঠে এসেছে। এই কাঠামোর আওতায় ইরান ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে আনার কথা বলা হয়েছে।
আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরান এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি এর আগে বলেছেন, এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়াতে হবে।
কাতার গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে। মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন উদ্বেগ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু হরমুজ বা ইরান-ইসরায়েল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রাও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে পিছু হটিয়ে হুতিরা সামনের দিকে এগিয়েছে। এতে সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং লোহিত সাগর দিয়ে দেশটির তেল রপ্তানিও হুমকির মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে দুই মাস ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এবার সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত তাতে সাড়া দেয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় সৌদি আরবকে সমর্থন করবে। তবে ইয়েমেনের সংঘাত অত্যন্ত জটিল এবং এর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তেলবাজারে সাময়িক স্বস্তি
এর মধ্যেই মঙ্গলবার বৈশ্বিক তেলবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সৌদি আরব তার প্রধান পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সৌদি আরব উপসাগরীয় যুদ্ধকালীন বাধা এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে তেল পাঠাতে পারে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইয়ানবু বন্দর থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার তেল রপ্তানি শুরু হতে পারে। তবে আগের তুলনায় কম পরিমাণে রপ্তানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি মাসে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে সৌদি আরব অভিযোগ করেছে।
সামনে সমঝোতা, নাকি আরও বড় যুদ্ধ?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখন ট্রাম্পের সামনে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনও সামনে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতির অবসান ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে, এমনকি তার আগেও হতে পারে। তবে তিনি নিজেই বলেছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
ফলে সামনে দুটি সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা, অথবা সমঝোতা ব্যর্থ হয়ে সংঘাত আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছানো।
এর ফল শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, ইয়েমেনের পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল এবং বিশ্বের তেলবাজার—সবকিছুর ওপরই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। আর তাই ট্রাম্পের ‘চুক্তি অথবা নিশ্চিহ্ন’ বার্তার পাশাপাশি জাতিসংঘের ফাঁকে চলা গোপন কূটনৈতিক তৎপরতাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















