প্রায় ২০ বছর আগে রাখাইন থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন ৫৪ বছরের মোহাম্মদ সাদেক। তিন বছর আগে মিয়ানমারের দক্ষিণের তানিনথারি থেকে থাইল্যান্ডে পালান ৩৯ বছরের লেলে খাইন। আজ দুজনেই একই আতঙ্কে আছেন। তাঁদের হয়তো ফেরত পাঠানো হবে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল নিউজএশিয়ার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আশ্রয়দাতা দেশগুলো নীতি বদলাচ্ছে। ফলে হাজারো মানুষের মধ্যে ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মালয়েশিয়া পাঁচ হাজার জনকে ফেরানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম ১ হাজার ৪৭৬ জন রওনা দেবেন ২৯ সেপ্টেম্বর। থাইল্যান্ডও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শরণার্থী নিয়ে জনগণের ক্লান্তি আর দেশীয় রাজনীতির হিসাবই এই বদলের পেছনে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ফেব্রুয়ারির হিসাবে মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থী আছেন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ১ লাখ ২৬ হাজার ১৪৪ জন, চিন জনগোষ্ঠীর ১৫ হাজার ৭৭৪ জন। থাইল্যান্ডের সীমান্তের নয়টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন আরও ৯০ হাজারের বেশি মানুষ। গত ৬ আগস্ট মিন অং হ্লাইং থাইল্যান্ড সফর করেন। এর কয়েক দিন পরই থাই কর্তৃপক্ষ কায়েং ক্রাচান জাতীয় উদ্যানে একটি কারেন বসতিতে অভিযান চালায়। শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ২৮ জনকে আটক করা হয়। দেশটি দ্রুত বিদেশি বহিষ্কারের নতুন আইনও করেছে। দুই দেশের কোনোটিই জাতিসংঘের শরণার্থী সনদে সই করেনি। তাই এই মানুষদের আইনি সুরক্ষাও দুর্বল।
শরণার্থীদের সবচেয়ে বড় ভয় বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি। ২০২৪ সালে মিয়ানমার ১৮ থেকে ৩৫ বছরের পুরুষ ও ১৮ থেকে ২৭ বছরের নারীদের জন্য দুই বছরের সামরিক চাকরি বাধ্যতামূলক করে। মোন রাজ্যের ২৯ বছরের ইয়ে তেত এখন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের রাবার বাগানে কাজ করেন। তিনি বলেন, “ফিরলে আমি নিশ্চিত সৈনিক হব। আমি কাউকে মারতে চাই না। জোর করে সৈনিক বানালে আমার আর উপায় থাকবে না।” চিন শরণার্থী জেমস বাউই প্রায় ১৫ বছর ধরে কুয়ালালামপুরে আছেন। তাঁর মতে, পুরো চিন রাজ্যই এখন যুদ্ধক্ষেত্র। লেলে খাইন সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাত কারখানায় কাজ করেন। তাঁর ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক মূলত স্বামীকে ঘিরে। ফেরত গেলে তাঁকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হতে পারে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও এসেছে। ২০১৭ সালের সেনা অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা কক্সবাজারে পালিয়ে আসেন। কেউ কেউ নয় বছর ধরে শিবিরে আছেন। ঢাকা অন্তত দুবার প্রত্যাবাসন শুরুর চেষ্টা করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার শঙ্কায় কেউ ফিরতে রাজি হননি। ঢাকাও জানিয়েছে, কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না। আগস্টে মিয়ানমার বলেছে, বাংলাদেশের শিবিরে থাকা তিন লাখের বেশি মানুষ রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের ফেরত নেওয়া হবে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের পথ বদল তাই ঢাকার জন্যও নজরে রাখার বিষয়। আঞ্চলিক পর্যায়ে ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক ও চাপ বাড়লে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের নীতিও পরীক্ষার মুখে পড়বে।
মোহাম্মদ সাদেক এখনো আশায় আছেন, মালয়েশিয়া বিপদে থাকা কাউকে ফেরত পাঠাবে না। তিনি বলেন, “আমরা এখানে চিরকাল থাকতে আসিনি। একদিন ফেরার প্রস্তুতি নিতে এসেছিলাম।” সেই প্রস্তুতির দুই দশক পেরিয়ে গেছে, ঘরে ফেরার দিন আসেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















